যমজ সন্তান হারানো মা

গলাকাটা মুরগির মতো ছটফট করছিল বাচ্চাগুলো!

আমার সংবাদ ডেস্ক প্রকাশিত: জুন ৪, ২০২৬, ০৫:১১ পিএম

রাজধানীর আদ্-দ্বীন হাসপাতালে সম্প্রতি এক ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ছয় নবজাতকের মৃত্যুর মর্মান্তিক ঘটনায় একটি পরিবারে নেমে এসেছে দ্বিগুণ শোক। ওই রাতে একই মায়ের দুটি যমজ সন্তান প্রাণ হারিয়েছে। সেদিনের সেই দুঃসহ ও হৃদয়বিদারক ঘটনার বিবরণ দিতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন সন্তানহারা মা নাজমা বেগম।

স্মৃতিচারণ করে নাজমা বেগম বলেন, গত রোববার অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তিনি দুই যমজ পুত্র সন্তানের জন্ম দেন। জন্মের পর দুটি বাচ্চাই সম্পূর্ণ সুস্থ থাকায় পরিবারের সবাই অত্যন্ত আনন্দিত ছিলেন। পবিত্র ঈদের আগের দিন সুস্থ সন্তানদের নিয়ে তাঁদের বাড়ি ফেরার কথা ছিল, এমনকি আত্মীয়-স্বজনদের আকিকার দাওয়াতও দেওয়া হয়ে গিয়েছিল।

কিন্তু বাড়ি ফেরার মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে, বুধবার রাত ২টার দিকে একটি বাচ্চা হঠাৎ বমি করে চিৎকার শুরু করে। তাকে পরিষ্কার করে শোয়াতে না শোয়াতেই অন্য বাচ্চাটিও অসুস্থ হয়ে পড়ে। ঠিক একই সময়ে ওই ওয়ার্ডের আরও কয়েকটি শিশু মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়লে পুরো ওয়ার্ডে মায়েদের চিৎকার ও হাহাকার শুরু হয়। অভিযোগ রয়েছে, সংকটের ওই মুহূর্তে ওয়ার্ডে কোনো কর্তব্যরত নার্স বা চিকিৎসক উপস্থিত ছিলেন না।

নাজমা বেগম চোখের পানি মুছে বলেন, কিছুক্ষণ আগেও সুস্থ থাকা সন্তান দুটো চোখের সামনেই আরও বেশি অসুস্থ হয়ে পড়তে থাকে। কিছুক্ষণের মধ্যেই ওই ওয়ার্ডে থাকা প্রতিটি নবজাতক তীব্র ছটফটানি নিয়ে এক এক করে মায়ের কোলে ঢলে পড়তে শুরু করে।

তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, মাঝরাতের ওই করুণ পরিস্থিতিতে নানী-দাদীরা অস্থির হয়ে ওয়ার্ডের ভেতর চিকিৎসকদের খোঁজ করলেও কাউকে পাওয়া যায়নি। একটি শিশুকে বাইরে নিয়ে সাময়িক অক্সিজেন দেওয়ার পর কিছুটা সুস্থ হলে আবারও যখন ওই ভাপসা ওয়ার্ডে ফিরিয়ে আনা হয়, তখন সে পুনরায় অসুস্থ হয়ে মারা যায়।

ওয়ার্ডের ভেতরের পরিবেশের কথা উল্লেখ করে নাজমা বেগম বলেন, ঘরের ভেতর সবসময় প্রচণ্ড গরম ও একটি ভাপসা বিশ্রী গন্ধ ছিল, যা বড়দের জন্যই সহ্য করা কঠিন ছিল। এর ওপর ওয়ার্ডজুড়ে তেলাপোকা ও ছারপোকার উপদ্রব ছিল ভয়াবহ। কোনো খাবার রাখলেই তা পোকার কারণে নষ্ট হয়ে যেত।

তবে নবজাতকদের ঠান্ডার হাত থেকে বাঁচাতে ঘরের বয়স্ক অভিভাবকেরা মাঝেমধ্যে ফ্যান বা এসি বন্ধ করে দিচ্ছিলেন বলেও তিনি জানান।

নাজমা বেগমের অভিযোগ, এতগুলো শিশু একসঙ্গে আশঙ্কাজনকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ার পরও দীর্ঘক্ষণ কোনো ডাক্তার বা নার্স তাঁদের দেখতে আসেননি। সকাল ও দুপুরে ওষুধ দেওয়া ছাড়া রাতের বেলা তাঁদের কোনো দেখা মিলত না।

ভোররাত থেকে সকাল ৭টা পর্যন্ত ওই অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে থাকার কারণে যমজ শিশু দুটি অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়ে। পরবর্তীতে তাদের হাসপাতালের এনআইসিইউর (NICU) সামনে নিয়ে যাওয়া হলেও ভেতরের অন্য রোগীদের দোহাই দিয়ে দীর্ঘক্ষণ বাইরে অপেক্ষা করিয়ে রাখা হয়।

অবস্থার আরও অবনতি হলে সকাল সাড়ে ৮টার দিকে স্বজনরা জোর করে বাচ্চাদের চিকিৎসকদের হাতে তুলে দেন। তবে এনআইসিইউতে নেওয়ার মাত্র পাঁচ মিনিটের মাথায় জানানো হয়, শিশুদের হার্টবিট পাওয়া যাচ্ছে না। জরুরি ভিত্তিতে ১০ হাজার টাকার ওষুধ কিনে এনে দেওয়ার ১০ মিনিটের মধ্যেই দুই সন্তানের মৃত্যুর খবর দেওয়া হয়।

হাসপাতালে সঙ্গে থাকা নাজমা বেগমের ননদ রাবেয়া বেগম জানান, রাত ২টা থেকে শুরু হওয়া সেই আতঙ্কের রাতে কোনো চিকিৎসা মেলেনি। গরমে ও ভাপসা গন্ধে তাঁর সঙ্গে থাকা নিজের দুই বছরের সন্তানটিও অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। চোখের সামনেই তিনটি নিষ্পাপ শিশুকে মারা যেতে দেখেছেন তিনি। সকালের দীর্ঘ অপেক্ষার পর তাঁর ভাবির কোলও খালি হয়ে যায়।

যমজ সন্তান হারিয়ে স্তব্ধ বাবা মো. হাসান সরদার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সুস্থ সুন্দর দুটি সন্তানকে এক দিন আগেও তিনি কোলে নিয়েছেন। হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র নিয়ে বাড়ি ফেরার ঠিক আগমুহূর্তে ডাক্তার ও নার্সদের চরম গাফিলতির কারণে নিষ্পাপ দুটি প্রাণ ঝরে গেল, যা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। তিনি এই অবহেলার সুষ্ঠু তদন্ত ও দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।

এদিকে, এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার প্রেক্ষিতে আদ্-দ্বীন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের গঠিত তদন্ত কমিটি স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে তাদের আনুষ্ঠানিক প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। গত মঙ্গলবার স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেনের কাছে এই প্রতিবেদন হস্তান্তর করা হয়।

এএন