তারেক রহমানের দেশে ফেরা, বাংলাদেশ ও ভারতের রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ

হাশেম রেজা প্রকাশিত: ডিসেম্বর ২৬, ২০২৫, ১০:২০ এএম

প্রায় সতেরো বছর। এই দীর্ঘ সময়জুড়ে ঢাকার দেয়াল, মিছিল আর পোস্টারে মুখটি ছিল পরিচিত, কিন্তু কণ্ঠস্বর ছিল অনুপস্থিত। অবশেষে সেই নীরবতার অবসান ঘটিয়ে দেশে ফিরেছেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। 

সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জ্যেষ্ঠ পুত্র, একসময় যাকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ডার্ক প্রিন্স বলা হতো, তিনি স্বেচ্ছা নির্বাসনের অবসান ঘটিয়ে বৃহস্পতিবার ঢাকায় পা রাখলেন। এই প্রত্যাবর্তন শুধু বিএনপির জন্য নয়, সহিংসতায় ক্ষতবিক্ষত বাংলাদেশের রাজনীতি এবং দক্ষিণ এশীয় ভূরাজনীতির জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়।

তারেক রহমানের রাজনৈতিক জীবন বিতর্কের আবরণে ঢাকা। ২০০১ থেকে ২০০৬ সালের শাসনামলে ক্ষমতার কেন্দ্রে তার প্রভাব, দুর্নীতির অভিযোগ এবং ২০০৭ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিদেশে অবস্থান, সব মিলিয়ে তিনি ছিলেন আলোচিত ও সমালোচিত এক চরিত্র। দীর্ঘদিন লন্ডনে নির্বাসিত থেকে বিএনপির সাংগঠনিক নেতৃত্ব দিলেও দেশে সরাসরি উপস্থিতি না থাকায় দলটি কার্যত নেতৃত্বশূন্যতার সংকটে ভুগছিল। সেই প্রেক্ষাপটে তার প্রত্যাবর্তন বিএনপির ভেতরে নতুন প্রাণসঞ্চার করেছে। এই ফিরে আসা এমন এক সময়ে ঘটল যখন বাংলাদেশ সামনে দাঁড়িয়ে আছে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় নির্বাচনের। 

ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠেয় নির্বাচন ঘিরে রাজপথ উত্তপ্ত, রাজনৈতিক সহিংসতা বেড়েছে এবং আস্থার সংকটে ভুগছে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া। এই বাস্তবতায় তারেক রহমানের সরাসরি উপস্থিতি বিএনপির কৌশল, কর্মসূচি ও নির্বাচনী প্রস্তুতিকে নতুনভাবে গতি দেবে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

বিএনপির তৃণমূলের কাছে তারেক রহমান শুধু একটি নাম নন, তিনি দলীয় ঐতিহ্যের ধারক। জিয়াউর রহমানের উত্তরাধিকার ও খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক সংগ্রামের প্রতীক হিসেবে তাকে দেখা হয়। দীর্ঘ নির্বাসনের কারণে দলের মধ্যে যে হতাশা ও বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছিল, তার প্রত্যাবর্তনে তা অনেকাংশে কাটবে বলেই ধারণা। একই সঙ্গে দলীয় শৃঙ্খলা ফেরানো এবং অভ্যন্তরীণ কোন্দল সামাল দেওয়ার বড় চ্যালেঞ্জও তার সামনে। তবে এই প্রত্যাবর্তনের প্রভাব কেবল বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ নয়। প্রতিবেশী ভারতও বিষয়টি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। 

দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা, সীমান্ত স্থিতিশীলতা এবং আঞ্চলিক কূটনীতির দিক থেকে বাংলাদেশ ভারতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিন ধরে দিল্লির সঙ্গে বিএনপির সম্পর্ক ছিল টানাপোড়েনের। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তারেক রহমানের বক্তব্য ও বার্তায় একটি বাস্তববাদী সুর লক্ষ্য করা গেছে, যেখানে তিনি প্রতিবেশীদের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ ও পারস্পরিক স্বার্থভিত্তিক সম্পর্কের কথা বলেছেন।

ভারতের দৃষ্টিকোণ থেকে তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন ভালো খবর বলেই বিবেচিত হতে পারে। কারণ একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন বাংলাদেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য জরুরি। রাজনৈতিক বিরোধ যত শক্তিশালী ও সংগঠিত হবে, গণতান্ত্রিক কাঠামো তত মজবুত হবে এবং এটাই আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য সহায়ক। দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতির একপাক্ষিকতার অভিযোগে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তা কমাতে একটি কার্যকর বিরোধী শক্তির উপস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ। অবশ্য তারেক রহমানের সামনে পথ মোটেও সহজ নয়। 

অতীতের বিতর্ক, আইনি জটিলতা ও আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি সব মিলিয়ে তাকে অত্যন্ত সতর্কভাবে পা ফেলতে হবে। দেশে ফিরে তিনি যদি প্রতিহিংসার রাজনীতির বদলে সংলাপ, সহনশীলতা ও সাংবিধানিক পথে অগ্রসর হন, তবে তাঁর এই প্রত্যাবর্তন সত্যিই একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে পারে।

বাংলাদেশের রাজনীতি আজ এক সন্ধিক্ষণে। সহিংসতা, অনাস্থা ও অনিশ্চয়তার আবহে তারেক রহমানের ফিরে আসা অনেকের কাছে আশার আলো, আবার কারও কাছে শঙ্কার নাম। তবে এটুকু নিশ্চিত, এই প্রত্যাবর্তন দেশের রাজনৈতিক সমীকরণ বদলে দেবে। বিএনপি নতুন করে সংগঠিত হবে, নির্বাচন আরও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হবে এবং আঞ্চলিক রাজনীতিতেও এর ঢেউ লাগবে। 

ডার্ক প্রিন্স কি এবার নিজেকে রূপান্তরিত করবেন একজন পরিণত ও দায়িত্বশীল রাজনৈতিক নেতা হিসেবে? সেই প্রশ্নের উত্তর দেবে সময়। তবে ইতিহাসের এই মুহূর্তে তার দেশে ফেরা বাংলাদেশের গণতন্ত্র এবং একই সঙ্গে ভারতের আঞ্চলিক স্বার্থের জন্যও এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হয়ে থাকল।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট

ইএইচ