বিচার বিভাগের স্বাধীনতা: বাস্তবতা, জটিলতা ও সম্ভাবনা

হাশেম রেজা প্রকাশিত: অক্টোবর ২৯, ২০২৫, ১০:৫১ এএম

একটি রাষ্ট্রের টেকসই গণতন্ত্র ও ন্যায়বিচারের ভিত্তি হলো স্বাধীন বিচার বিভাগ। যেখানে বিচারকরা কোনো প্রভাব, ভয়, বা চাপের ঊর্ধ্বে থেকে ন্যায়পরায়ণতার সঙ্গে রায় দিতে পারেন; যেখানে বিচারপ্রার্থী আশ্রয় খুঁজে পায় শেষ ভরসার স্থানে।

বাংলাদেশের সংবিধানও এই নীতিকে সর্বোচ্চ মর্যাদা দিয়েছে। তবুও প্রশ্ন রয়ে গেছে আমাদের বিচার বিভাগ আসলে কতটা স্বাধীন? বিচারকরা কি প্রকৃত অর্থে নিরপেক্ষভাবে বিচার করতে পারছেন, নাকি কোথাও কোনো অদৃশ্য প্রভাব বিস্তার করছে এই প্রশ্ন আজ নাগরিক জীবনের কেন্দ্রবিন্দুতে।

বাংলাদেশের সংবিধানের ২২ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, 'রাষ্ট্রের নির্বাহী অঙ্গ হতে বিচার বিভাগের পৃথকীকরণ নিশ্চিত করার জন্য রাষ্ট্র ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।'

অর্থাৎ, সংবিধান স্পষ্টভাবে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে চেয়েছে। ২০০৭ সালে প্রশাসনিকভাবে বিচার বিভাগ পৃথক হওয়ার মধ্যদিয়ে এ লক্ষ্য আংশিক বাস্তবায়িত হয়।

কিন্তু, 'প্রশাসনিক পৃথকীকরণ' মানেই 'পূর্ণ স্বাধীনতা' নয়। প্রশ্ন থেকেই যায় বিচার বিভাগ কি এখন নির্বাহী প্রভাবমুক্তভাবে পরিচালিত হচ্ছে?

বিচারপতি ও বিচারকদের পদোন্নতি, বদলি, নিয়োগ কিংবা শৃঙ্খলাবিধি এসব ক্ষেত্রে এখনো নির্বাহী বিভাগের ছায়া প্রবল।

বিচার বিভাগের স্বাধীনতা মানে শুধু প্রশাসনিক বিচ্ছিন্নতা নয়, বরং এটি তিনটি স্তরে কার্যকর হতে হয়।

১। প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা: বিচার বিভাগ যেন নির্বাহী বা আইন প্রণেতা অঙ্গের নিয়ন্ত্রণে না থাকে।

২। আর্থিক স্বাধীনতা: বিচার বিভাগের বাজেট, ব্যয় ও উন্নয়ন যেন স্বতন্ত্রভাবে পরিচালিত হয়।

৩। বিচারিক স্বাধীনতা: বিচারক যেন কোনো ভয়, পক্ষপাত বা রাজনৈতিক চাপে নয়, বরং বিবেক ও আইনের আলোকে সিদ্ধান্ত দেন।

এই তিন দিকেই আমাদের রাষ্ট্র এখনো পূর্ণতা অর্জন করতে পারেনি।

আজকের বাংলাদেশের বিচার বিভাগ নানা সংকটের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। একদিকে আছে যোগ্য বিচারক ও আধুনিক আইনব্যবস্থার উন্নয়ন; অন্যদিকে আছে সীমাবদ্ধতা, প্রভাব ও দীর্ঘসূত্রতা।

 মামলার জট

দেশে বর্তমানে প্রায় ৪০ লাখের বেশি মামলা বিচারাধীন। একটি মামলার নিষ্পত্তি হতে কখনো কখনো ১০ বছর লেগে যায়। বিচারপ্রার্থী মানুষ হতাশ হয়ে পড়ে, ন্যায়বিচার বিলম্বিত হওয়ায় অনেক সময় তা অস্বীকৃত হয়ে পড়ে।

প্রভাব ও পক্ষপাতের অভিযোগ

বিচার বিভাগকে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ রাখার প্রশ্নে অনেকেই মনে করেন, বাস্তবতা ভিন্ন। বিচারক নিয়োগ বা পদোন্নতিতে রাজনৈতিক বিবেচনা, প্রশাসনিক প্রভাব কিংবা উচ্চপর্যায়ের নির্দেশ এসব অভিযোগ অস্বীকার করা যায় না। এমন প্রভাব বিচার বিভাগের প্রতি জনগণের আস্থা ক্ষুণ্ন করে।

বিচারকদের পেশাগত নিরাপত্তা

বিচারকরা যদি নিরাপত্তাহীনতা বোধ করেন শারীরিক, মানসিক বা প্রশাসনিক তবে স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা কঠিন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিচারককে হুমকি, বদলি বা চাপে পড়ার নানা খবর মিডিয়ায় এসেছে, যা বিচার বিভাগের স্বাধীনতার জন্য অশনি সংকেত।

বিচার বিভাগের স্বাধীনতা কেন জরুরি

একটি রাষ্ট্রে আইনশৃঙ্খলা ও ন্যায়বিচার রক্ষার শেষ আশ্রয় হলো আদালত। যদি সেই আদালতই স্বাধীন না থাকে, তবে নাগরিকদের অধিকার ও স্বাধীনতা বিপন্ন হয়।

স্বাধীন বিচার বিভাগ, সরকারের কর্মকাণ্ডের ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ রাখে। সংবিধান রক্ষা করে এবং নাগরিকের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করে। বিচারপ্রার্থীর মধ্যে ন্যায়ের প্রতি আস্থা সৃষ্টি করে। রাজনীতির অতিরিক্ত প্রভাব থেকে রাষ্ট্রকে রক্ষা করে।

একজন নিরপেক্ষ বিচারক মানে হলো একটি শক্তিশালী সমাজের প্রতীক; পক্ষপাতদুষ্ট বিচার মানে অন্যায়ের বৈধতা।

স্বাধীনতার পথে প্রতিবন্ধকতা

রাজনৈতিক প্রভাব

রাজনৈতিক দলগুলো প্রায়ই বিচার বিভাগকে তাদের মতাদর্শিক স্বার্থে ব্যবহার করতে চায়। উচ্চ আদালতের কিছু রায় বা মন্তব্য অনেক সময় রাজনৈতিক ইঙ্গিত বহন করে এমন অভিযোগও উঠে আসে। এই বাস্তবতা বিচারকদের অবস্থানকে জটিল করে তোলে।

আর্থিক সীমাবদ্ধতা

বিচার বিভাগের বাজেট এখনো নির্বাহী শাখার অনুমোদনের ওপর নির্ভরশীল। এটি আর্থিক স্বনির্ভরতার পথে প্রধান বাধা। একটি স্বাধীন বিচার বিভাগের জন্য স্বতন্ত্র অর্থায়ন অপরিহার্য।

প্রযুক্তিগত ও অবকাঠামোগত দুর্বলতা

এখনো অনেক নিম্ন আদালতে ডিজিটাল মামলা ব্যবস্থাপনা, পর্যাপ্ত কর্মী বা প্রশিক্ষণ নেই। বিচারকদের ওপর মামলার চাপ অতিমাত্রায়। এই সীমাবদ্ধতা ন্যায়বিচারকে বিলম্বিত করে।

সব সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও বাংলাদেশের বিচার বিভাগের ভেতরে পরিবর্তনের ধারা দৃশ্যমান। ভার্চুয়াল আদালত ব্যবস্থা করোনাকালে যে উদ্ভাবন ঘটেছে, তা এখনো অব্যাহত রয়েছে। বিচারকদের প্রশিক্ষণ ও ডিজিটাল ডেটাবেস তৈরির কাজ চলছে।

বিচারপতি নিয়োগে যোগ্যতা, সততা ও দক্ষতা-কে অগ্রাধিকার দেওয়ার চিন্তাও এখন আলোচনায়।

নিম্ন আদালতের সংস্কার পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে মামলার জট অনেকাংশে কমবে।

এই পদক্ষেপগুলো যদি ধারাবাহিকভাবে কার্যকর হয়, তবে বিচার বিভাগের প্রতি জনগণের আস্থা ফিরবে।

একজন বিচারকের হাতে রয়েছে অসীম ক্ষমতা একটি রায়ের মাধ্যমে তিনি কারও ভাগ্য নির্ধারণ করতে পারেন। তাই তার নৈতিক দৃঢ়তা ও বিবেকের স্বাধীনতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

সুপ্রিম কোর্টের প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি লতিফুর রহমান একবার বলেছিলেন, 'বিচারক যখন রায় দেন, তখন তার সামনে থাকে কেবল আইন ও বিবেক; অন্য কোনো শক্তি নয়।'

এই কথাটি আজও প্রাসঙ্গিক। বিচারক যদি ভয়মুক্ত না থাকেন, তবে আইন ও ন্যায়বিচার কখনোই তার পূর্ণতা পাবে না।

স্বাধীন বিচার বিভাগ মানে শুধু বিচারকদের স্বাতন্ত্র্য নয় এটি সরাসরি নাগরিক কল্যাণের সঙ্গে যুক্ত।

যেখানে বিচারক স্বাধীন, সেখানে নিরপরাধ মানুষ অন্যায়ের শিকার হয় না, দুর্বলরা শক্তিশালীর কাছে নত হয় না, নারী, শিশু ও দরিদ্ররা আদালতে ন্যায্য সুরক্ষা পায়, বিচার দ্রুত ও সাশ্রয়ী হয়।

অন্যদিকে, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নষ্ট হলে বিচার বিলম্বিত হয়, দুর্নীতি বাড়ে, এবং মানুষ নিজের হাতে আইন তুলে নেয়। তখন সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়, যা রাষ্ট্রের জন্য বিপজ্জনক।

বিচার বিভাগের স্বাধীনতা কেবল সরকারের দায়িত্ব নয়; এটি নাগরিক সচেতনতারও বিষয়। জনগণ যদি বিচারপ্রার্থীদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন থাকে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, দুর্নীতিকে না বলে তাহলেই বিচার বিভাগ শক্তিশালী হয়। একটি ন্যায়নিষ্ঠ সমাজ গড়ে তুলতে বিচার বিভাগ ও জনগণ দুজনই পরস্পর সম্পূরক।

স্বাধীন বিচার বিভাগ একটি জাতির বিবেক। এটি রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ নয়, বরং ন্যায়বিচারের প্রাণ।

বাংলাদেশের সংবিধান, জনগণের আশা এবং শহীদদের রক্তে গড়া স্বাধীনতার আদর্শ—সবকিছুই বলে, বিচার বিভাগকে হতে হবে সত্যিকার অর্থে স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও ভয়মুক্ত।

তবে এই স্বাধীনতা রাতারাতি আসে না; এটি অর্জন করতে হয় সততা, সাহস ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের মাধ্যমে। বিচার বিভাগকে মুক্ত রাখতে হবে রাজনীতির প্রভাব থেকে, প্রশাসনিক চাপ থেকে, এবং ব্যক্তিগত স্বার্থের ছায়া থেকে।

যেদিন আমাদের আদালত 'সত্য ও ন্যায়ের' একমাত্র আশ্রয় হয়ে উঠবে, যেদিন বিচারকরা কেবল আল্লাহ, আইন ও বিবেকের সামনে জবাবদিহি অনুভব করবেন সেদিনই আমরা বলতে পারব, 'হ্যাঁ, আমাদের বিচার বিভাগ সত্যিই স্বাধীন, এবং এই স্বাধীনতার সুফল ভোগ করছে এ দেশের প্রতিটি মানুষ।'

বিচার বিভাগের স্বাধীনতা রক্ষা মানে রাষ্ট্রের আত্মাকে রক্ষা করা। এটি কেবল বিচারকদের প্রশ্ন নয়, এটি পুরো জাতির নৈতিক দায়িত্ব। ন্যায় ও সত্যের পথে দৃঢ় থাকলেই গড়ে উঠবে একটি ন্যায্য, মানবিক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ।

লেখক: কলামিস্ট ও সাংবাদিক

ইএইচ