ডিবি প্রধান

জুলাই আন্দোলনের ৫৯ মামলায় প্রকৃত অপরাধীদের চার্জশিট দেওয়া হবে

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: জুলাই ১৬, ২০২৬, ০৪:৪১ পিএম

আন্দোলনের ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলাগুলোর তদন্ত নিয়ে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং তাৎপর্যপূর্ণ বার্তা দিয়েছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। ডিবি জানিয়েছে, আন্দোলন কেন্দ্র করে তাদের অধীনে থাকা ৫৯টি মামলার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের অনুমানের ওপর ভিত্তি করে নয়, বরং নিরেট তথ্য-প্রমাণ ও ফরেনসিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে প্রকৃত দোষীদের চিহ্নিত করে আদালতে চার্জশিট (অভিযোগপত্র) দাখিল করা হবে।

বৃহস্পতিবার দুপুরে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক বিশেষ সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে এই দৃঢ় অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) শফিকুল ইসলাম। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, নিরপরাধ কেউ যেন এই মামলাগুলোর মাধ্যমে হয়রানির শিকার না হন, সে বিষয়ে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছে।

তদন্তে ৪০ গিগাবাইট ডেটা ও ফরেনসিক বিশ্লেষণ

সংবাদ সম্মেলনে জুলাই আন্দোলনের মামলাগুলোর বর্তমান অগ্রগতি ও তদন্তের প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে ডিবি প্রধান জানান, এই তদন্ত প্রক্রিয়াটি সাধারণ অন্য যেকোনো মামলার চেয়ে অনেক বেশি জটিল ও সংবেদনশীল। এর প্রধান কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন মামলার বিশাল আসামির তালিকা এবং ঘটনার ব্যাপকতা।

ডিবি প্রধান বলেন, আমাদের গোয়েন্দা বিভাগে বর্তমানে জুলাই আন্দোলন সংশ্লিষ্ট ৫৯টি অতি গুরুত্বপূর্ণ মামলা তদন্তাধীন রয়েছে। প্রতিটি মামলায় আসামির সংখ্যা অনেক বেশি। ফলে ঢালাওভাবে কাউকে অভিযুক্ত না করে, ঘটনার সময় কার কী ভূমিকা ছিল, কে কোথায় অবস্থান করছিলেন- তা নিখুঁতভাবে শনাক্ত করার কাজ চলছে।

তদন্তের প্রযুক্তিগত দিক ও গভীরতা তুলে ধরে তিনি আরও প্রকাশ করেন যে, এই আন্দোলন সংশ্লিষ্ট ঘটনার প্রায় ৪০ গিগাবাইট (GB) ডিজিটাল ডেটা ও ভিডিও ফুটেজ ডিবির হাতে রয়েছে। এই বিশাল ডেটা ভাণ্ডারের প্রতিটি অংশ অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। 

ভিডিও ফুটেজ, কল ডিটেইলস রেকর্ড (CDR) এবং অন্যান্য ডিজিটাল আলামতের ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমে ধাপে ধাপে তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। ডিবির লক্ষ্য হলো, আইনের সুনির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে থেকে সর্বোচ্চ বৈজ্ঞানিক ও আইনি তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করে প্রকৃত অপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা।

‘মামলা বাণিজ্য’ নিয়ে কঠোর অবস্থান

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত সাংবাদিকরা একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও বাস্তবসম্মত প্রশ্ন তোলেন। জুলাই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে শুধুমাত্র ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকাতেই শত শত মামলা দায়ের হয়েছে, যার মধ্যে অনেক মামলার সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এমনও দেখা গেছে, একই ঘটনার প্রেক্ষিতে তিন থেকে চারটি পৃথক মামলা করা হয়েছে এবং অভিযোগ রয়েছে যে, কিছু স্বার্থান্বেষী মহল এই মামলাগুলোকে কেন্দ্র করে ‘মামলা বাণিজ্য’ বা অর্থ আদায়ের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। এই ধরনের ভুয়া মামলা রুখতে এবং মামলা বাণিজ্যের সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে ডিবি কোনো ব্যবস্থা নেবে কি না- তা জানতে চাওয়া হয়।

এই প্রশ্নের জবাবে অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম অত্যন্ত জোরালো ভাষায় আশ্বস্ত করেন যে, কোনো ধরনের অনৈতিক বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা ডিবিতে প্রশ্রয় পাবে না। তিনি বলেন, আপনারা ভালো করেই জানেন যে, এই মামলাগুলো জাতীয়ভাবে কতটা গুরুত্বপূর্ণ। তাই মামলাগুলোর তদন্ত প্রক্রিয়াকে শতভাগ স্বচ্ছ ও নির্ভুল রাখতে আমাদের একটি উচ্চপর্যায়ের 'বৃহৎ মনিটরিং সেল' বা পর্যবেক্ষণ সেল কাজ করছে।

তিনি জানান, এই মনিটরিং সেল প্রতি ১৫ দিন পর পর প্রতিটি মামলার নথিপত্র, এজাহার এবং সংগৃহীত প্রমাণের চুলচেরা বিশ্লেষণ ও পর্যালোচনা করে। শুধু ডিএমপি স্তরেই নয়, পুলিশ সদরদপ্তরের (পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স) নিজস্ব মনিটরিং সেলও এই মামলাগুলো অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে যাচাই-বাছাই করছে।

ডিবি প্রধান সরাসরি ঘোষণা দেন, যদি কেউ ব্যক্তিগত শত্রুতা, রাজনৈতিক ফায়দা বা কোনো ভিন্ন উদ্দেশ্য নিয়ে অন্য কাউকে মামলার আসামি করে থাকেন, তবে আমরা তাতে বিন্দুমাত্র সায় (অনুমোদন) দেব না। আমি আপনাদের এবং দেশবাসীকে পূর্ণ নিশ্চয়তা দিচ্ছি যে, প্রতিটি মামলা অত্যন্ত নিখুঁত ও নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা হচ্ছে। একমাত্র যাদের বিরুদ্ধে অকাট্য ও চাক্ষুষ তথ্য-প্রমাণ পাওয়া যাবে, শুধু সেই প্রকৃত দোষী ব্যক্তিদের নামই চার্জশিটে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।

বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জের মুখে তদন্ত দল

তদন্ত কাজ পরিচালনা করতে গিয়ে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা কোনো ধরনের বাধা বা সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন কি না- সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে ডিবি প্রধান বাস্তবচিত্র তুলে ধরেন। তিনি স্বীকার করেন যে, এই মামলাগুলোর তদন্তে তাদের বেশ কিছু বড় চ্যালেঞ্জ ও সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।

প্রধান চ্যালেঞ্জসমূহ

  • তথ্যের বিশালতা: ৪০ জিবি বা তার চেয়েও বেশি ওজনের অডিও, ভিডিও এবং ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট সূক্ষ্মভাবে বিশ্লেষণ করা অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ কাজ।
  • আসামির আধিক্য ও অস্পষ্টতা: এজাহারে নাম থাকা বিপুল সংখ্যক আসামির ভিড়ে প্রকৃত পরিকল্পনাকারী, উস্কানিদাতা এবং সরাসরি সহিংসতায় জড়িতদের আলাদা করা।
  • বিপরীতমুখী এজাহার: একই ঘটনার বিপরীতে ভিন্ন ভিন্ন থানায় একাধিক মামলা এবং একেক মামলায় একেক ধরনের আসামির নাম অন্তর্ভুক্ত থাকা, যা মূল ঘটনা উদঘাটনে বিভ্রান্তি তৈরি করে।

ডিবি প্রধান শফিকুল ইসলাম জানান, এসব বহুমুখী জটিলতা থাকা সত্ত্বেও গোয়েন্দা পুলিশ প্রতিটি উপাদানকে ক্রসভেরিফাই (যাচাই-বাছাই) করছে। উদ্দেশ্য একটাই- আইনের চোখে যেন কোনো ফাঁক না থাকে এবং প্রকৃত সত্য যেন আদালতের সামনে উঠে আসে।

আইনি ও সামাজিক প্রভাব

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও আইনি বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০২৬ সালের এই সময়ে এসে জুলাই আন্দোলনের মামলার সুষ্ঠু তদন্ত বর্তমান রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য অত্যন্ত জরুরি। যেহেতু দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে এবং নতুন সরকার গঠিত হয়েছে, তাই পুলিশের যেকোনো পদক্ষেপকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখা হচ্ছে। এই অবস্থায় ডিবির এই প্রকাশ্য ও দৃঢ় অঙ্গীকার জনমনে স্বস্তি ফিরিয়ে আনবে এবং আইনি ব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা আরও দৃঢ় করবে।

সংবাদ সম্মেলনের সমাপনী বক্তব্যে ডিবি প্রধান স্পষ্ট করে দেন যে, তদন্তের খাতিরে যতটুকু সময় প্রয়োজন ততটুকুই নেওয়া হচ্ছে, তবে তাড়াহুড়ো করে কোনো দুর্বল বা বিতর্কিত চার্জশিট আদালতে পাঠানো হবে না। সম্পূর্ণ পেশাদারিত্বের সাথে এই ৫৯টি মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন তৈরি করা হবে, যা দেশের ইতিহাসে একটি দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।

এএন