বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার মূল ভিত্তি প্রাথমিক স্তর। এখান থেকেই একজন শিশু শেখে অক্ষর চিনতে, বাক্য গঠন করতে, মানুষ হয়ে উঠতে। অথচ প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা আজ এক অনাকাঙ্ক্ষিত বাস্তবতার মুখোমুখি। শ্রেণিকক্ষ ফাঁকা, কিন্তু রাজপথে ঢল নেমেছে সহকারী শিক্ষকদের। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকরা-দীর্ঘদিন ধরে রয়েছেন অবহেলার পর অবহেলায়। আজ তারা রাজপথে। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের পবিত্র প্রাঙ্গণে তাঁরা বসেছেন লাগাতার অবস্থান কর্মসূচিতে। তাদের দাবি তিনটি সরল, যৌক্তিক, ন্যায্য।
তাদের দাবি: সহকারী শিক্ষকদের দশম গ্রেডে বেতন নির্ধারণ, চাকরির ১০ ও ১৬ বছর পূর্তিতে উচ্চতর গ্রেডের জটিলতা দূর করা, শতভাগ বিভাগীয় পদোন্নতির নিশ্চয়তা প্রদান।
এ দাবিগুলো নতুন কিছু নয়। বছরের পর বছর ধরে তারা আলোচনা, দরকষাকষি, স্মারকলিপি সবই করেছেন। কিন্তু প্রতিবারই প্রতিশ্রুতির পর এসেছে নীরবতা। অবশেষে তারা বলেছেন, ‘আর আলোচনা নয়, এবার রাজপথই শেষ আশ্রয়।’
দেশে বর্তমানে ৬৫ হাজারের বেশি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কর্মরত আছেন প্রায় ৩ লাখ ৮৪ হাজার শিক্ষক। তারা শুধু পাঠদানই করেন না, স্কুল পরিচালনা, শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যনিরীক্ষা, উপবৃত্তি কার্যক্রম, নির্বাচনী দায়িত্ব সবই পালন করেন। অথচ এই বিশাল সংখ্যক শিক্ষক এখনো ১৩তম গ্রেডে পড়ে আছেন, যেখানে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক বা অন্যান্য দপ্তরের কর্মকর্তা একই শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়েই পাচ্ছেন ১০ম গ্রেড।
এই বৈষম্য শুধুই সংখ্যায় নয়-এটি একটি সামাজিক অসম্মানও। যিনি প্রাথমিক স্তরে একটি শিশুর ভবিষ্যৎ গঠনের দায়িত্বে, তিনি বেতনে এবং মর্যাদায় বারবার অবমূল্যায়িত হচ্ছেন।
বাংলাদেশ প্রাথমিক বিদ্যালয় সহকারী শিক্ষক সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ শামছুদ্দীন মাসুদ যথার্থই বলেছেন “আমরা স্নাতক ডিগ্রির পাশাপাশি প্রশিক্ষণ নিয়েছি, তবু আমাদের মূল্যায়ন কম কেন?”
প্রশ্নটা এখানেই একজন শিক্ষক যদি মর্যাদাহীন থাকে, তাহলে শিক্ষা ব্যবস্থার মর্যাদা কোথায় থাকবে?
অনেকে হয়তো বলবেন, সরকারি চাকরির গ্রেড পরিবর্তন তো অর্থনৈতিক বিষয়-তাহলে এত আবেগ কেন? কিন্তু এ আন্দোলনের গভীরে আছে দীর্ঘদিনের অবহেলা ও মানসিক ক্লান্তি। প্রতিদিন যে শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে দাঁড়িয়ে শিশুর মনে আলো জ্বালান, তাঁর নিজের জীবনে এখন অন্ধকার নেমেছে প্রশাসনিক বৈষম্যের কারণে।
এই আন্দোলন শুধু বেতন কাঠামোর নয় এটি একটি সম্মানের আন্দোলন। শিক্ষকরা এখন ন্যায্য মর্যাদার লড়াই লড়ছেন। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের পবিত্রতা যেন আজ তাদের কণ্ঠে নতুন অর্থ পেয়েছে; এখানে কোনো রাজনৈতিক স্লোগান নেই, আছে কেবল ন্যায্য দাবির সুর।
সরকার এরই মধ্যে প্রধান শিক্ষকদের ১১তম থেকে ১০ম গ্রেডে উন্নীত করেছে, কিন্তু সহকারী শিক্ষকদের ক্ষেত্রে সিদ্ধান্তটি এখনো ঝুলে আছে। অথচ প্রাথমিক শিক্ষা হলো সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার খাত। তাহলে এই অগ্রাধিকার যদি শ্রেণিকক্ষের শিক্ষক পর্যন্ত না পৌঁছায়, তবে সেটি কতটা টেকসই উন্নয়ন?
এ দেশের প্রতিটি বড় মানুষ, প্রতিটি সফল নাগরিকের পেছনে দাঁড়িয়ে আছেন একজন প্রাথমিক শিক্ষক। কিন্তু তাঁর নিজের ঘরে এখনো ছাওয়া পড়ে না। বেতনের অপ্রতুলতা, পদোন্নতির জটিলতা, মর্যাদার অভাব-সব মিলিয়ে এই শিক্ষক সমাজ এখন ক্ষুব্ধ, কিন্তু পরাজিত নয়।
রাজপথে বসা এই মানুষগুলো কোনো বিদ্রোহী নয়, তারা কেবল ন্যায়বিচারের প্রত্যাশী। তাদের হাতে বই, কণ্ঠে জ্ঞান, চোখে স্বপ্ন। আজ সেই চোখে জল, আর সেই জল যেন আমাদের বিবেককে না ডুবিয়ে দেয়।
সরকার যদি সত্যিই শিক্ষার মান উন্নয়নের কথা বলে, তবে প্রথম কাজ হওয়া উচিত শিক্ষকদের প্রতি সম্মান ও ন্যায্যতা নিশ্চিত করা। কারণ, প্রাথমিক শিক্ষকরা শুধু রাষ্ট্রীয় কর্মচারী নন-তারা জাতি গঠনের স্থপতি। তাদের মুখে হাসি ফিরলে তবেই শিক্ষা ব্যবস্থায় আলো ফিরবে।
আজ শহীদ মিনারে বসা সেই শিক্ষকরা রাষ্ট্রের কাছে প্রশ্ন রাখছেন: “আমরা যারা জাতি গড়ি, আমাদেরই কি ন্যায্য অধিকার এত কঠিন?” এই প্রশ্নের উত্তর দিতে দেরি করা মানে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি অবিচার করা।
শিক্ষকরা রাজপথে, শ্রেণিকক্ষ ফাঁকা-এই দৃশ্য সত্যিই আমাদের বিবেকে প্রশ্ন তোলে। যদি রাষ্ট্র তার শিক্ষকদের পাশে না দাঁড়ায়, তবে ভবিষ্যতের প্রজন্ম কোন নৈতিক ভিত্তির ওপর দাঁড়াবে? যারা জাতি গঠনের কাজ করেন, তাদের ন্যায্য দাবি আদায়ের জন্য রাজপথে নামতে বাধ্য করা এটা কেবল প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, এটি নৈতিক দেউলিয়াত্ব।
সম্মান, মর্যাদা ও ন্যায্য প্রাপ্যের দাবিতে শিক্ষকদের পাশে থাকা এখন আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। কারণ শ্রেণিকক্ষ নয়, রাজপথে যদি শিক্ষক দাঁড়ান তবে হারিয়ে যায় আলোর দিকনির্দেশনা। আর তখন প্রশ্নটা থেকেই যায়: “শ্রেণিকক্ষ ফাঁকা, রাজপথ ভরা শিক্ষক-এই দৃশ্য কি আমাদের লজ্জিত করে না?”
লেখক: গণমাধ্যমকর্মী।
জেএইচআর