সম্প্রতি দেশের চারটি গুরুত্বপূর্ণ বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত ছাত্রসংসদ নির্বাচনে শিবির সমর্থিত প্যানেল বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতায় বিজয় অর্জন করেছে। দীর্ঘ সময় পর শিক্ষাঙ্গনে এ ধরনের ফলাফল নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এই বিজয় শুধু একটি সংগঠনের নয়, বরং এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ সমাজের চিন্তা, মূল্যবোধ ও পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষার বহিঃপ্রকাশও বটে।
তরুণ সমাজ হচ্ছে একটি জাতির ভবিষ্যৎ। তারা যেমন বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থার ভেতর গড়ে ওঠে, তেমনি তাদেরই হাতে থাকে আগামী দিনের রাষ্ট্র পরিচালনার হাল। তাই বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের রাজনীতি ও নেতৃত্বের মান নির্ধারণ করে দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি, শিক্ষার মান ও নৈতিক দিকনির্দেশনা।
বিশ্ববিদ্যালয় রাজনীতি: বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় রাজনীতির ইতিহাস বেশ গৌরবময়। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধ-প্রতিটি জাতীয় সংগ্রামে ছাত্রসমাজ অগ্রণী ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু স্বাধীনতার পর শিক্ষাঙ্গন রাজনীতি ক্রমশ দলীয় প্রভাব, সহিংসতা, এবং স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর কবলে পড়ে একসময় শিক্ষার্থীদের কাছে ভয়ের প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়।
এই প্রেক্ষাপটে, শিবির সমর্থিত প্যানেলের সাম্প্রতিক সাফল্য অনেকের কাছে ‘নৈতিক রাজনীতি’ ও ‘আদর্শভিত্তিক নেতৃত্বের প্রত্যাবর্তন’ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিশেষত, শিক্ষার্থীদের মধ্যে যখন হতাশা, বেকারত্ব ও মূল্যবোধের অবক্ষয় চরমে-তখন ধর্মনিষ্ঠ, নৈতিক ও দেশপ্রেমিক নেতৃত্বের আহ্বান তাদের আকৃষ্ট করছে।
বর্তমান বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অন্যতম বড় সমস্যা হলো শিক্ষার্থীদের একাগ্রতার অভাব। যেমন: ক্লাসে উপস্থিতির হার ক্রমেই কমছে, গবেষণার আগ্রহ কমে যাচ্ছে, মোবাইল, সোশ্যাল মিডিয়া ও পার্ট-টাইম আয়ের পেছনে সময় ব্যয় বাড়ছে, আর অনেকে রাজনীতিতে যুক্ত হলেও তা প্রায়ই গঠনমূলক নয়, বরং প্রভাব বিস্তার বা দলীয় স্বার্থ রক্ষার জন্য।
এই প্রেক্ষাপটে নতুনভাবে নির্বাচিত শিবির-সমর্থিত নেতৃত্বের দায়িত্ব হবে, শিক্ষাকে পুনরায় কেন্দ্রে ফিরিয়ে আনা।
তারা যদি তাদের নেতৃত্বে একাডেমিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে পারেন, শিক্ষকদের সঙ্গে সমন্বয় রেখে শ্রেণিকক্ষ, গবেষণাগার ও লাইব্রেরিকে সক্রিয় করেন, তবে সেটিই হবে প্রকৃত পরিবর্তনের সূচনা।
একটি আদর্শবাদী ছাত্রসংগঠনের প্রধান শক্তি হলো নৈতিক ভিত্তি ও আত্মশৃঙ্খলা। ইসলামী ছাত্রশিবির দীর্ঘদিন ধরে তরুণদের মাঝে আল্লাহভীতি, সৎ চরিত্র, মেধা ও দেশপ্রেমের চর্চা জোরদার করার কথা বলে আসছে।
যদি নির্বাচিত নেতারা এই মূল্যবোধকে বাস্তবে প্রতিফলিত করতে পারেন, তবে তারা হবে আগামী দিনের এক নতুন ধারার নেতৃত্ব-যারা শুধু ক্ষমতা নয়, দায়িত্বের জায়গা থেকে কাজ করবে।
বিশ্ববিদ্যালয় রাজনীতিকে সংঘাতমুক্ত ও জ্ঞানভিত্তিক আন্দোলনে পরিণত করাই হবে তাদের অন্যতম বড় কাজ।
শিক্ষার মান উন্নয়নে করণীয়: শিবির-সমর্থিত এই নেতৃত্বের সামনে শিক্ষার মান উন্নয়নে কিছু স্পষ্ট করণীয় দিক রয়েছে।
শিক্ষার পরিবেশ পুনরুদ্ধার: ক্লাস বর্জন, সেশনজট, অনুপস্থিত শিক্ষক-এসবের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ পদক্ষেপ নিতে হবে।
গবেষণা ও ইনোভেশনে উৎসাহ: বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে গবেষণার মনোভাব তৈরি করতে হবে। একাডেমিক সেমিনার, জার্নাল ক্লাব, বিজ্ঞানমেলা বা ডিবেট ক্লাবগুলোকে সক্রিয় করা দরকার।
নৈতিক শিক্ষা ও সামাজিক দায়বদ্ধতা: ধর্মীয় ও মানবিক মূল্যবোধের চর্চা বাড়াতে উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। সামাজিক সেবামূলক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা বাস্তব জীবনের শিক্ষা পাবে।
রাজনৈতিক সহনশীলতা চর্চা: ভিন্নমতকে সহ্য করার সংস্কৃতি তৈরি না হলে শিক্ষা-পরিবেশ শান্ত হবে না। তাই শিবির নেতৃত্বকে প্রথমে ‘সংঘাত নয়, সংলাপ’ এই মনোভাব গ্রহণ করতে হবে।
ছাত্রকল্যাণে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা: বৃত্তি, ক্যারিয়ার গাইডেন্স, মানসিক স্বাস্থ্য ও আবাসন সংকটের সমাধানে দৃশ্যমান কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
যে তরুণরা আজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিপি বা সাধারণ সম্পাদক হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন, তারাই আগামী দিনে দেশের প্রশাসন, রাজনীতি ও সমাজের নেতৃত্বে আসবেন। তাদের আজকের সততা, দায়িত্ববোধ ও কর্মদক্ষতাই নির্ধারণ করবে আগামী দিনের বাংলাদেশ কেমন হবে।
স্মরণ রাখতে হবে, বিশ্ববিদ্যালয় রাজনীতি হলো নেতৃত্বের বিদ্যালয়। এখানেই শেখা হয়: কীভাবে মানুষের কথা শুনতে হয়, কীভাবে মতভেদকে মোকাবিলা করতে হয়, আর কীভাবে দায়িত্ব নিতে হয় কোনো প্রতিদান ছাড়া।
দেশের সাধারণ মানুষ বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি থেকে এখন আর সংঘাত চায় না; তারা চায় একটি জ্ঞানভিত্তিক ও উন্নয়নমুখী আন্দোলন।
যদি শিবির-সমর্থিত এই তরুণ নেতৃত্ব সেই প্রত্যাশা পূরণ করতে পারে, তাহলে এটি শুধু সংগঠনের নয়, বরং পুরো জাতির জন্য ইতিবাচক পরিবর্তন বয়ে আনবে।
বিশ্ববিদ্যালয়কে আবারও চিন্তার কেন্দ্র, নৈতিকতার পাঠশালা ও নেতৃত্ব তৈরির মঞ্চে রূপান্তর করাই হবে তাদের প্রকৃত বিজয়। আজকের তরুণরা আগামী দিনের নেতা। তাদের হাতে রয়েছে জাতির ভবিষ্যৎ, রাজনীতির চরিত্র, শিক্ষার মান ও সামাজিক মূল্যবোধের রূপরেখা।
চারটি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিবির সমর্থিত প্যানেলের এই জয় শুধু রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার ফল নয়-এটি শিক্ষার্থীদের আদর্শ ও দায়িত্বশীল নেতৃত্বের প্রতি প্রত্যাশার প্রতিফলন।
তারা যদি সততা, আদর্শ ও পরিশ্রমের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশে পরিবর্তন আনতে পারেন, তবে একদিন এই পরিবর্তনের স্রোত প্রবাহিত হবে দেশের রাজনীতি, সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনায়ও।
এমনই নেতৃত্বের হাতেই আমরা দেখতে চাই এক আলোকিত বাংলাদেশ-যেখানে জ্ঞান, নৈতিকতা ও দেশপ্রেম হবে শিক্ষার আসল লক্ষ্য, আর রাজনীতি হবে মানবকল্যাণের হাতিয়ার।
জেএইচআর