তথ্য অধিকার আইন: স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতই রাষ্ট্রের হাতিয়ার

হাশেম রেজা প্রকাশিত: ডিসেম্বর ১, ২০২৫, ০৫:০৩ পিএম

২০০৯ সালের ১ জুলাই বাংলাদেশে কার্যকর হয় তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯। একই দিনে গঠিত হয় তথ্য কমিশন, যার দায়িত্ব নাগরিককে সরকারি তথ্য পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করা, অভিযোগ মোকাবিলা করা এবং দপ্তরগুলোকে আইন অনুসরণে বাধ্য করা।

আইন অনুযায়ী, যেকোনো সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত বা সরকারি সহায়তায় পরিচালিত প্রতিষ্ঠানের তথ্য নাগরিক চাইতে পারবেন। তথ্যের আওতায় রয়েছে- দাপ্তরিক নথি, চুক্তিপত্র, প্রকল্পপ্রস্তাব, বাজেট, হিসাব বিবরণী, সরকারি অর্ডার, নীতি, ভিডিও/অডিও রেকর্ড, আলোকচিত্রসহ যেকোনো সরকারি তথ্য।

প্রতিটি অফিসকে বাধ্যতামূলকভাবে ‘দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা’ নিয়োগ করতে হবে, যিনি আবেদন গ্রহণ করবেন এবং তথ্য সরবরাহ করবেন। আইনে বলা আছে- সাধারণ ক্ষেত্রে ২০ কার্যদিবসের মধ্যে, প্রয়োজন হলে ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে, আর তথ্য গোপনীয় হলে ১০ কার্যদিবসে কারণ ব্যাখ্যা করে জানাতে হবে

এ আইনটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নীতি: প্রকাশ্য তথ্য হওয়া উচিত নিয়ম; গোপনীয়তা ব্যতিক্রম। অর্থাৎ, সরকার চাইলে তথ্য লুকোতে পারবে না; বরং সরকারি তথ্য জনগণের সম্পদ এটি ‘অধিকার’ হিসেবে বিবেচিত।

আইনটির মূল উদ্দেশ্য: নাগরিককে সচেতন করা, প্রশাসনকে জবাবদিহিতার মধ্যে আনা, সরকারি কাজের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, দুর্নীতি কমানো, ন্যায়পরায়ণ প্রশাসন গড়ে তোলা।

নাগরিকদের জন্য এর সুবিধা বহুমাত্রিক: দপ্তর বা মন্ত্রণালয়ের বাজেট বরাদ্দ দেখা যায়, প্রকল্প বাস্তবায়ন বা তহবিল ব্যবহারের তথ্য জানা যায়, সরকারি সিদ্ধান্ত সম্পর্কে জনগণের অবহিত হওয়ার অধিকার বাড়ে, সাংবাদিক, গবেষক, এনজিও, শিক্ষার্থী সবার জন্য তথ্য সংগ্রহ সহজ হয়, সুশাসন চর্চা উন্নত হয়

তথ্য অধিকার আইনের প্রয়োগে সরকার আরও স্বচ্ছ হয় এটি দেশের গণতান্ত্রিক অগ্রগতির অন্যতম শর্ত।

অধিকতর স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং নাগরিক অধিকার সুরক্ষার অন্যতম প্রধান শর্ত হলো অবাধ তথ্যপ্রবাহ। নাগরিক যেন সহজে, দ্রুত এবং বাধাহীনভাবে রাষ্ট্রীয় তথ্য পেতে পারে এ লক্ষ্যেই তথ্য কমিশন বাংলাদেশ ক্রমাগত কাজ করে যাচ্ছে। বিশেষত তথ্য কমিশনের সম্মানিত সচিব (রুটিন দায়িত্ব) নূর মো. মাহবুবুল হক এবং পরিচালক (প্রশাসন, অর্থ ও আইটি) এ কে এম আজিজুল হক-এর সক্রিয় ভূমিকা উক্ত কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করেছে। তাদের দক্ষ দিকনির্দেশনা, সার্বিক তদারকি এবং দায়িত্বশীল নেতৃত্ব তথ্য অধিকার বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।

কমিশনের কার্যক্রমে সহযোগিতা করছেন। রাষ্ট্রের তথ্য ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি, অনলাইনে আবেদন ব্যবস্থার উন্নয়ন, কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ এবং তথ্য সরবরাহে সময়সীমা নির্ধারণ এসব ক্ষেত্রেই তাদের প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

তথ্য অধিকার আইন ২০০৯ কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে হলে কেবল আইন থাকা যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন সচেতনতা, আন্তরিকতা এবং দায়িত্বশীলতার। তথ্য কমিশন সে দায়িত্ব পালন করছে নিষ্ঠা ও স্বচ্ছতার সঙ্গে। দেশের বিভিন্ন সরকারি দপ্তর, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সচেতনতা কর্মসূচি, শুনানি এবং তথ্য প্রদানকারী কর্মকর্তাদের সক্ষমতা উন্নয়নের মাধ্যমে কমিশন নাগরিকবান্ধব তথ্যপ্রবাহ নিশ্চিত করছে।

এখন সময় এই প্রক্রিয়াকে আরও বিস্তৃত করার। অবাধ তথ্যপ্রবাহ শুধু নাগরিকের অধিকার নয় এটি একটি আধুনিক, জবাবদিহিমূলক ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার অন্যতম ভিত্তি। তথ্য কমিশন যে আন্তরিকতা ও নিরলস পরিশ্রমের সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছে, তা নিঃসন্দেহে বাংলাদেশকে আরও স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রে রূপান্তরের পথ প্রশস্ত করবে।

দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নিয়োগে অনীহা: অনেক দপ্তরে এখনো সঠিকভাবে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নিয়োগ হয়নি। কোথাও নামমাত্র কর্মকর্তা থাকলেও তারা আইন সম্পর্কে প্রশিক্ষিত নন। ফলে সাধারণ মানুষের আবেদন পড়ে থাকে ধুলোয়।

২০-৩০ কার্যদিবসেও তথ্য পেতে দেরি: আইন বলছে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তথ্য দিতে হবে; কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়- আবেদন সময়মতো গ্রহণ করা হয় না, ফাইল 'প্রক্রিয়াধীন' থাকে, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা 'উর্ধ্বতন অনুমতি'র কথা বলে দেরি করেন।

গোপনীয়তার অজুহাত: যে তথ্য প্রকাশযোগ্য সেটিও অনেক সময় গোপনীয়তার অজুহাতে ফেরত দেওয়া হয়। এই প্রবণতাকে বিশেষজ্ঞরা প্রশাসনিক ‘সুচতুরতা’ হিসেবে দেখছেন।

নাগরিকের অজ্ঞতা: সাধারণ মানুষ জানেন না- কোথায় আবেদন করতে হয় কী ফরম লাগে কীভাবে তথ্য পাওয়া যায় কোন তথ্য বিনা-মূল্যে পাওয়া সম্ভব ফলে আইনটি তাদের জন্য নামমাত্র থেকে যাচ্ছে।

দরিদ্র নাগরিকের বাধা ফি ও কপি খরচ: আইনে বলা আছে অধিকাংশ তথ্য বিনামূল্যে পাওয়া যায়; কিন্তু নথির কপি বা বড় নথি চাইলে ফি লাগে। এতে দরিদ্র বা প্রান্তিক মানুষের সমস্যা আরও বাড়ে।

ধরা যাক কাশেম চাচা জানতে চাইলেন তার ইউনিয়নে রাস্তা নির্মাণ প্রকল্পে বরাদ্দ কত ছিল এবং কাজ কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে। আইন অনুযায়ী তিনি একটি আবেদন দিলেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো: কেউ আবেদন নিতে চায় না, কেউ বলে 'আমি দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নই', আবার কেউ বলে 'উর্ধ্বতনদের অনুমতি লাগবে', কেউ বলে 'তথ্য গোপনীয়' সব মিলিয়ে তথ্য পাওয়াটা হয় অসম্ভব প্রায়।

সাম্প্রতিক একটি পর্যবেক্ষণ রিপোর্ট বলছে ১৪ বছর পরেও দেশে তথ্য সচেতনতার হার উদ্বেগজনকভাবে কম। মানুষ জানে না যে সরকারি তথ্য তাদের অধিকার, অনুগ্রহ নয়।

এ বাস্তবতা আইনকে শক্তিশালী করলেও প্রয়োগকে দুর্বল করে দিয়েছে ফলে জনগণ গোপনীয়তার দেওয়ালে আটকে যাচ্ছেন।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন: তথ্য অধিকার আইন শুধু সরকারি নথি পাওয়ার আইন নয়; এটি একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার মেরুদণ্ড।

কারণ: তথ্য পাওয়া মানে সরকারকে জবাবদিহির মধ্যে আনা, বাজেট অপচয়, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি সব কমে, জনগণ সরকারের কাজে অংশগ্রহণ করতে পারে, মিডিয়া শক্তিশালী হয়, অনুসন্ধানী রিপোর্টিং বাড়ে।

যখন তথ্য উন্মুক্ত হয়, তখন প্রশাসন নিজের ভুল কমায়। কারণ নাগরিক দেখছে, প্রশ্ন করছে, দাবি করছে।

বাংলাদেশে তথ্য অধিকার আইন কার্যকর আছে- কিন্তু আইন থাকলেই হবে না, প্রয়োগ থাকতে হবে, সচেতনতা থাকতে হবে, নাগরিক চাপ থাকতে হবে।

আজকের বিশ্বে সুশাসন মানে- স্বচ্ছতা, তথ্য উন্মুক্তকরণ এবং জবাবদিহিতা। বাংলাদেশও সেই পথে এগোচ্ছে, কিন্তু গতি ধীর।

তথ্য অধিকারকে শক্তিশালী করতে হলে: দপ্তরগুলোকে প্রশিক্ষিত হতে হবে, নাগরিককে জানতে হবে কোথায় আবেদন করবেন, সাংবাদিকদের ভূমিকা বাড়াতে হবে, তথ্য কমিশনকে আরও সক্রিয় হতে হবে। 

নাগরিককে জানতে হবে: তথ্য আমার অধিকার। জানতে পারাটাই গণতন্ত্র।

যত বেশি মানুষ জানবে, তত বেশি প্রশ্ন করবে; যত বেশি প্রশ্ন বাড়বে, তত বেশি জবাবদিহি প্রতিষ্ঠিত হবে; আর জবাবদিহি যত বাড়বে, রাষ্ট্র তত হবে স্বচ্ছ, শক্তিশালী ও গণতান্ত্রিক।

তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯ বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক যাত্রায় এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। কিন্তু আইন কার্যকর না হলে তার উদ্দেশ্য পূরণ হবে না। নাগরিক, প্রশাসন ও তথ্য কমিশন: তিন পক্ষকেই আরও উদ্যোগী হতে হবে।

কারণ: তথ্যই শক্তি, আর নাগরিকের অধিকার রাষ্ট্রের শক্তির উৎস।

জেএইচআর