রাস্তার বেহাল দশা ও দায়বদ্ধতার অভাব: গাড়ি মালিকদের ন্যায্য প্রশ্ন

হাশেম রেজা প্রকাশিত: নভেম্বর ৮, ২০২৫, ০৫:১৩ পিএম

বাংলাদেশে প্রতিদিনই বাড়ছে যানবাহনের সংখ্যা। রাজধানী থেকে শুরু করে উপজেলা, ইউনিয়ন এমনকি প্রত্যন্ত অঞ্চলেও ট্রাক, পিকআপ, প্রাইভেট কার ও মোটরসাইকেল চলছে কৃষি, বাণিজ্য ও যাত্রী পরিবহনের কাজে। কিন্তু গাড়ির সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে সড়কের মান উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজ যেন দিনদিন পিছিয়ে পড়ছে। অথচ প্রতি বছর দেশের হাজার হাজার গাড়ির মালিক নিয়মিতভাবে সরকারি খাতে কোটি কোটি টাকা রাজস্ব প্রদান করছেন, ট্যাক্স, ফিটনেস, রোড পারমিট, ইনস্যুরেন্স, টোকেনসহ আরও নানা খাতে। তবু প্রশ্ন থেকে যায়: এই বিপুল অঙ্কের রাজস্বের সুফল কোথায় যাচ্ছে?

রাস্তার বেহাল দশা, গর্তে ভরা সড়ক, ড্রেনের অভাব, ভাঙা ব্রিজ ও কালভার্ট যেন দেশের প্রতিটি জেলারই এক সাধারণ দৃশ্য হয়ে উঠেছে।

একজন ট্রাক মালিক প্রতিবছর প্রায় লক্ষাধিক টাকা ব্যয় করেন শুধু ট্যাক্স, ফিটনেস ও রোড পারমিট নবায়নে। তার সঙ্গে যোগ হয় যানবাহন বীমা, রেজিস্ট্রেশন ও বিভিন্ন দপ্তরের আনুষঙ্গিক ফি। প্রাইভেট কার ও পিকআপ মালিকদের ক্ষেত্রেও একই চিত্র। অনেকে সময়মতো কাগজপত্র নবায়ন না করলে পুলিশের জরিমানা ও জটিলতায় পড়েন।

কিন্তু রাজধানী ঢাকা হোক বা জেলা শহর, রাস্তাঘাটের অবস্থা প্রায় একই: ভাঙাচোরা, খানাখন্দে ভরা, বৃষ্টির পানিতে ডুবে থাকা। এসব রাস্তার কারণে গাড়ির মালিকদের প্রতি বছর লাখ লাখ টাকা অতিরিক্ত ব্যয় করতে হয় মেরামত ও যন্ত্রাংশ বদলে। অনেক সময় একটি টায়ারের আয়ুষ্কাল অর্ধেকে নেমে আসে, সাসপেনশন বা চেসিস ক্ষতিগ্রস্ত হয়, ইঞ্জিনে ঝাঁকুনি পড়ে।

একজন ট্রাক মালিক আক্ষেপ করে বলেন, আমরা যদি বছরে সব ট্যাক্স পরিশোধ করি, অথচ রাস্তা ভাঙা থাকায় গাড়ি দুই বছরেই নষ্ট হয়ে যায়, তাহলে এই ট্যাক্স দিচ্ছি কার জন্য? রাস্তাঘাটের জবাবদিহি কোথায়?

সরকারি নীতিমালায় সড়ক রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব মূলত স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (LGED), সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (RHD), এবং পৌর কর্তৃপক্ষের ওপর ন্যস্ত। কিন্তু বাস্তবে এই সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাব, দুর্নীতি, এবং কাজের নিম্নমানের অভিযোগ দীর্ঘদিনের।

একটি জেলা শহরের সড়ক সংস্কারে কোটি টাকার প্রকল্প নেওয়া হয়, কিন্তু কয়েক মাসের মধ্যেই আবার গর্ত সৃষ্টি হয়। স্থানীয় লোকজন বলেন, রাস্তা বানানোর সময় ১ ইঞ্চি বিটুমিনের জায়গায় আধ ইঞ্চি দেওয়া হয়, ফলে টেকসই হয় না।

তদুপরি, অনেক এলাকায় রাস্তা নির্মাণের সময় পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা (ড্রেন) ঠিকমতো পরিকল্পনা করা হয় না। ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই রাস্তা পানিতে তলিয়ে যায়, এবং বিটুমিন উঠে গিয়ে আবার গর্ত তৈরি হয়। এ অবস্থায় প্রশ্ন ওঠে, প্রতিটি গাড়ির মালিক যখন সরকারি রাজস্ব দিচ্ছেন নিয়মিতভাবে, তখন রাস্তার মান উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণে দায়বদ্ধতা কোথায়?

দেশে বছরে প্রায় ৪০ লাখেরও বেশি যানবাহন বিভিন্ন খাতে ফি প্রদান করে। এই বিপুল অর্থের একটি অংশ সড়ক রক্ষণাবেক্ষণে ব্যয় হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, বরাদ্দ হয় সীমিত, ব্যয়ও অনিয়মে জর্জরিত। একই রাস্তা বারবার সংস্কারের নামে টেন্ডার হয়, কিন্তু কাজের গুণগত মান পর্যালোচনার ব্যবস্থা দুর্বল। কোথাও কোথাও দেখা যায়, সংস্কারের ঠিক পরেই আবার পিচ উঠে যাচ্ছে, আর স্থানীয় কর্তৃপক্ষ পরের বর্ষার আগেই ‘নতুন টেন্ডার’এর প্রস্তুতি নিচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদি রোড মেইনটেন্যান্স প্ল্যান ছাড়া রাস্তা টিকবে না। বছর বছর প্যাচওয়ার্ক করে টাকা খরচ করলেই টেকসই হয় না।

রাস্তার এই দুরবস্থার সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী সাধারণ ট্রাক, পিকআপ ও প্রাইভেট কার মালিকরা। একদিকে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, অন্যদিকে রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয়, সব মিলিয়ে অনেক মালিক গাড়ি বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন।

যাত্রীবাহী গাড়ির মালিকরা বলেন, প্রতিদিনই সাসপেনশন ভাঙে, হুইল সেটিং বিগড়ে যায়, ব্রেকপ্যাড নষ্ট হয়। রাস্তায় গর্তে পড়লেই মনে হয় গাড়ি ভেঙে পড়বে। এ অবস্থায় অনেক চালক-সহযোগীও নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন, কারণ দুর্ঘটনার আশঙ্কা থাকে সর্বক্ষণ।

দায়বদ্ধতা ও করণীয়: সরকারি সংস্থাগুলো একে অপরের দিকে আঙুল তোলে। মন্ত্রণালয়ের দপ্তর বলে, ‘বরাদ্দ কম’; প্রকৌশল দপ্তর বলে, ‘ঠিকাদারের দোষ’; আর ঠিকাদাররা দাবি করে, ‘ড্রেনেজ ও বিদ্যুৎকাজের কারণে রাস্তা নষ্ট হয়।’ কিন্তু ভুক্তভোগী হচ্ছেন সাধারণ জনগণ, যারা রাষ্ট্রের প্রতি দায়িত্ব পালন করেন সময়মতো ট্যাক্স দিয়ে।

এখন সময় এসেছে এই খাতে সুনির্দিষ্ট জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার। প্রতিটি জেলার সড়ক সংস্কার প্রকল্পের কাজের মান ও মেয়াদ প্রকাশ্যে জানানো উচিত। জনগণের অর্থে করা প্রতিটি কাজের হিসাব জনগণের কাছেই দিতে হবে।

স্থানীয় সরকার ও সড়ক বিভাগের মধ্যে সমন্বিত রোড ম্যানেজমেন্ট সেল গঠন করা যেতে পারে, যা প্রতিটি রাস্তার অবস্থা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করবে এবং অনলাইন রিপোর্ট প্রকাশ করবে। এ ছাড়া, রোড মেইনটেন্যান্স ফান্ড যেন শুধু নামেই না থাকে, তা কার্যকরভাবে ব্যবহারের নিশ্চয়তা দিতে হবে।

বাংলাদেশের অর্থনীতি আজ কৃষি, শিল্প ও বাণিজ্যে বহুমুখী উন্নতির পথে। কিন্তু সড়কব্যবস্থার দুর্বলতা সেই অগ্রযাত্রাকে বারবার থামিয়ে দিচ্ছে। গর্তে ভরা রাস্তা শুধু গাড়ি নয়, দেশের উন্নয়নকেই ক্ষতিগ্রস্ত করছে। যদি সরকার ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো সময়মতো দায়িত্ব পালন করে, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে, তাহলে ট্যাক্স দিয়ে রাস্তায় চলা গাড়ি মালিকদের এই ভোগান্তি থেকে মুক্তি মিলবে। রাষ্ট্রের রাজস্ব জনগণের অর্থ, তাই এর প্রতিটি পয়সার জবাব জনগণের কাছেই দিতে হবে।

জেএইচআর