ইরান কি আবারও ১৯৭৯-এর পথে; ধর্মতান্ত্রিক রাষ্ট্রের শক্তি ও বর্তমান সংকট

আবু হাশেম রেজা প্রকাশিত: জানুয়ারি ১৫, ২০২৬, ০৪:১৩ পিএম
ছবি: সংগৃহীত

ইরান বর্তমানে তার ইতিহাসের অন্যতম এক বিপজ্জনক ও সন্ধিক্ষণের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। চার দশকেরও বেশি সময় আগে যে ইসলামি বিপ্লবের মাধ্যমে শাহ শাসনের অবসান ঘটেছিল, বর্তমানের প্রলম্বিত বিক্ষোভ সেই স্মৃতিকে বারবার সামনে নিয়ে আসছে। তেহরানের রাজপথ থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়া এই অস্থিরতা এখন আর কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটি ইরানিদের প্রাত্যহিক জীবনের অংশ এবং রাষ্ট্রযন্ত্রের জন্য এক স্থায়ী চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিশ্বজুড়ে বিশ্লেষকরা এখন একটি মৌলিক প্রশ্ন তুলছেন—ইরান কি ১৯৭৯ সালের মতো আরেকটি সফল বিপ্লবের দ্বারপ্রান্তে? তবে গভীর বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১৯৭৯ সালের শাহ শাসন আর বর্তমানের আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির নেতৃত্বাধীন শাসনব্যবস্থার মধ্যে বিস্তর ফারাক রয়েছে, যা একটি নতুন বিপ্লবের পথকে অত্যন্ত কণ্টকাকীর্ণ করে তুলেছে।

১৯৭৯ সালের বিপ্লবের সাফল্যের পেছনে একটি বড় কারণ ছিল তৎকালীন রাজা মোহাম্মদ রেজা শাহ পাহলভীর ব্যক্তিগত দুর্বলতা ও সিদ্ধান্তহীনতা। ক্যানসারে আক্রান্ত শাহ সংকটের চরম মুহূর্তে দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলেন। ১৯৫৩ সালের মতো ১৯৭৯ সালেও তিনি দেশ ছেড়ে পালিয়ে গিয়ে নিজের শাসনের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকেছিলেন।

অন্যদিকে, বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি গত তিন দশকে ইরানকে একটি ‘ধর্মতান্ত্রিক নিরাপত্তা রাষ্ট্রে’ (Theocratic Security State) পরিণত করেছেন। তাঁর নেতৃত্ব শাহর মতো নড়বড়ে নয়। খামেনি এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তুলেছেন যা সমাজের সম্মতির চেয়েও ‘দমননীতি’ বা বলপ্রয়োগের ওপর বেশি নির্ভরশীল। সংকটের মুহূর্তে এই নেতৃত্ব কখনোই পিছু হটে না, বরং অধিকতর শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে নিজেদের অস্তিত্ব জানান দেয়।

শাহ আমলের দমন ব্যবস্থা ছিল অত্যন্ত খণ্ডিত। গোয়েন্দা সংস্থা 'সাভাক' বা পুলিশ অভ্যন্তরীণ দমনে নিয়োজিত থাকলেও সেনাবাহিনী ছিল মূলত বহিঃশত্রু ঠেকানোর জন্য। সেনাবাহিনীর সদস্যদের মধ্যে আদর্শিক ঐক্যের চেয়ে সামাজিক বৈচিত্র্য বেশি ছিল। ফলে বিপ্লবের চূড়ান্ত পর্যায়ে অনেক সেনা সদস্য ও পুলিশ কর্মকর্তা বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে সংঘাত এড়িয়ে গিয়েছেন, এমনকি কেউ কেউ পক্ষ পরিবর্তনও করেছেন।

বর্তমানে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বিপরীত। ইসলামি প্রজাতন্ত্রের বর্তমান দমন কাঠামো কোনো একক প্রতিষ্ঠানের হাতে নেই, বরং এটি একাধিক কমান্ড কাঠামোর মাধ্যমে জাল বিস্তার করে আছে। এর কেন্দ্রে রয়েছে:

ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (IRGC): যারা সরাসরি সর্বোচ্চ নেতার অনুগত এবং আদর্শিকভাবে কট্টর।
বাসিজ মিলিশিয়া: সমাজের প্রতিটি স্তরে যাদের অবস্থান এবং যারা রাজপথের আন্দোলন দমনে নৃশংস ভূমিকা পালনে পিছপা হয় না।
গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক: যারা আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রতিটি আন্দোলনকারীকে শনাক্ত ও নিষ্ক্রিয় করতে সক্ষম।

এই বাহিনীর সদস্যদের আনুগত্য কেবল অর্থ বা সুবিধার ওপর নির্ভর নয়; এটি প্রজন্মগত ও আদর্শিক। তারা মনে করে, এই শাসনব্যবস্থার পতন মানে তাদের নিজেদের অস্তিত্ব এবং পরিচয়ের বিনাশ। ফলে তারা যেকোনো বিক্ষোভকে ‘বিদেশি ষড়যন্ত্র’ হিসেবে চিহ্নিত করে সর্বশক্তি দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে।

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, কেবল রাজপথের বিক্ষোভ কখনোই একটি শক্তিশালী সরকারকে হঠাতে পারে না। বিপ্লব তখনই ঘটে যখন গণ-অসন্তোষের সঙ্গে ক্ষমতাসীন এলিট বা অভিজাত শ্রেণির মধ্যে ফাটল দেখা দেয়। ১৯৭৯ সালে খামেনির নেতৃত্বে বিরোধীরা ঐক্যবদ্ধ হতে পেরেছিল এবং শাহর অনুগত অভিজাতরা দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়েছিল।

বর্তমানে ইরানে জনগণের মধ্যে ব্যাপক অসন্তোষ থাকলেও শাসনব্যবস্থার নেতৃত্বকাঠামো এখনো অটুট। নিরাপত্তা বাহিনীগুলোর মধ্যে কোনো বড় ধরনের ভাঙন বা বিদ্রোহের লক্ষণ নেই। ফলে বর্তমানের আন্দোলনগুলো শাসনব্যবস্থাকে অস্বস্তিতে ফেললেও তার ভিত্তিকে পুরোপুরি উপড়ে ফেলতে পারছে না। এই ভারসাম্য বদলাতে হলে শুধু বিক্ষোভ নয়, বরং শাসন কাঠামোর ওপর কোনো অপ্রত্যাশিত বড় ধরনের বাহ্যিক বা অভ্যন্তরীণ ধাক্কার প্রয়োজন।

অনেকের আশঙ্কা, খামেনি সরকারের পতন হলে ইরান হয়তো ইরাক বা আফগানিস্তানের মতো দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধ বা সশস্ত্র বিদ্রোহের মুখে পড়বে। তবে বিশ্লেষকরা মনে করেন, ইরানের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। ইরানের একটি শক্তিশালী ও প্রাচীন আমলাতান্ত্রিক কাঠামো রয়েছে যা বিশ শতকের শুরু থেকে নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করছে। রাষ্ট্রের সক্ষমতা এবং জাতীয় সংহতির কারণে প্রশাসনিক ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়ার সম্ভাবনা কম।

এছাড়া, মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশের তুলনায় ইরানি সমাজ ধর্মীয় চরমপন্থার চেয়ে জাতীয়তাবাদী ও রাজনৈতিক চেতনার প্রতি বেশি সংবেদনশীল। বিদেশি কোনো রাষ্ট্র বর্তমানে ইরানের অভ্যন্তরে বড় ধরনের সশস্ত্র উগ্রবাদকে দীর্ঘমেয়াদে অর্থায়ন করার মতো সামর্থ্য বা ইচ্ছা পোষণ করে না। ফলে শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন হলেও দেশটি পুরোপুরি অকার্যকর রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি কম।

ইরান বর্তমানে ১৯৭৯ সালের পুনরাবৃত্তির দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে—এই সরল বিশ্বাস বিভ্রান্তিকর হতে পারে। শাহ আমলের ইরান এবং বর্তমানের ইসলামি প্রজাতন্ত্রের ক্ষমতার চরিত্রে আকাশ-পাতাল পার্থক্য রয়েছে। বর্তমানের আন্দোলনগুলোকে যদি কেবল ১৯৭৯ সালের ছাঁচে ফেলে বিচার করা হয়, তবে ইরানের প্রকৃত বাস্তবতা বোঝা কঠিন হয়ে পড়বে। ক্ষমতার এই জটিল বিন্যাস না বুঝলে দমন-পীড়ন এবং দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তার চড়া মূল্য শেষ পর্যন্ত সাধারণ ইরানিদেরই দিতে হবে।

এএন