নৌপরিবহনে তিন মাসে অবকাঠামো, ডিজিটাল রূপান্তর ও জনসেবায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি

কাজী আরিফ বিল্লাহ প্রকাশিত: জুন ১০, ২০২৬, ০২:০৪ পিএম

দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং নিরাপদ নৌযোগাযোগ নিশ্চিত করতে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় গত তিন মাসে নানা উন্নয়নমূলক উদ্যোগ বাস্তবায়ন করেছে। সমুদ্রবন্দর আধুনিকীকরণ, নৌপথের নাব্যতা বৃদ্ধি, ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার, যাত্রীসেবার মানোন্নয়ন এবং পরিবেশবান্ধব কার্যক্রমের মাধ্যমে নৌখাতের সক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে। এসব উদ্যোগ দেশের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকে গতিশীল করার পাশাপাশি নৌপরিবহন ব্যবস্থাকে আরও দক্ষ, নিরাপদ ও আধুনিক করে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম বন্দর গত তিন মাসে ৬ লাখ ৫৩ হাজার ৭০৮ টিইইউস (TEUs) কন্টেইনার হ্যান্ডলিং সম্পন্ন করে বাণিজ্য কার্যক্রমে উল্লেখযোগ্য সক্ষমতার পরিচয় দিয়েছে। এ সময়ে বন্দরের রাজস্ব আয় প্রায় ১ হাজার ৮৮৮ কোটি টাকা, যা জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। একই সময়ে মোংলা বন্দর ৭ হাজার ৪৪৩ টিইইউস কন্টেইনার হ্যান্ডলিং এবং প্রায় ১০৭ কোটি টাকা রাজস্ব আয় করে কার্যক্রমে ইতিবাচক অগ্রগতি অর্জন করেছে। অপরদিকে, পায়রা বন্দর ৬ দশমিক ৭৪ লাখ মেট্রিক টন কার্গো হ্যান্ডলিংয়ের মাধ্যমে ৮ দশমিক ৯৩ কোটি টাকা রাজস্ব অর্জন করে দেশের সামুদ্রিক বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

বন্দর ব্যবস্থাপনাকে আধুনিক, দক্ষ ও প্রযুক্তিনির্ভর করতে একাধিক যুগান্তকারী উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দরে CPA Sky (Port Single Window) চালুর জন্য চুক্তি স্বাক্ষর ও উদ্বোধন সম্পন্ন হয়েছে, যা পণ্য খালাস প্রক্রিয়াকে আরও দ্রুত, সহজ ও স্বচ্ছ করবে। একইসঙ্গে Full Automation (Paperless Port AI) এবং Enabled Monitoring System বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। টার্মিনাল অপারেটিং সিস্টেম (TOS) ৩.৮০ সংস্করণ থেকে ৪.০০ সংস্করণে উন্নীত করার কার্যক্রমও সম্পন্ন হয়েছে, ফলে কন্টেইনার ও কার্গো ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা ও গতি আরও বৃদ্ধি পাবে। বন্দরের নিরাপত্তা জোরদারে Smart Access Control, Face Recognition এবং আধুনিক Surveillance System স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি Cyber Security ও Information Protection কার্যক্রম বাস্তবায়নের মাধ্যমে বন্দরের ডিজিটাল অবকাঠামোকে আরও সুরক্ষিত ও নির্ভরযোগ্য করা হচ্ছে।

নৌপথের নাব্যতা বৃদ্ধি ও বন্দর সক্ষমতা উন্নয়নে ব্যাপক অবকাঠামোগত কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। কর্ণফুলী নদী ও মাতারবাড়ি ডিপ সি টার্মিনাল চ্যানেলে বৃহৎ পরিসরে ড্রেজিং কার্যক্রম চলমান রয়েছে, যা বড় আকারের জাহাজ চলাচলের সক্ষমতা বৃদ্ধি করবে। মোংলা বন্দর চ্যানেলে ইতোমধ্যে ২১০ লাখ ঘনমিটার ড্রেজিং কাজ সম্পন্ন হয়েছে। একইসঙ্গে Vessel Traffic Management and Information System (VTMIS) চালুর মাধ্যমে জাহাজ চলাচলের রিয়েল-টাইম পর্যবেক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা হয়েছে। পায়রা বন্দরে ৬৫০ মিটার জেটি এবং ৩ দশমিক ২৫ বর্গকিলোমিটার ব্যাকআপ ইয়ার্ড নির্মাণ সম্পন্ন হয়েছে। এছাড়া বন্দরের সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ উন্নয়নে ৬-লেন সংযোগ সড়কের ৯১ শতাংশ এবং আন্ধারমানিক নদীর ওপর ১,১৮০ মিটার দীর্ঘ সেতুর ৮৫ শতাংশ নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে।

দেশের নৌখাতকে পরিবেশবান্ধব, আধুনিক ও জনবান্ধব করে তুলতে গত তিন মাসে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হয়েছে। পরিবেশ সুরক্ষা ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার সম্প্রসারণের লক্ষ্যে পায়রা বন্দরে সৌর প্যানেলের মাধ্যমে ৮০০ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। একইসঙ্গে নদী ও বন্দর এলাকার পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় ৬ হাজার ১০০টি বৃক্ষরোপণ সম্পন্ন হয়েছে। নদী দখল ও দূষণ প্রতিরোধে আইনি কাঠামো আরও শক্তিশালী করতে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন আইন, ২০১৩ সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা দেশের নদী ব্যবস্থাপনা ও সংরক্ষণ কার্যক্রমকে আরও কার্যকর করবে।

নৌপথের নাব্যতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) বিভিন্ন নদীপথে ২০ কিলোমিটার ক্যাপিটাল ড্রেজিং এবং ৩৫ লাখ ঘনমিটার সংরক্ষণ ড্রেজিং সম্পন্ন করেছে। পাশাপাশি ২০০ কিলোমিটার হাইড্রোগ্রাফিক জরিপ পরিচালনা করা হয়েছে, যার মাধ্যমে নৌপথের গভীরতা ও নাব্যতা সম্পর্কে হালনাগাদ তথ্য সংগ্রহ সম্ভব হয়েছে। নিরাপদ নৌ চলাচল নিশ্চিত করতে অভ্যন্তরীণ নৌপথে ৫৫০টি নৌ-সহায়ক সরঞ্জাম স্থাপন করা হয়েছে এবং বিভিন্ন স্থানে নিমজ্জিত যান উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছে। এছাড়া আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর নৌপথ ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে বিআইডব্লিউটিএ কন্ট্রোল অ্যান্ড কমান্ড সেন্টার স্থাপনের কাজ চলমান রয়েছে।

যাত্রীসেবার মানোন্নয়নেও উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশন (বিআইডব্লিউটিসি) তাদের বহরে নতুন দুটি যাত্রীবাহী জাহাজ এমভি রুপসা ও এমভি সুগন্ধা সংযোজন করেছে, যা নৌপথে যাত্রী পরিবহন সক্ষমতা বৃদ্ধি করবে। যাত্রীসেবাকে আরও সহজ ও মানবিক করতে সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে বিনামূল্যে কুলি, ট্রলি ও হুইলচেয়ার সুবিধা চালু করা হয়েছে। এছাড়া প্রতিবন্ধী যাত্রী, দরিদ্র শিক্ষার্থী, অসহায় রোগী এবং মৃত ব্যক্তির লাশ পরিবহনের জন্য বিনা ভাড়ায় যাতায়াত সুবিধা প্রদান করা হচ্ছে। সামাজিক দায়বদ্ধতার অংশ হিসেবে ১০ বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্যও বিনা ভাড়ায় নৌযাত্রার সুযোগ রাখা হয়েছে।

সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারের আলোকে নদীকেন্দ্রিক যোগাযোগ ব্যবস্থা আরও সম্প্রসারণ এবং যাত্রী ও পণ্য পরিবহনকে সহজ, নিরাপদ ও সময়োপযোগী করতে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হয়েছে। এর অংশ হিসেবে বসিলা ও শিমুলিয়া টুরিস্ট ঘাটে নতুন লঞ্চঘাট ও ফেরিঘাট নির্মাণ সম্পন্ন হয়েছে। শিমুলিয়া টুরিস্ট ঘাটে ইতোমধ্যে লঞ্চ ও ফেরি চলাচল শুরু হওয়ায় রাজধানী ও দক্ষিণাঞ্চলের মধ্যে নৌযোগাযোগ আরও সহজ ও গতিশীল হয়েছে।

দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যকে আরও গতিশীল ও ব্যবসাবান্ধব করতে বেনাপোল, ভোমরা ও বুড়িমারীসহ বিভিন্ন স্থলবন্দরে আধুনিক ওয়্যারহাউস, কার্গো হ্যান্ডলিং সুবিধা এবং ওয়ান-স্টপ সার্ভিস সেন্টার নির্মাণকাজ চলমান রয়েছে। একইসঙ্গে National Single Window (NSW) বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে, যার মাধ্যমে বিভিন্ন সংস্থার অনুমোদন ও কাস্টমস-সংক্রান্ত কার্যক্রম একটি সমন্বিত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সম্পন্ন করা সম্ভব হবে।

মানবসম্পদ উন্নয়ন ও নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধির লক্ষ্যে বাংলাদেশ মেরিন একাডেমি এবং মেরিন ফিশারিজ একাডেমিতে ন্যূনতম ১০ শতাংশ নারী ক্যাডেট ভর্তি নিশ্চিত করা হয়েছে। এর মাধ্যমে সামুদ্রিক ও নৌখাতে দক্ষ নারী জনশক্তি গড়ে তোলার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। পাশাপাশি নৌপরিবহন অধিদপ্তরের ৮০ শতাংশ কার্যক্রম অটোমেশনের আওতায় আনা হয়েছে, ফলে সেবা প্রদান প্রক্রিয়া আরও দ্রুত, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক হয়েছে।

সমুদ্র নিরাপত্তা জোরদার এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সাড়া দেওয়ার লক্ষ্যে Joint Maritime Rescue Coordination Centre (JMRCC)-এর কার্যক্রম শক্তিশালী করা হয়েছে। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে উপকূলীয় ও সমুদ্রগামী জাহাজের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, দুর্ঘটনা মোকাবিলা, অনুসন্ধান ও উদ্ধার কার্যক্রম আরও সমন্বিত ও কার্যকরভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হবে।

গত তিন মাসে নৌপরিবহন খাতে গৃহীত বহুমাত্রিক উদ্যোগ দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং জনসেবার মানোন্নয়নে এক নতুন দিগন্তের সূচনা করেছে। সমুদ্র ও স্থলবন্দর আধুনিকীকরণ, নৌপথের নাব্যতা বৃদ্ধি, ডিজিটাল প্রযুক্তির বিস্তার, পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন এবং যাত্রীবান্ধব সেবার সম্প্রসারণের মাধ্যমে নৌখাতকে আরও দক্ষ, নিরাপদ ও টেকসই ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর কার্যক্রম এগিয়ে চলেছে।

লেখক: তথ্য ও জনসংযোগ কর্মকর্তা,  নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়

এএন