দুই উপদেষ্টার পদত্যাগ ও তফসিল ঘোষণার প্রাক্কালে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কোন পথে?

হাশেম রেজা প্রকাশিত: ডিসেম্বর ১০, ২০২৫, ১১:৩৯ পিএম

২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার প্রাক্কালে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে যে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে, দুই উপদেষ্টা মাহফুজ আলম ও আসিফ মাহমুদের আকস্মিক পদত্যাগ তা আরও বহুগুণ বৃদ্ধি করেছে। 

অন্তর্বর্তী সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দু’জন নীতিনির্ধারকের এই সেপারেশনকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, 'গভীর নীতিভিত্তিক মতপার্থক্য' এবং প্রক্রিয়াগত। তবে সরকারিভাবে বলা হয়েছে, এটি ব্যক্তিগত কারণেই স্বেচ্ছায় দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ানো।

এরই মধ্যে নির্বাচন কমিশন (ইসি) ঘোষণা করেছে আগামীকাল সন্ধ্যা ছয়টায় দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল প্রকাশ করা হবে। ফলে রাজনৈতিক উত্তাপ, প্রশাসনিক তৎপরতা এবং আগামী প্রজন্মের নির্বাচন আশা এখন এক সূঁচালো বিন্দুতে এসে দাঁড়িয়েছে।

গত এক দশকেরও অধিক সময় দেশের সাধারণ জনগণ যে স্বাধীন, নির্ভেজাল ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত থাকার অভিযোগ করে আসছেন, তা বর্তমান নির্বাচনকে ঘিরে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে। মাঠপর্যায়ে দেখা যাচ্ছে, গ্রামীণ চায়ের দোকান থেকে শহরের ফুটপাত একই সুরে উচ্চারিত হচ্ছে একটি বাক্য: এবার কি সত্যিই ভোট দিতে পারব?

বিশেষত অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে একটি 'পক্ষপাতশূন্য, শান্তিপূর্ণ ও ভয়মুক্ত নির্বাচনী পরিবেশ' তৈরি হবে এ প্রত্যাশা থেকেই সাধারণ মানুষ সামনের নির্বাচনের দিকে তাকিয়ে আছে। কেবলমাত্র দলীয় সমর্থক নয়, বরং নতুন ভোটার, প্রবাসফেরত তরুণ এবং নারীদের মধ্যেও ব্যালটাধিকার প্রয়োগের প্রবল আগ্রহ লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

জনমতের এই আশাবাদকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে বড় চ্যালেঞ্জ দাঁড়াবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখা, প্রশাসনিক সমন্বয় এবং রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।

অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা মাহফুজ আলম ও আসিফ মাহমুদের পদত্যাগের পেছনে নেপথ্যের কারণ নিয়ে নানা বিশ্লেষণ রয়েছে। যদিও তারা আনুষ্ঠানিকভাবে বলেছেন ব্যক্তিগত কারণ, তবু রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন উঠেছে, নির্বাচনকে ঘিরে নীতিগত মতভেদ।

অন্তর্বর্তী সরকারের কাঠামো সাধারণত দলনিরপেক্ষ, স্বচ্ছ এবং রাজনৈতিক চাপমুক্ত থাকার কথা। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ দুটি পদের অদূরপূর্ব এই শূন্যতা নির্বাচন প্রক্রিয়ার ওপর কিছুটা হলেও ছায়া ফেলেছে বলে অনেক বিশ্লেষকের মত।

এ অবস্থায় সরকারের অন্যান্য উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টা যে দ্রুত নতুন সমন্বয় বা দায়িত্ব বণ্টন করবেন তা এখন সময়ের দাবি। কারণ নির্বাচন সামনে রেখে উপদেষ্টাদের মধ্যে ধারাবাহিকতা যেকোনো অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ইসি সূত্রে জানা গেছে, ভোটগ্রহণের তারিখ, মনোনয়ন দাখিল, যাচাই, প্রতীক বরাদ্দ এবং প্রচারণা সবকিছুর সময়সূচি আগামীকাল ঘোষণা করা হবে। নির্বাচন কমিশন ইতোমধ্যে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে একাধিক সমন্বয় বৈঠক করেছে, যেখানে কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্ব পাচ্ছে

ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ: গ্রাম ও শহর উভয় এলাকার ভোটকেন্দ্রে ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরা, অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন এবং বিশেষ স্ট্রাইকিং ফোর্স রাখা হবে। সংঘর্ষপ্রবণ এলাকাগুলোকে চিহ্নিত করে সেখানে বাড়তি নজরদারি চালানো হবে।

পরিবহন ও লজিস্টিকস: ব্যালটপেপার, ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ব্যবহারের সম্ভাব্য কেন্দ্র, নির্বাচনী সামগ্রী পরিবহন এসব বিষয়ে ইতোমধ্যে প্রাথমিক রূপরেখা তৈরি হয়েছে।

প্রার্থীর নিরাপত্তা: নির্বাচনকালীন সহিংসতা এড়াতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দলবেঁধে ও ব্যক্তিগত সুরক্ষা পরিকল্পনা করেছে বলে জানা গেছে।

গণমাধ্যম পর্যবেক্ষণ ও স্বচ্ছতা: দেশি-বিদেশি পর্যবেক্ষক দলের নিবন্ধন প্রক্রিয়া চলছে। নির্বাচন কমিশন বলেছে, স্বচ্ছতার ক্ষেত্রে কোনো প্রকার সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হবে না।

আসন্ন নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা হবে সর্বোচ্চ গুরুত্বপূর্ণ। বিগত নির্বাচনী সহিংসতা, দমন-পীড়ন ও অপ্রীতিকর ঘটনার অভিজ্ঞতা থেকে এবার তারা সম্পূর্ণ নতুন কৌশলে মাঠে নামতে প্রস্তুত।

পুলিশ: ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র চিহ্নিত, নির্বাচন সপ্তাহে বিশেষ অভিযান, দলীয় সশস্ত্র গোষ্ঠী দমন পরিকল্পনা, দ্রুত অভিযান সক্ষমতা, ভয়মুক্ত পরিবেশ তৈরিতে 'জিরো টলারেন্স' নীতি, মানবাধিকার সম্মত অপারেশন নিশ্চিতে নির্দেশনা।

বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি): সীমান্তবর্তী এলাকায় নজরদারি জোরদার, অস্ত্র ও অবৈধ অর্থ প্রবাহ রোধে বিশেষ টহল।

বিশ্লেষকদের ভাষ্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যদি নিরপেক্ষ ও কঠোরভাবে মাঠে থাকে, তবে ভোটের দিন সহিংসতার আশঙ্কা অনেকটাই কমে আসবে।

বাংলাদেশের গ্রামবাংলায় দীর্ঘদিন পর নির্বাচনী উত্তাপ অনুভূত হচ্ছে। ভোটারদের বক্তব্যে পাওয়া যাচ্ছে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়: ভয়মুক্ত পরিবেশ, ভোট দিতে যেতে কোনো হুমকি বা চাপ যেন না থাকে এটাই প্রধান দাবি। দলীয় ক্যাডারমুক্ত কেন্দ্র, গত নির্বাচনের ক্যাডার-প্রবণতা যেন এবার পুনরাবৃত্তি না হয়, এই আশঙ্কা অনেক ভোটারের কণ্ঠে। স্বচ্ছ গণনা প্রক্রিয়া, ব্যালট গণনায় স্বচ্ছতা এবং রাতভর কেন্দ্র দখলের আশঙ্কা দূর এ দুটি বিষয় এখন মানুষের প্রধান উদ্বেগ। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের উপস্থিতি, অনেকেই মনে করেন, বিদেশি নজরদারি নির্বাচনকে আরও বিশ্বাসযোগ্য করবে।

দুই উপদেষ্টার পদত্যাগ নির্বাচনপূর্ব পরিস্থিতিতে রাজনৈতিকভাবে একটি 'সংকেত' বহন করে বলে বিশেষজ্ঞদের মত। এটি দেখিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকারের ভেতরেও কার্যপ্রণালি নিয়ে চাপ, বিতর্ক বা মতবিরোধ থাকতে পারে। অন্যদিকে, সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন—একটি স্বাধীন, নিরপেক্ষ ভোট সেটি কে বাস্তবে রূপ দেবে?

অন্তর্বর্তী সরকারের দৃঢ় অবস্থান, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিরপেক্ষ উপস্থিতি, নির্বাচন কমিশনের প্রশাসনিক দক্ষতা এবং রাজনৈতিক দলগুলোর সহনশীলতা—সবকিছুর সমন্বিত ফলই নির্ধারণ করবে—২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি নির্বাচন সত্যিই জনগণের প্রত্যাশার প্রতিফলন হবে কি না।

যদি এই নির্বাচন গঠনমূলক ও গ্রহণযোগ্যভাবে অনুষ্ঠিত হয়, তবে দেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি আস্থা ফিরে আসবে। অর্থনীতি, বিনিয়োগ, শিক্ষাখাত এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি দৃঢ় হবে। কিন্তু যদি নির্বাচনটি বিতর্কে জড়িয়ে পড়ে—তাহলে রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক চাপ ও আন্তর্জাতিক চাপ বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা অস্বীকার করা যায় না।

আগামীকাল তফসিল ঘোষণার মাধ্যমে দেশের রাজনীতিতে একটি নতুন অধ্যায় সূচনা হবে। বাংলাদেশের ভবিষ্যতের উন্নয়ন কোন পথে যাবে এবং গণতন্ত্র কতটা সুদৃঢ় ভিত্তিতে দাঁড়াবে—এর উত্তর লুকিয়ে আছে আসন্ন ফেব্রুয়ারির ভোটে। এক কথায় এই নির্বাচন শুধুই রাজনৈতিক ক্ষমতার লড়াই নয়; এটি জনগণের বহু প্রতীক্ষিত বিশ্বাস পুনর্গঠনের লড়াই।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট