হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির ছায়ায় ভারতের খ্রিষ্টান সম্প্রদায়, সংকুচিত হচ্ছে ধর্মীয় স্বাধীনতা

হাশেম রেজা প্রকাশিত: ডিসেম্বর ২৭, ২০২৫, ১২:৪৯ পিএম

ভারতের বহুত্ববাদী সমাজব্যবস্থায় ধর্মীয় সহাবস্থান দীর্ঘদিন ধরে একটি সাংবিধানিক আদর্শ হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেই আদর্শের বাস্তব রূপ ক্রমেই প্রশ্নের মুখে পড়ছে। বিশেষ করে খ্রিষ্টান সংখ্যালঘুদের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত, প্রশাসনিক আচরণ ও সামাজিক সহিংসতার মধ্যে একটি উদ্বেগজনক ধারাবাহিকতা স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

২০২৫ সালের ডিসেম্বরে কেরালার একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানে বড়দিনের ছুটি বাতিল করে কর্মীদের একটি বাধ্যতামূলক সরকারি কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়। ঘটনাটি প্রথমে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত হিসেবে ব্যাখ্যা করা হলেও, এর প্রতীকী তাৎপর্য দ্রুতই জাতীয় বিতর্কে পরিণত হয়। কারণ ২৫ ডিসেম্বর কেবল একটি সাধারণ দিন নয় খ্রিষ্টানদের কাছে এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় উৎসব। সেই দিনে বিকল্প ব্যবস্থা না রেখে উপস্থিতি বাধ্যতামূলক করা সংখ্যালঘুদের ধর্মীয় অনুভূতির প্রতি রাষ্ট্রীয় উদাসীনতার ইঙ্গিত দেয় বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

এই ঘটনাকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখার সুযোগ নেই। এর আগেও উত্তর প্রদেশে একই দিনে স্কুল খোলা রেখে শিক্ষার্থীদের রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশগ্রহণে বাধ্য করা হয়েছিল। এসব সিদ্ধান্ত একত্রে বিবেচনা করলে স্পষ্ট হয়, ধর্মীয় নিরপেক্ষতার জায়গায় ধীরে ধীরে একটি সংখ্যাগরিষ্ঠবাদী দৃষ্টিভঙ্গি প্রাধান্য পাচ্ছে।

রাষ্ট্রীয় ক্যালেন্ডার, ছুটির তালিকা কিংবা সরকারি কর্মসূচি এসব বিষয় সাধারণত নিরপেক্ষ প্রশাসনিক কাঠামোর অংশ বলে বিবেচিত হয়। কিন্তু যখন এসবের ভেতরে নির্দিষ্ট আদর্শিক প্রতীক ধারাবাহিকভাবে যুক্ত হতে থাকে, তখন তা রাজনৈতিক বার্তা বহন করে। অনেকের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে এমন এক সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি হচ্ছে, যেখানে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো একটি নির্দিষ্ট জাতীয়তাবাদী মতাদর্শের বাহক হয়ে উঠছে।

এই বাস্তবতায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়গুলো নিজেদের ক্রমশ প্রান্তিক অনুভব করছে। খ্রিষ্টানদের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও সংবেদনশীল, কারণ তাদের বিরুদ্ধে কেবল প্রতীকী উপেক্ষাই নয়, বাস্তব সহিংসতার ঘটনাও বাড়ছে।

নাগরিক অধিকার ও ধর্মীয় স্বাধীনতা নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ভারতে খ্রিষ্টানদের বিরুদ্ধে হামলার ঘটনা গত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০২৪ সালে এসব ঘটনার সংখ্যা আগের বছরের তুলনায় অনেক বেশি ছিল, যা গত এক দশকের মধ্যে অন্যতম উচ্চমাত্রা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

এই হামলাগুলোর ভৌগোলিক বিস্তারও লক্ষ্য করার মতো। উত্তর প্রদেশ, ছত্তিশগড়, রাজস্থান, হরিয়ানা ও পাঞ্জাবের মতো রাজ্যগুলোতে তুলনামূলকভাবে বেশি ঘটনার খবর পাওয়া গেছে। এসব অঞ্চলে উগ্র সংখ্যাগরিষ্ঠবাদী বক্তব্য রাজনৈতিক ভাষ্য, স্থানীয় প্রশাসন এবং কখনো কখনো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আচরণেও প্রতিফলিত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

বিজেপি-শাসিত একাধিক রাজ্যে কার্যকর থাকা ধর্মান্তর বিরোধী আইন খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের জন্য নতুন ধরনের আইনি অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। আইনগুলোর ঘোষিত উদ্দেশ্য জোরপূর্বক ধর্মান্তর রোধ হলেও, বাস্তবে সেগুলোর প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।

অনেক ক্ষেত্রে প্রার্থনা সভা, সামাজিক সেবা বা ধর্মীয় আলোচনা পর্যন্ত সন্দেহের চোখে দেখা হচ্ছে। অভিযোগ উঠেছে, এসব আইনের সুযোগ নিয়ে স্থানীয় উগ্র গোষ্ঠী ও জনতা খ্রিষ্টান যাজক ও ধর্মপ্রচারকদের হয়রানি করছে, আর প্রশাসন অনেক সময় নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করতে ব্যর্থ হচ্ছে।

ছত্তিশগড়ের বিভিন্ন ঘটনায় দেখা গেছে, সন্ন্যাসিনী ও যাজকদের গণপরিবহন কেন্দ্র বা রেলস্টেশনে আটক করা হয়েছে মানবপাচার বা জোরপূর্বক ধর্মান্তরের অভিযোগে। পরবর্তীতে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এসব অভিযোগের পক্ষে শক্ত প্রমাণ পাওয়া যায়নি। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, এই ধরনের গ্রেপ্তার একটি ভীতির পরিবেশ তৈরি করছে, যার ফলে খ্রিষ্টানরা জনপরিসরে নিজেদের উপস্থিতি সীমিত করতে বাধ্য হচ্ছে।

যখন ধর্মীয় ছুটি বাতিল, উপাসনালয়ে হামলা বা সংখ্যালঘুদের ওপর নিপীড়নকে ‘নিয়মিত খবর’ হিসেবে গ্রহণ করা শুরু হয়, তখন সেটি কেবল একটি সম্প্রদায়ের সমস্যা থাকে না। এটি রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক চরিত্র নিয়েই প্রশ্ন তোলে।

ভারতের সংবিধান প্রত্যেক নাগরিককে ধর্ম পালনের স্বাধীনতা ও সমান অধিকারের নিশ্চয়তা দেয়। কিন্তু বাস্তব অভিজ্ঞতা যদি দেখায় যে এসব অধিকার রাজনৈতিক পরিচয় বা সংখ্যাগত অবস্থানের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে, তবে তা দীর্ঘমেয়াদে সমাজের জন্য ক্ষতিকর।

কেরালায় বড়দিনের ছুটি বাতিলের ঘটনা, উত্তর ভারতে খ্রিষ্টানদের ওপর বাড়তে থাকা সহিংসতা এবং ধর্মান্তর বিরোধী আইনের বিতর্ক এসব আলাদা আলাদা ঘটনা নয়। বরং এগুলো একটি বৃহত্তর আদর্শিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়, যেখানে জনপরিসর ধীরে ধীরে সংখ্যাগরিষ্ঠের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক অগ্রাধিকারের দিকে ঝুঁকছে।

এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে তা শুধু খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের নয়, ভারতের বহুত্ববাদী গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়েই গভীর উদ্বেগ তৈরি করবে। এখনো সময় আছে রাষ্ট্র যদি সত্যিকার অর্থে সংবিধানিক মূল্যবোধকে অগ্রাধিকার দেয় এবং সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়।

জেএইচআর