দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসিত জীবনের অবসান ঘটিয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ঐতিহাসিক স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। ২৫ ডিসেম্বর বাংলার মাটিতে পা রাখার মধ্য দিয়ে শুধু একটি রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনই নয়, বরং বিএনপির ভেতরের দীর্ঘদিনের জমে থাকা সংকট, গ্রুপিং, বিশৃঙ্খলা ও নেতৃত্বের শূন্যতা কাটিয়ে ওঠার সম্ভাবনাও নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
বিমানবন্দর থেকে শুরু করে দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে যে উল্লাস, আবেগ ও আশার বহিঃপ্রকাশ দেখা গেছে, তা স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দেয় তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন বিএনপির জন্য একটি টার্নিং পয়েন্ট হতে পারে।
বিগত বছরগুলোতে বিএনপির রাজনীতিতে সবচেয়ে বড় যে অভিযোগটি উঠে এসেছে, তা হলো দলীয় শৃঙ্খলার অভাব। দলের পরিচয় ব্যবহার করে দখলবাজি, চাঁদাবাজি, অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং গ্রুপিংয়ের রাজনীতি দলের ভাবমূর্তিকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
মাঠপর্যায়ের অনেক ত্যাগী নেতাকর্মী প্রকাশ্যে ও অপ্রকাশ্যে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন যে, একটি বিশেষ শ্রেণির লোক দলীয় পরিচয়কে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করেছে। এর ফলে সাধারণ মানুষও বিএনপির আচরণ ও কর্মকাণ্ড নিয়ে অসন্তুষ্ট হয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনকে অনেকেই দেখছেন ‘শুদ্ধি অভিযানের’ সূচনাবিন্দু হিসেবে। দলের সিনিয়র নেতৃবৃন্দ প্রকাশ্যে আশাবাদ ব্যক্ত করছেন যে, সরাসরি মাঠে উপস্থিত থেকে নেতৃত্ব দেওয়ার মাধ্যমে তারেক রহমান দলীয় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে পারবেন। তাঁর স্পষ্ট নির্দেশনা, কঠোর অবস্থান এবং সাংগঠনিক পুনর্গঠন বিএনপির ভেতরের গ্রুপিং রাজনীতি কমিয়ে আনতে পারে এমন প্রত্যাশা এখন দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে প্রবল।
তারেক রহমান নিজেও বিভিন্ন সময়ে স্পষ্ট করেছেন, বিএনপি কোনো দখলবাজ, চাঁদাবাজ বা অপরাধীদের আশ্রয়স্থল হতে পারে না। দলকে জনগণের আস্থা ফেরাতে হলে আগে নিজেদের ঘর গোছাতে হবে এই বার্তাই তিনি বারবার দিয়েছেন।
স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর তার প্রথম দিকনির্দেশনাগুলোর মধ্যেই দলীয় শৃঙ্খলা, আচরণবিধি এবং জনবান্ধব রাজনীতির ওপর জোর দেওয়ার বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্ব পাচ্ছে।
এদিকে তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তনের আবেগঘন একটি দিক হলো মা, সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ।
তিনবারের প্রধানমন্ত্রী, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সহধর্মিণী বেগম খালেদা জিয়া বর্তমানে ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। দীর্ঘ সময় পর মায়ের শারীরিক খোঁজখবর নেওয়া এবং সন্তান হিসেবে পাশে থাকার বিষয়টি সাধারণ মানুষের মাঝেও আবেগের সৃষ্টি করেছে। অনেকেই এটিকে একটি মানবিক ও রাজনৈতিক বার্তার সম্মিলন হিসেবে দেখছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তারেক রহমানের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো দলের ভেতরের বিভাজন ভুলে সবাইকে এক কাতারে আনা। বিএনপির ইতিহাসে দেখা গেছে, সংকটকালে ঐক্যবদ্ধ হলে দলটি ঘুরে দাঁড়াতে সক্ষম হয়েছে।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সালে অনুষ্ঠেয় জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও একই সঙ্গে গণভোটকে সামনে রেখে এই ঐক্য আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজনের কথা বারবার বলছে। ভোটারদের নিরাপত্তা, ভোটকেন্দ্রে অবাধ যাতায়াত এবং ব্যালটের মাধ্যমে মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে বিএনপি যদি নিজেদের ভেতরের বিশৃঙ্খলা কাটিয়ে একটি শৃঙ্খলাবদ্ধ, দায়িত্বশীল রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে নিজেদের উপস্থাপন করতে পারে, তবে জনগণের আস্থা অর্জন করা অসম্ভব হবে না।
দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা যাচ্ছে, তাদের প্রত্যাশা খুব স্পষ্ট আইনশৃঙ্খলা, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা। তারা এমন একটি রাজনৈতিক নেতৃত্ব চায়, যারা ক্ষমতায় গেলে দলীয় লোকদের অনিয়ন্ত্রিত আচরণ প্রশ্রয় দেবে না। তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তনের মাধ্যমে সেই প্রত্যাশা পূরণের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে বলেই অনেকেই মনে করছেন।
তবে আশাবাদের পাশাপাশি বাস্তবতার কথাও মনে করিয়ে দিচ্ছেন বিশ্লেষকরা। শুধুমাত্র একজন নেতার প্রত্যাবর্তনেই রাতারাতি সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে এমন ভাবা অবাস্তব। প্রয়োজন ধারাবাহিক সাংগঠনিক সংস্কার, তৃণমূল পর্যায়ে শক্তিশালী নেতৃত্ব তৈরি এবং অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা।
তারেক রহমান যদি এই জায়গাগুলোতে কঠোর হন, তবে বিএনপির ভেতরের ক্ষোভ প্রশমিত হবে এবং জনগণের অসন্তুষ্টিও ধীরে ধীরে কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে।
সব মিলিয়ে, তারেক রহমানের ঐতিহাসিক স্বদেশ প্রত্যাবর্তন বিএনপি ও বাংলাদেশের রাজনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এটি একদিকে যেমন দলের ভেতরে নতুন উদ্দীপনা ও উল্লাস সৃষ্টি করেছে, অন্যদিকে তেমনি সামনে এনে দিয়েছে বড় ধরনের দায়িত্ব। গ্রুপিং, দখলবাজি, চাঁদাবাজি ও বিশৃঙ্খলার রাজনীতি বন্ধ করে একটি শৃঙ্খলাবদ্ধ, গণমুখী রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপিকে প্রতিষ্ঠা করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
বাংলাদেশের জনগণ তাকিয়ে আছে এই প্রত্যাবর্তন কি শুধু আবেগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি সত্যিই আইনশৃঙ্খলা, নিরাপত্তা ও সুশাসনের পথে একটি বাস্তব পরিবর্তনের সূচনা করবে। আগামী নির্বাচন ও গণভোট সেই প্রশ্নেরই উত্তর দেবে।
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিষ্ট
ইএইচ