দেশের বিভিন্ন স্থানে চুরি, ডাকাতি, খুন, সন্ত্রাস, রাহাজানি ও ধর্ষণের মতো অপরাধের ঘটনায় সাধারণ মানুষ ক্রমেই আতঙ্কিত হয়ে উঠছে। প্রতিদিনের সংবাদে এমন ঘটনার সংখ্যা বেড়েই চলছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সক্রিয় থাকলেও অপরাধীরা কৌশল পরিবর্তন করে নতুনভাবে অপরাধ সংঘটন করছে। কখনো রাতে, কখনো দিনের আলোয়, নানা রূপে এই অপরাধ আমাদের সামাজিক নিরাপত্তার বুননকে দুর্বল করে দিচ্ছে।
প্রশাসন ও পুলিশের ভূমিকা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। তারা সীমিত জনবল ও বিপুল দায়িত্বের মধ্যে থেকে কাজ করছেন। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, শুধু প্রশাসনের উপর নির্ভর করেই কি সমাজকে নিরাপদ রাখা সম্ভব? বাস্তবতা বলছে, না। কারণ প্রশাসন হলো: রাষ্ট্রযন্ত্রের একটি অংশ, অথচ সমাজের প্রতিটি প্রান্তে যে মানুষগুলো বসবাস করে, তারাই সমাজের প্রকৃত রক্ষক। প্রশাসন অল্পসংখ্যক, কিন্তু জনগণ সংখ্যায় অনেক বেশি। এই জনগণের অংশগ্রহণ, সচেতনতা ও সাহসিকতা ছাড়া অপরাধ প্রতিরোধ কার্যকর হতে পারে না।
অপরাধ দমনে প্রশাসনের সীমাবদ্ধতা: একটি দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যতই দক্ষ হোক, তাদের কাজের ক্ষেত্র সীমিত। প্রতিটি মহল্লা, গ্রাম, রাস্তা বা গলিতে পুলিশ উপস্থিত থাকা সম্ভব নয়। অপরাধীরা এ সুযোগই নেয়, তারা জানে যে পুলিশের উপস্থিতি সর্বত্র নয়। তাই তারা নির্জন এলাকা, দুর্বল পাহারার স্থান বা জনবিরল মুহূর্তে আঘাত হানে।
এছাড়াও, সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রভাব, মামলার জট, সাক্ষীর অনুপস্থিতি, বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা ইত্যাদি কারণে অনেক অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত হয় না। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে ভয় ও হতাশা তৈরি হয়, অপরাধীরা পায় নতুন সাহস। ফলে সমাজে একটি অদৃশ্য ভয় ও অনাস্থার পরিবেশ জন্ম নেয়, যা দীর্ঘমেয়াদে আরও বিপজ্জনক।
জনগণের ভূমিকা কেন অপরিহার্য: একটি নিরাপদ সমাজ গড়ে তুলতে হলে জনগণকেই হতে হবে প্রথম প্রতিরোধের দেয়াল। অপরাধ যেখানে ঘটছে, সেই এলাকায় জনগণই তো সবচেয়ে আগে তা জানতে পারে। প্রশাসনের আগেই স্থানীয় মানুষ যদি সচেতন, সংগঠিত ও সহযোগিতামূলক মনোভাব পোষণ করে, তাহলে অপরাধ অনেকাংশে রোধ করা সম্ভব।
ধরা যাক, কোনো এলাকায় নিয়মিত চুরি হচ্ছে। যদি এলাকাবাসী নিজেরাই পালাক্রমে পাহারা দেয়, সন্দেহজনক ব্যক্তিকে শনাক্ত করে পুলিশকে জানায়, কিংবা রাতের বেলায় পর্যায়ক্রমে টহল চালায়, তাহলে অপরাধীরা সেখানে সাহস পাবে না। অতীতে আমাদের সমাজে 'পাড়ার টহল' 'গ্রাম পাহারা' কিংবা মহল্লা 'কমিটি' নামের সামাজিক উদ্যোগগুলো এই কাজই করত। আধুনিক সমাজে সেই ঐতিহ্য আবার ফিরিয়ে আনার সময় এসেছে।
ভয়ের সংস্কৃতি ভাঙতে হবে: আমাদের সমাজে অনেক সময় অপরাধের সাক্ষী থাকলেও মানুষ মুখ খোলে না। কারণ, অপরাধীরা প্রভাবশালী বা তাদের সঙ্গে রাজনৈতিক সম্পর্ক থাকতে পারে এই ভয়ে মানুষ চুপ থাকে। কিন্তু এই নীরবতা অপরাধীদের আরও শক্তিশালী করে।
প্রত্যেক নাগরিকের উচিত, সাহসিকতার সঙ্গে সত্যের পক্ষে দাঁড়ানো। আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার দায়িত্ব হলো সাক্ষী ও অভিযোগকারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে মিডিয়া ও নাগরিক সমাজকে এমন পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে যেখানে মানুষ নির্ভয়ে অপরাধের প্রতিবাদ জানাতে পারে।
একজন মানুষের সাহস কখনো কখনো পুরো সমাজকে জাগিয়ে তুলতে পারে। ইতিহাসে দেখা গেছে, অনেক বড় পরিবর্তনের সূচনা হয়েছে সাধারণ মানুষের প্রতিবাদ থেকেই।
নৈতিক শিক্ষা ও পারিবারিক দায়িত্ব: অপরাধ শুধু প্রশাসনের দুর্বলতা নয়; এটি সমাজের নৈতিক অবক্ষয়েরও প্রতিফলন। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সমাজ- তিনটি স্তরেই আজ নৈতিক শিক্ষার ঘাটতি প্রকট। শিশুদের শৈশবেই যদি সততা, ন্যায়বোধ, সহমর্মিতা ও মানবিকতার পাঠ শেখানো যায়, তাহলে ভবিষ্যতের নাগরিক অপরাধের পথ থেকে দূরে থাকবে।
আজকের সমাজে ভোগবাদ, প্রতিযোগিতা ও ধনলোভ এমনভাবে ছড়িয়ে পড়েছে যে মানুষ সৎ পথে এগোনোর অনুপ্রেরণা হারাচ্ছে। এ অবস্থায় ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষা, সাংস্কৃতিক চর্চা, সামাজিক মূল্যবোধের পুনর্জাগরণ- এই তিনটি শক্তিই হতে পারে অপরাধমুক্ত সমাজ গঠনের ভিত্তি।
যুবসমাজের ভূমিকা: অপরাধ দমনে যুবসমাজের ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। আজকের তরুণ প্রজন্মই আগামী দিনের রাষ্ট্র ও সমাজের নেতৃত্ব দেবে। কিন্তু অনেক তরুণ অবসাদ, বেকারত্ব বা মাদকাসক্তির কারণে অপরাধের দিকে ঝুঁকছে।
অন্যদিকে ইতিবাচক দিক হলো: যদি এই তরুণ সমাজকে সঠিকভাবে পরিচালিত করা যায়, তবে তারাই হতে পারে অপরাধবিরোধী আন্দোলনের অগ্রদূত।
প্রতিটি এলাকায় তরুণদের নেতৃত্বে 'জননিরাপত্তা কমিটি' 'মাদকবিরোধী টিম' বা 'তরুণ সচেতনতা ক্লাব' গঠন করা যেতে পারে। তারা প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে এলাকার নিরাপত্তা রক্ষায় কাজ করতে পারে।
একই সঙ্গে খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কার্যক্রম ও স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজে তরুণদের সম্পৃক্ত করতে হবে। কারণ ব্যস্ত, সচেতন ও ইতিবাচক তরুণ মানেই অপরাধ প্রতিরোধের এক অদৃশ্য প্রাচীর।
সমষ্টিগত উদ্যোগই সমাধান: দেশের শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজন সমষ্টিগত উদ্যোগ। প্রশাসন, জনগণ, স্থানীয় সরকার, গণমাধ্যম, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষাঙ্গন সবাইকে যুক্ত হতে হবে এই লড়াইয়ে।
সাহস ও ঐক্যই সমাজের শক্তি: একটি সমাজ তখনই অপরাধমুক্ত হয় যখন জনগণ সাহসিকতার সঙ্গে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়। ইতিহাসে এমন অনেক উদাহরণ রয়েছে, যখন সাধারণ মানুষ ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিবাদ করেছে, তখন বড় বড় অপরাধচক্রও ধ্বংস হয়েছে।
আমরা ভুলে গেলে চলবে না 'প্রশাসন আইন প্রয়োগ করে, কিন্তু সমাজ রক্ষা করে জনগণ। 'তাই কেবল সরকারি উদ্যোগ নয়, নাগরিক চেতনা ও সামাজিক দায়বদ্ধতাই পারে এই দুর্বৃত্ত চক্রকে মোকাবিলা করতে।
অপরাধ দমনে যদি আমরা সবাই এক কণ্ঠে বলি 'না', যদি প্রতিটি মানুষ নিজের এলাকাকে নিজের ঘর মনে করে পাহারা দেয়, যদি আমরা অন্যায় দেখলে চুপ না থেকে প্রতিবাদ করি, তবেই প্রকৃত পরিবর্তন আসবে।
আমরা আজ এমন এক সময়ে আছি, যখন প্রশাসনের সীমাবদ্ধতা, বিচারব্যবস্থার জটিলতা ও সামাজিক অবক্ষয় একত্রে অপরাধের বিস্তার ঘটাচ্ছে। কিন্তু এই পরিস্থিতিতে হতাশ হওয়ার কিছু নেই। কারণ সমাধানের চাবিকাঠি আমাদের হাতেই জনগণের ঐক্য, সচেতনতা ও সাহসিকতায়।
চলুন, আমরা প্রশাসনের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল না থেকে নিজেরাও দায়িত্ব নিই। নিজেদের এলাকাকে নিরাপদ রাখি, অপরাধীদের প্রতিরোধ করি, সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়াই। তবেই দেশে প্রতিষ্ঠিত হবে শান্তি, নিরাপত্তা ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজব্যবস্থা।
আমাদের প্রত্যেকের ছোট ছোট উদ্যোগই একদিন বড় পরিবর্তনের সূচনা করবে। একসাথে, ঐক্যবদ্ধভাবে, সাহসিকতার সঙ্গে, অপরাধমুক্ত ও শান্তিপূর্ণ বাংলাদেশ গড়াই আমাদের অঙ্গীকার।
জেএইচআর