সুশিক্ষিত নাগরিক গড়ার পথে পরিবারই প্রথম পাঠশালা

হাশেম রেজা প্রকাশিত: ডিসেম্বর ১, ২০২৫, ০৩:৫১ পিএম

মানুষের জীবনে সবচেয়ে মূল্যবান, সবচেয়ে প্রিয়, সবচেয়ে আদরের সম্পদ হলো সন্তান। পৃথিবীর অন্য কোনো সম্পর্কের সঙ্গে এই সম্পর্কের তুলনা হয় না; এটি রক্তের, আত্মার, আবেগের এবং দায়িত্বের এক অনন্য বন্ধন। সন্তান জন্ম নেওয়ার মধ্য দিয়ে একটি পরিবারের স্বপ্ন বিস্তার লাভ করে; সে পরিবারের ভবিষ্যৎ, সমাজের সম্পদ এবং রাষ্ট্রের সম্ভাবনা। 

কিন্তু এই সন্তান যদি ভুল পথে চলে যায়, সমাজবিরোধী কাজে জড়িয়ে পড়ে বা অমানুষিক আচরণে লিপ্ত হয়, তখন পিতা মাতার হৃদয় ভেঙে যায়, জীবন ব্যথায় পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে। কত হাজার পরিবারের কষ্ট, কান্না, দুঃখের গল্প শুধু এ কারণে যে, তাদের সন্তান মানুষ হতে পারেনি।

আজকের সমাজে কিশোর অপরাধ বৃদ্ধি, মাদকাসক্তি, ইন্টারনেট আসক্তি, সহিংসতা, নৈতিক অবক্ষয় এবং মূল্যবোধের সংকট যেভাবে বাড়ছে, তাতে প্রশ্ন উঠে, সন্তান কোথায় ভুল করছে? সমাজ না পরিবার, দোষ কার? 

বিশেষজ্ঞদের মতে, সমস্যার মূল জায়গা পরিবারেই। পিতা মাতা যদি সন্তানকে যথাযথ সময় দিতে ব্যর্থ হন, তাদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি না করেন, সন্তানের চলাফেরা, মেলামেশা, অভ্যাস, বন্ধু, পড়াশোনা বা সমস্যার বিষয়ে জানতে না চান তাহলে সন্তান সহজেই ভুল পথে চলে যেতে পারে।

মূলত, পিতা মাতা এবং সন্তানের সম্পর্ক যত উন্মুক্ত, বন্ধুত্বপূর্ণ এবং মূল্যবোধসম্পন্ন হবে একটি সন্তান তত বেশি সুশিক্ষিত, সুসভ্য এবং সুনাগরিক হয়ে উঠবে। পরিবারই সন্তানের প্রথম বিদ্যালয়, এবং পিতা মাতা সেই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। তাই পরিবারভিত্তিক শিক্ষাই একটি জাতিকে বদলে দিতে পারে।

এই উপসম্পাদকীয়তে আলোচনা করা হবে সন্তানের সঙ্গে পিতা মাতার সম্পর্কের গুরুত্ব, বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণের প্রয়োজন, সন্তান কেন নষ্ট হয়: মূল কারণ, পিতা মাতার অপরাধবোধ ও ভবিষ্যৎ প্রতিক্রিয়া, বর্তমান ডিজিটাল যুগের চ্যালেঞ্জ, সুস্থ সম্পর্ক গড়তে করণীয় এবং রাষ্ট্র ও সমাজের ভূমিকা।

জন্মের পর থেকেই শিশু তার চারপাশের মানুষ থেকে শেখে হাঁটতে শেখে, কথা বলতে শেখে, হাসতে শেখে, ভালো মন্দ পার্থক্য করতে শেখে। এই শিক্ষার উৎস হচ্ছে পরিবার। গবেষণায় দেখা গেছে, একটি শিশুর চরিত্র, মানসিকতা, আচরণ, সহানুভূতি, মনোসংযোগ, আত্মবিশ্বাস ও মূল্যবোধের ভিত্তি তৈরি হয় বাড়িতে। এ ভিত্তি যদি দুর্বল হয়, স্কুল বা সমাজ কখনোই তা পুরোপুরি পূরণ করতে পারে না। সন্তান ঠিক কী করছে, কার সঙ্গে মিশছে, কোথায় যাচ্ছে, কী শিখছে এসব জানতে চাওয়া কোনো নিয়ন্ত্রণ নয়; বরং এটি দায়িত্ব। 

এখানে আত্মীয়তা নয়, যোগাযোগের গুরুত্ব বেশি। যেখানে পিতা মাতা সন্তানের সঙ্গে শুধু নির্দেশমূলক বা আদেশমূলক টোন ব্যবহার করেন, সেখানে সন্তান ভয় পায়, দূরে সরে যায়। আবার যেখানে বন্ধুত্ব নেই, সেখানে সমস্যার কথা জানাতে সন্তান দ্বিধায় পড়ে।

অনেক পিতা মাতা মনে করেন, সন্তানকে যদি বন্ধু বানানো হয়, তাহলে সে বেপরোয়া হয়ে যাবে। কিন্তু বাস্তবতা উল্টো। বন্ধুত্ব মানে শাসনহীন সম্পর্ক নয়; বরং বন্ধুত্ব মানে বিশ্বাস, খোলা কথা, আবেগী নিরাপত্তা, সহযোগিতা ও নির্দেশনা। মনোবিজ্ঞানীদের মতে, একটি সন্তান তার যে কথাটি বন্ধুকে বলে, সেটি সে কখনো প্রচলিত ‘কঠোর পিতা মাতাকে বলতে সাহস পায় না।

বন্ধুত্ব মানে সন্তানের সুখ দুঃখ শুনতে শেখা, তার সমস্যা বুঝে সমাধানে সহায়তা করা, ভুল করলে শাস্তির ভয় না দেখিয়ে ব্যাখ্যা করা, তাকে সম্মান দেওয়া এবং সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করা ও তার অনুভূতিকে গুরুত্ব দেওয়া। সন্তান যদি মনে করে আমার বাবা মা আমার পাশে আছে তাহলে সে সহজে পথভ্রষ্ট হয় না।

আজকের সমাজে সন্তান নষ্ট হওয়ার প্রধান কারণগুলো হলো, পিতা মাতার সময় না দেওয়া, অতিরিক্ত স্বাধীনতা বা অবহেলা, কঠোর শাসন ও ভয়ের সংস্কৃতি, ভাঙা পরিবার ও দ্বন্দ্বপূর্ণ পরিবেশ এবং ডিজিটাল আসক্তি। ব্যস্ততা, কাজের চাপ, মোবাইল ফোনে ডুবে থাকা সব মিলিয়ে সন্তানকে সময় দেওয়ার মতো মনোযোগ অনেক পরিবারেই নেই। সন্তান তখন মানসিকভাবে একা হয়ে পড়ে। যে সন্তানকে কেউ জিজ্ঞেস করে না কোথায় যাচ্ছ, কার সঙ্গে যাচ্ছ, কখন ফিরবে সে শিশু বা কিশোর সহজেই অনাকাঙ্ক্ষিত সঙ্গ পেতে পারে। কিছু পরিবারে সন্তান ভুল করলে শাস্তি, মারধর বা অপমান করা হয়। এতে সন্তান ভীরু হয়ে যায় এবং সত্য গোপন করতে শেখে। বাবা মায়ের ঝগড়া, বিচ্ছেদ, বিশৃঙ্খলা সন্তানের মনোজগতে গভীর প্রভাব ফেলে।

মোবাইল, ভিডিও গেম, অনলাইন অপরাধ সব শিশুদের হাতে সহজলভ্য। যদি পরিবারের নজরদারি না থাকে, বিপদ আসবেই। সব মিলিয়ে বলা যায়, পরিবারে অসচেতনতা সন্তানের অবক্ষয়ের প্রধান কারণ।

সন্তান যদি অপরাধে জড়ায়, মাদকাসক্ত হয় বা অমানবিক আচরণ করে তখন সবচেয়ে বেশি কষ্ট পিতা মাতার। তারা বলেন, আমাদের কোথায় ভুল হলো, কেন আমরা বুঝতে পারলাম না? এই আফসোস তখন আর কোনো কাজে আসে না। তাই আগেই সচেতন হওয়া প্রয়োজন। একটি সন্তান যখন অমানুষ হয়, তখন শুধুই একটি পরিবার নয় একটি সমাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, রাষ্ট্রও বিপর্যস্ত হয়।

আজকের যুগে সন্তান সামাজিক মাধ্যমে সময় দিচ্ছে, কিন্তু পরিবারকে সময় দিচ্ছে না। পিতা মাতারাও ব্যস্ত, সন্তানও ব্যস্ত। এভাবে সম্পর্ক ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে অনাচার, অশ্লীলতা, সহিংসতা, জুয়া, ভুয়া আইডি, অনলাইন বুলিং এসব সহজে পৌঁছে যায় কিশোরদের কাছে। তাই নজরদারি, নির্দেশনা ও নিয়মিত আলোচনা অত্যন্ত প্রয়োজন।

সুস্থ সম্পর্ক গড়ার করণীয় বিষয়গুলো হলো: সন্তানের সঙ্গে প্রতিদিন কিছু সময় কাটানো (প্রতিদিন ১৫ ২০ মিনিটও যদি হৃদয় খুলে কথা বলেন—সন্তান আপনাকে বিশ্বাস করতে শিখবে); সন্তানের বন্ধু বাছাইয়ের বিষয়ে আগ্রহ দেখানো (বন্ধু হলো চরিত্র গঠনের অন্যতম মাধ্যম, তাই কার সঙ্গে মিশছে—খুঁজে দেখুন); ‘কেন’ প্রশ্নটি শোনা (সন্তান যদি প্রশ্ন করে, বিরক্ত না হয়ে উত্তর দিন); ভুল করলে ভালোভাবে বুঝিয়ে দেওয়া (শাস্তি নয়, ব্যাখ্যাই পরিবর্তন আনে); সন্তানকে দায়িত্ব দেওয়া (ঘরের কাজ, পড়াশোনা, সময়ব্যবস্থাপনা—এসব শেখান); ডিজিটাল ব্যবহারে নিয়ম তৈরি করা (সময়সীমা, কনটেন্ট ফিল্টার, গাইডলাইন—এসব মানলে সমস্যা কমে) এবং নৈতিক শিক্ষা দেওয়া (সততা, ভালোবাসা, সহানুভূতি, শ্রদ্ধাবোধ—এসব শেখাতে পরিবারই প্রধান ভূমিকায় থাকে)।

কেবল পরিবার নয়; সমাজ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রের ভূমিকা আছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান মানবিকতা ও নৈতিকতার শিক্ষা, কাউন্সেলিং ব্যবস্থা এবং কিশোর অপরাধ প্রতিরোধ সেল নিয়ে কাজ করতে পারে। সমাজ কিশোরদের নিরাপদ পরিবেশ, ইতিবাচক সাংস্কৃতিক কার্যক্রম এবং খেলাধুলার সুযোগ নিশ্চিত করতে পারে। রাষ্ট্র পরিবার সচেতনতা কর্মসূচি, ডিজিটাল নিরাপত্তা শিক্ষা, কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্র এবং পিতা মাতার জন্য প্রশিক্ষণ দিতে পারে। পরিবারকে শক্তিশালী না করলে কোনো দেশ শক্তিশালী হয় না।

উপসংহার, ভালো সম্পর্ক থেকেই জন্ম নেয় ভালো মানুষ। সন্তানকে ভালো মানুষ করতে চাইলে প্রথম শর্ত তার সঙ্গে ভালো সম্পর্ক গড়া। সন্তান যেন ভয় নয়, সম্মান ও ভালোবাসায় পিতা মাতাকে দেখে। বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তাকে নিরাপদ রাখে, সঠিক পথে চালিত করে এবং সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলে। আজ যে সন্তান পরিবারকে ভালোবাসা শিখবে, আগামীকাল সে দেশকে ভালোবাসবে। আজ যে সন্তান সত্য সৎসাহস শিখবে, আগামীকাল সে রাষ্ট্রের সম্পদ হবে। পরিবারেই সুশিক্ষার সূচনা, পিতা মাতাই সেই শিক্ষার প্রথম আলোকবর্তিকা। বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কই একটি সন্তানকে মানুষ করে, আর পরিণামে সমাজকে করে সুন্দর।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট

ইএইচ