স্বাস্থ্যই সকল সুখের মূল এই প্রবাদটি শুধু নীতিকথা নয়, মানবজীবনের বাস্তব সত্য। একটি জাতির শক্তি, উৎপাদনশীলতা ও অগ্রগতির মূল নির্ভর করে জনগণের স্বাস্থ্য সুরক্ষার ওপর। কিন্তু দুঃখজনক হলো, আমরা প্রায়ই স্বাস্থ্যকে প্রাধান্য না দিয়ে সেটিকে অবহেলিত রাখি। অথচ ব্যক্তিগত ও জাতীয় উন্নয়নের জন্য স্বাস্থ্য সুরক্ষা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
অনেকে মনে করেন স্বাস্থ্য সুরক্ষা মানেই অসুস্থ হলে চিকিৎসা নেওয়া। বাস্তবে এটি একটি সমন্বিত প্রক্রিয়া যেখানে পরিচ্ছন্নতা, খাদ্যাভ্যাস, মানসিক শান্তি, শারীরিক পরিশ্রম ও সামাজিক দায়িত্ব সবকিছুই অন্তর্ভুক্ত। প্রতিরোধই হলো চিকিৎসার শ্রেষ্ঠ পথ। অর্থাৎ রোগের আগেই সচেতন হওয়া এবং সুস্থ জীবনযাপন করাই প্রকৃত স্বাস্থ্য সুরক্ষা।
স্বাস্থ্য রক্ষার প্রথম স্তর হলো ব্যক্তিগত দায়িত্ববোধ। প্রতিদিনের খাদ্যাভ্যাসে ভারসাম্য বজায় রাখা, পর্যাপ্ত পানি পান, পর্যাপ্ত ঘুম, নিয়মিত ব্যায়াম এবং মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ এসব সহজ অভ্যাসই শরীরকে রোগ প্রতিরোধে সক্ষম করে। এছাড়া নেশা, তামাক, অতিরিক্ত চিনিযুক্ত ও প্রক্রিয়াজাত খাবার থেকে দূরে থাকা জরুরি। মনে রাখতে হবে স্বাস্থ্য রক্ষা কোনো বিলাসিতা নয়; এটি নিজের প্রতি ন্যূনতম দায়িত্ব।
পরিবার হলো স্বাস্থ্য সুরক্ষার মূল ভিত্তি। সন্তানদের শৈশব থেকেই পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্যবিধি শেখানো, পরিবারের বয়স্ক সদস্যদের নিয়মিত স্বাস্থ্যপরীক্ষা করা এসবই সামাজিক দায়বদ্ধতার অংশ। সামাজিকভাবে স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি না পেলে কোনো সরকারি নীতি কার্যকর হয় না। পাড়া-মহল্লা, স্কুল, কর্মস্থল সব জায়গায় যদি স্বাস্থ্যবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা যায়, তবেই জাতি হিসেবে আমরা সুস্থতার দিকে এগোতে পারব।
স্বাস্থ্য সুরক্ষা কেবল ব্যক্তিগত বা পারিবারিক দায় নয়; এটি একটি রাষ্ট্রীয় দায়িত্বও বটে। সরকারের উচিত গ্রামীণ পর্যায়ে মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা, চিকিৎসকদের প্রাপ্যতা বৃদ্ধি, ওষুধের মান নিয়ন্ত্রণ এবং জনস্বাস্থ্য শিক্ষা জোরদার করা। প্রতিরোধমূলক টিকাদান, মাতৃ ও শিশু স্বাস্থ্যসেবা, ডেঙ্গু ও ম্যালেরিয়া প্রতিরোধ, পরিষ্কার পানি ও স্যানিটেশন এসব খাতে সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন। বিশেষ করে নিম্নআয়ের মানুষের জন্য সরকারি হাসপাতালের সেবা আরও সহজলভ্য করা জরুরি।
পরিবেশ দূষণ, বায়ু ও পানির মান, আবর্জনা ব্যবস্থাপনা এসবই সরাসরি জনস্বাস্থ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত। একদিকে যদি মানুষ পরিষ্কার খাবার ও বিশুদ্ধ পানি না পায়, অন্যদিকে যদি চারপাশের বাতাস বিষাক্ত হয়, তাহলে কোনো চিকিৎসাই দীর্ঘস্থায়ী সমাধান দিতে পারবে না। তাই নগর ও গ্রামীণ এলাকায় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, প্লাস্টিক ব্যবহার কমানো এবং সবুজায়ন বৃদ্ধির মাধ্যমে স্বাস্থ্যবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
আমরা প্রায়ই শারীরিক অসুস্থতাকে গুরুত্ব দিই, কিন্তু মানসিক স্বাস্থ্যকে উপেক্ষা করি। অতিরিক্ত কাজের চাপ, আর্থিক সংকট, সামাজিক প্রতিযোগিতা ও সম্পর্কের টানাপোড়েন মানসিক ভারসাম্য নষ্ট করছে। মন ভালো না থাকলে শরীরও সুস্থ থাকে না এই সত্যকে স্বীকার করে সমাজে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য করা জরুরি। স্কুল, কর্মক্ষেত্র ও গণমাধ্যমে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে খোলামেলা আলোচনা তৈরি করতে হবে।
বর্তমান ডিজিটাল যুগে স্বাস্থ্য সুরক্ষায় প্রযুক্তির ভূমিকা অনস্বীকার্য। অনলাইন পরামর্শ, টেলিমেডিসিন, স্বাস্থ্য অ্যাপ ও তথ্যভিত্তিক সেবা মানুষের চিকিৎসা পাওয়ার পথকে সহজ করেছে। তবে প্রযুক্তির অতিরিক্ত ব্যবহার ও অনলাইন আসক্তি যেন উল্টো স্বাস্থ্যের ক্ষতি না করে, সেটিও মাথায় রাখতে হবে।
স্বাস্থ্য সুরক্ষা মানে কেবল রোগমুক্তি নয় এটি মানবিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় অগ্রগতির প্রতীক। একজন সুস্থ মানুষই তার পরিবারকে, সমাজকে এবং রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করতে পারে। তাই স্বাস্থ্য সুরক্ষা হোক আমাদের নাগরিক দায়িত্ব, জাতীয় অঙ্গীকার এবং প্রতিদিনের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
কারণ, যে জাতি নিজের স্বাস্থ্য রক্ষা করতে জানে, সেই জাতিই টিকে থাকে সর্বাধিক শক্তিশালী, সমৃদ্ধ ও মর্যাদাবান হিসেবে।
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট
ইএইচ