সব দোষ কি এনসিপির, নাকি এই প্রজন্মের রাজনীতিকেই আমরা বুঝিনি?

হাশেম রেজা প্রকাশিত: অক্টোবর ২৮, ২০২৫, ০৫:২২ পিএম

এই দেশের ইতিহাসে তরুণেরা বারবার পরিবর্তনের শপথ নিয়েছে, কিন্তু ক্ষমতার ইতিহাসে তাদের অবস্থান রয়ে গেছে প্রান্তে। আন্দোলনের শুরুতে তারা থাকে উদ্দীপ্ত, সাহসী, অগ্রগামী; কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাদের শক্তি ছিটকে পড়ে রাজনৈতিক লেনদেনের মাঠে। আজ সেই পুরোনো গল্পই যেন নতুন করে ফিরে এসেছে-নাম পাল্টে, রূপ বদলে, 'এনসিপি' নামে।

তরুণদের স্বপ্ন থেকে ক্ষমতার সিঁড়িতে: ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের সময় মানুষ দেখেছিল এক ভিন্ন তরুণ প্রজন্মকে। যারা ভয় পেত না, শাসনের নিপীড়ন ভেঙে রাজপথে বেরিয়ে এসেছিল নতুন বাংলাদেশ গড়ার আশায়। জনগণও তাদের পাশে দাঁড়িয়েছিল-কারণ তারা ছিল 'নতুন মুখ', 'নতুন আশা'। শেখ হাসিনার দীর্ঘ কর্তৃত্ববাদী শাসনের দমবন্ধ করা পরিবেশে এই তরুণদের দেখা দিয়েছিল মুক্তির প্রতীক হিসেবে। কিন্তু আজ, মাত্র এক বছর পরেই, সেই তরুণদের রাজনীতি নিয়ে মানুষের মুখে প্রশ্ন-'তারা কী অন্যদের চেয়ে আলাদা?'

সংস্কারের নামেই পুরোনো বন্দোবস্ত: অভ্যুত্থানের পরে যে ‘সংস্কারপ্রক্রিয়া’ শুরু হয়েছিল, সেটি প্রথমে ছিল এক নৈতিক দাবির আন্দোলন-বৈষম্যের বিরুদ্ধে, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের জন্য।

কিন্তু ধীরে ধীরে সেই সংস্কার পরিণত হয় পুরোনো রাজনৈতিক লেনদেনের আরেক সংস্করণে। কে সংসদে যাবে, কে পদ পাবে, কার সঙ্গে আসন সমঝোতা হবে-এই হিসাবের ভেতরে হারিয়ে যায় অভ্যুত্থানে নিহত শ্রমজীবী, পথশিশু, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা।
যারা রাজনীতির ভিত্তি হওয়ার কথা ছিল, তারা হয়ে যায় প্রান্তিক পরিসংখ্যান।

এনসিপি: এনসিপি নিজেদের 'মধ্যপন্থী' রাজনৈতিক দল বলে ঘোষণা করেছিল-যেন দুটি চরম অবস্থার মাঝখানে একটি নতুন পথ। কিন্তু মধ্যপন্থা যদি হয় অবস্থানহীনতার নাম, তাহলে সেটি কেবল বিভ্রান্তির আরেক রূপ। মানুষ চেয়েছিল নতুন রাজনৈতিক চিন্তা-যেখানে নাগরিক অধিকার, অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার, সংখ্যালঘু ও শ্রমজীবী মানুষের কথা থাকবে।

কিন্তু দলীয় কর্মসূচিতে সেসবের ছিটেফোঁটাও দেখা যায়নি। বরং তারা এমন সব অবস্থান নিয়েছে, যা দক্ষিণপন্থী দলগুলোর বক্তব্যের সঙ্গে প্রায় অভিন্ন। এমনকি 'মার্চ টু গোপালগঞ্জ' কর্মসূচির মতো পদক্ষেপে অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন-এটা কি তাদের নিজস্ব আন্দোলন, নাকি অন্য কারও রাজনীতির এজেন্ডা?

পাঁচ তারকা হোটেলে ইফতার আর সাধারণ মানুষের বিভ্রান্তি: গণ-অভ্যুত্থানে সাধারণ মানুষ যে ত্যাগ ও অংশগ্রহণ দেখিয়েছিল, সেটি ছিল ঐতিহাসিক। কিন্তু সেই মানুষ যখন দেখল, একই তরুণ নেতৃত্ব রাজধানীর অভিজাত হোটেলে ইফতার আয়োজন করছে, তখন বিভ্রান্তি জন্ম নেয়। যাদের হাতে তারা রুটি, ত্রাণ আর আশার প্যাকেট তুলে দিয়েছিল, তাদেরকেই এখন মনে হয় দূরের, প্রভাবশালী রাজনীতিক। এই বৈপরীত্যই এনসিপির সবচেয়ে বড় ক্ষতি করেছে-তাদের জনগণের দল থেকে আলাদা করে দিয়েছে।

রাজনীতির মোমেন্টাম হারানোর মূল্য: রাজনীতিতে 'সময়'হলো সবচেয়ে বড় পুঁজি।
অভ্যুত্থানের পর যে বিশাল জনসমর্থন তৈরি হয়েছিল, সেটাকে সংগঠন ও নীতির শক্তিতে রূপ দিতে ব্যর্থ হয় এনসিপি নেতৃত্ব। বরং প্রশাসনিক পদ বণ্টন, দলে দলে ভাগ, কে কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্বে থাকবেম এই ক্ষুদ্র বিষয়গুলোই হয়ে উঠল বড় আলোচ্য। ফলে আন্দোলনের প্রেরণার জায়গা ধীরে ধীরে ভরাট হয়ে যায় ক্ষমতার লোভে।

ধর্ম ও সমাজের নিয়ন্ত্রণে অতি দক্ষিণপন্থার উত্থান: এনসিপি নেতৃত্ব ব্যস্ত থাকাকালীন সময়েই সমাজে এক অদ্ভুত পরিবর্তন ঘটতে শুরু করে। মাজার ভাঙা, নারীর পোশাক নিয়ে হেনস্তা, স্বাধীন চিন্তার ওপর আক্রমণ-এসব ঘটনায় দেখা যায়, রাষ্ট্র ও প্রশাসন প্রায় নীরব। এই নীরবতার সুযোগ নিয়েই অতি দক্ষিণপন্থী শক্তি নিজেদের ‘নিয়ন্ত্রক শক্তি’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে থাকে। অনেকে বলছেন, তরুণ নেতৃত্বের বিভ্রান্তি ও সরকারের নিষ্ক্রিয়তা-দুটিই মিলিয়ে সমাজকে আবার এক ধরণের রক্ষণশীল অন্ধকারে ঠেলে দিয়েছে।

তবে দোষ কি কেবল এনসিপির? আমাদের সমাজ, মিডিয়া ও বুদ্ধিজীবী অঙ্গনের মধ্যেও তো এক ধরনের চিন্তার সীমাবদ্ধতা কাজ করে। আমরা কাউকে হয় “মুক্তিদাতা” বানাই, না হয় 'দেশদ্রোহী'বলে গালি দিই। মাঝখানে কোনো ধূসর অঞ্চল রাখি না। অভ্যুত্থানের পর প্রথমদিকে এনসিপি ও তরুণ নেতৃত্বের প্রশংসায় মেতেছিল সবাই; তাদের ভুলত্রুটি কেউ দেখতে চায়নি। আজ আবার উল্টোভাবে সব দায় তাদের ঘাড়ে চাপানো হচ্ছে। এই দুই চরম অবস্থানই বাস্তব বিশ্লেষণকে ধ্বংস করে।

জেএইচআর