বাংলাদেশে এলপিজি সংকট: সমস্যা, ধর্মঘট ও উত্তরণের পথ

হাশেম রেজা প্রকাশিত: জানুয়ারি ৮, ২০২৬, ০৪:১২ পিএম

বাংলাদেশে রান্নার জ্বালানি হিসেবে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস বা এলপিজি এখন অপরিহার্য। বিশেষ করে পাইপলাইনের গ্যাসের সংযোগ বন্ধ থাকায় দেশের একটি বিশাল জনগোষ্ঠী এই সিলিন্ডার গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। তবে গত কয়েকদিন ধরে বাজারে তীব্র এলপিজি সংকট তৈরি হয়েছে, যার ফলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি চরমে পৌঁছেছে। এই সংকট নিরসনে সরকারের জ্বালানি বিভাগ পাঁচটি বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।

বৃহস্পতিবার থেকে এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি লিমিটেড সারাদেশে এলপিজি সিলিন্ডার বিক্রি বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছে। তাদের প্রধান দাবিগুলো পূরণ না হওয়া পর্যন্ত এই ধর্মঘট চলবে বলে জানানো হয়েছে। ইতিমধ্যে ঢাকা, সিলেট, গাজীপুরসহ বেশ কিছু জেলায় সিলিন্ডার সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় খুচরা বাজারে হাহাকার শুরু হয়েছে। বিশেষ করে চট্টগ্রাম অঞ্চলে অনেক বাড়িতে চুলা জ্বলেনি বলে খবর পাওয়া গেছে।

ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, আমদানিতে জটিলতা এবং সরবরাহে ঘাটতির কারণে তারা পণ্য পাচ্ছেন না, অথচ বাজারে কৃত্রিম সংকটের অপবাদ তাদের ওপর চাপানো হচ্ছে। এই অচলাবস্থা কাটাতে বিইআরসি (BERC) এবং ব্যবসায়ী নেতাদের মধ্যে বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।

জ্বালানি বিভাগ এলপিজির সরবরাহ স্বাভাবিক করতে এবং আমদানিকারকদের উৎসাহিত করতে যে পাঁচটি পদক্ষেপ নিয়েছে, সেগুলো নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো: এলপিজি আমদানির প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে ডলার সংকট এবং ঋণপত্র বা এলসি খোলার জটিলতা। জ্বালানি বিভাগ বাংলাদেশ ব্যাংককে দ্রুত ঋণপ্রাপ্তির আবেদন নিষ্পত্তি এবং এলসি খোলার প্রক্রিয়া সহজ করার অনুরোধ জানিয়ে চিঠি দিয়েছে। এতে করে আমদানিকারকরা সময়মতো বিদেশে পণ্যের অর্ডার দিতে পারবেন এবং জাহাজ আসার গতি বাড়বে।

এলপিজিকে ‘সবুজ জ্বালানি’ হিসেবে বিবেচনা করে এর ওপর আরোপিত ভ্যাট কমানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (NBR) দেওয়া চিঠিতে বলা হয়েছে: আমদানি পর্যায়ে ভ্যাট ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করা, উৎপাদন পর্যায়ে আরোপিত সাড়ে ৭ শতাংশ ভ্যাট সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা। এই পদক্ষেপ কার্যকর হলে এলপিজির উৎপাদন ও আমদানি খরচ কমবে, যা ভোক্তাপর্যায়ে দাম কমাতে সাহায্য করতে পারে।

দেশের শীর্ষস্থানীয় পাঁচটি কোম্পানি ওমেরা, মেঘনা, যমুনা, ইউনাইটেড আই গ্যাস এবং ডেল্টা এলপিজি তাদের আমদানির সীমা বাড়ানোর আবেদন করেছিল। জ্বালানি বিভাগ এতে অনাপত্তি দিয়েছে এবং বিইআরসিকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলেছে। এর ফলে বড় কোম্পানিগুলো বাজারে চাহিদার সাথে পাল্লা দিয়ে বেশি পরিমাণ গ্যাস আমদানি করতে পারবে।

বাজারে অনেক সময় মজুদদারি বা কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়ানো হয়। এটি নিয়ন্ত্রণে জেলা ও উপজেলা প্রশাসনকে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট বা ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মন্ত্রিপরিষদ ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে যাতে সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়া যায়।

অপারেটররা আসলে কী পরিমাণ গ্যাস আমদানি করছে এবং ডিলার পর্যায়ে কতটুকু সরবরাহ করছে, তার প্রকৃত চিত্র জানতে চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরের স্টোরেজগুলো পরিদর্শনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা সরাসরি এই তদারকি করবেন। এতে সাপ্লাই চেইনের কোথায় বাধা সৃষ্টি হচ্ছে তা শনাক্ত করা সম্ভব হবে।

এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (লোয়াব) মতে, আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হলেও এর সুফল পেতে আরও কিছুদিন সময় লাগবে। কারণ বিদেশে অর্ডার দেওয়া থেকে শুরু করে জাহাজ বন্দরে পৌঁছানো এবং তা সিলিন্ডারে ভরে বাজারে ছাড়া একটি সময়সাপেক্ষ প্রক্রিয়া।

আমদানি নির্ভরতা এই সংকটের অন্যতম কারণ। যদি ডলারের বিনিময় হার স্থিতিশীল না হয় এবং ব্যাংকগুলো এলসি খুলতে গড়িমসি করে, তবে সরকারের এই পাঁচটি উদ্যোগও পুরোপুরি সফল নাও হতে পারে। এছাড়া খুচরা ও পাইকারি পর্যায়ে ব্যবসায়ীদের ‘কারসাজি’ বন্ধ করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

সরকারের উচিত দ্রুততম সময়ে আমদানিকারকদের জন্য ডলার বরাদ্দ নিশ্চিত করা এবং এনবিআরের মাধ্যমে ভ্যাট হ্রাসের ঘোষণাটি কার্যকর করা। একই সাথে ব্যবসায়ীদের ধর্মঘট প্রত্যাহারে কার্যকর আলোচনা চালিয়ে যাওয়া জরুরি। সাধারণ মানুষের কষ্ট লাঘবে সরবরাহ ব্যবস্থা বা ডিস্ট্রিবিউশন চ্যানেলে সরকারি তদারকি আরও জোরদার করা প্রয়োজন।

এলপিজি এখন আর বিলাসিতা নয়, এটি মানুষের মৌলিক চাহিদার অংশ। জ্বালানি বিভাগের নেওয়া পাঁচটি উদ্যোগ নিঃসন্দেহে ইতিবাচক, তবে এর বাস্তবায়ন কত দ্রুত হয় সেটাই দেখার বিষয়। ব্যবসায়ীদের ধর্মঘট এবং আমদানির ঘাটতি এই দুই সমস্যার সমাধান না হওয়া পর্যন্ত বাজারে স্থিতিশীলতা আসা কঠিন।

জেএইচআর