বাংলাদেশে চলমান অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার প্রক্রিয়া এক নতুন বাঁকে এসে দাঁড়িয়েছে। রাষ্ট্রের আমূল পরিবর্তনের লক্ষ্যে প্রস্তাবিত সংস্কার প্যাকেজ বা প্রোডাক্ট নিয়ে আয়োজিতব্য গণভোটে সরকার সরাসরি ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। সরকারের এ সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং ভবিষ্যৎ দায়বদ্ধতা নিয়ে জনমনে এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে এক গভীর বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে।
প্রশ্ন উঠছে, একটি নির্দলীয় সরকার কি এভাবে সরাসরি কোনো পক্ষ নিতে পারে? এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, যদি এ সংস্কারের পরও দেশে স্বৈরাচার ফিরে আসে, তবে এর দায়ভার কে নেবে?
অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের দাবি, তাঁরা যে সংস্কার প্রস্তাবগুলো তৈরি করেছেন, তা দেশের মঙ্গলের জন্য।
তাদের ভাষায়, এটি সরকারের নিজস্ব প্রোডাক্ট। কোনো প্রস্তুতকারক যেমন তাঁর পণ্যের গুণাগুণ প্রচার করেন, সরকারও তেমনি তাঁদের সংস্কার প্রস্তাবের সপক্ষে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন। সরকারের নীতিনির্ধারকদের যুক্তি হলো, এ সংস্কারগুলো স্বৈরাচার প্রতিরোধের কবচ হিসেবে কাজ করবে।
শেখ হাসিনার আমলের মতো শাহি দৈত্যদানব যাতে ভবিষ্যতে আর সৃষ্টি হতে না পারে, তা নিশ্চিত করতেই এ সংস্কার প্যাকেজটি জনগণের সামনে রাখা হয়েছে। তাই জনগণের কাছে এর গ্রহণযোগ্যতা আদায়ের জন্য প্রচারণা চালানোকে তারা যৌক্তিক মনে করছেন।
তবে এ যুক্তি মানতে নারাজ রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সংবিধান বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, বর্তমান সরকার কোনো রাজনৈতিক দল নয়, বরং একটি নির্দলীয় অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসন। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় গণভোটের সময় নিরপেক্ষ থাকা বা কেবল ভোট ব্যবস্থাপনায় যুক্ত থাকাই সরকারের মূল দায়িত্ব। কিন্তু যখন সরকার নিজেই একটি পক্ষের হয়ে মাঠে নামে, তখন পুরো প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
সমালোচকরা বলছেন, রাষ্ট্র সংস্কারের প্রস্তাব জনগণের ওপর চাপিয়ে দেওয়া বা একতরফা প্রচারণা চালানো এক ধরনের নৈতিক দ্বিধাচরণ। সরকার যখন নিজেই রেফারি এবং নিজেই খেলোয়াড় হয়ে ওঠে, তখন সেই নির্বাচনের বা গণভোটের গ্রহণযোগ্যতা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে।
সবচেয়ে জটিল প্রশ্নটি উঠেছে দায়বদ্ধতা নিয়ে। অন্তর্বর্তী সরকার বর্তমান সংস্কার প্রস্তাবগুলোকে স্বৈরাচার প্রতিরোধের একমাত্র পথ হিসেবে তুলে ধরছে। কিন্তু ইতিহাসের অভিজ্ঞতা বলে, অনেক সময় জনতুষ্টিবাদী বা ভালো সংস্কারের আড়ালেও স্বৈরতন্ত্রের বীজ বপন করা হতে পারে।
প্রশ্ন উঠেছে, জনগণ যদি সরকারের আহ্বানে সাড়া দিয়ে ‘হ্যাঁ’ ভোট প্রদান করে এবং এর কয়েক বছর পর যদি দেশে আবার কোনো নতুন চেহারার স্বৈরাচারী শাসন ফিরে আসে, তবে এ সংস্কারের প্রস্তুতকারক হিসেবে অন্তর্বর্তী সরকারের সদস্যরা কি সেই দায়ভার গ্রহণ করবেন?
সাধারণভাবে অনুমেয় যে, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টারা বা নীতিনির্ধারকরা ভবিষ্যতে কোনো দলীয় সরকারে অন্তর্ভুক্ত হবেন না। তারা প্রচলিত অর্থে কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য নন। এটি একটি বড় আইনি ও নৈতিক ফাঁক তৈরি করছে। রাজনৈতিক দলের জবাবদিহির ক্ষেত্রে একটি রাজনৈতিক দল ভুল সিদ্ধান্ত নিলে পরবর্তী নির্বাচনে জনগণ তাদের প্রত্যাখ্যান করতে পারে। এটিই গণতান্ত্রিক জবাবদিহির প্রাথমিক ধাপ।
অরাজনৈতিক সরকারের সীমাবদ্ধতা হলো, যারা রাজনৈতিক দলের সদস্য নন, কিন্তু বর্তমানে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকে সুদূরপ্রসারী নীতিগত সিদ্ধান্ত দিচ্ছেন, তাদের জবাবদিহি করার কোনো সুনির্দিষ্ট কাঠামো নেই। তারা পদ ছেড়ে যাওয়ার পর যদি দেশের কোনো অপূরণীয় ক্ষতি হয় বা সংস্কার ব্যর্থ হয়, তবে তাদের আইনিভাবে ধরার কোনো জায়গা থাকবে কি না, তা নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েছে।
বিচক্ষণ মহল মনে করছেন, যদি এ সরকারের ব্যক্তিরা ভবিষ্যতে কোনো দায় নিতে রাজি না থাকেন, তবে জনগণের ওপর কোনো নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া বা ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে একতরফা প্রচারণা চালানো তাদের জন্য অনুচিত। গণমানুষের দীর্ঘ লড়াই ও ত্যাগের বিনিময়ে পাওয়া এ অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর মানুষের প্রত্যাশা আকাশচুম্বী। মানুষ চায় একটি টেকসই সংস্কার, যাতে আর কোনোদিন ভোট চুরি বা শাসনের নামে শোষণ না হয়। তবে সরকার যখন নিজেই পক্ষভুক্ত হয়ে যায়, তখন সেই সংস্কারের মূল সুর, অর্থাৎ নিরপেক্ষতা এবং অন্তর্ভুক্তিতা, ক্ষুণ্ণ হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকার কেবল সংস্কার প্রস্তাবগুলো জনগণের সামনে পেশ করতে পারে, কিন্তু পাস করানোর জন্য সক্রিয় প্রচারণায় নামলে তা প্রশ্নবিদ্ধ হতে বাধ্য। কারণ, রাজনৈতিক দলগুলো সবসময় জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য থাকে, কিন্তু একটি অস্থায়ী নির্দলীয় সরকারের মেয়াদ শেষে তাদের সদস্যদের খুঁজে পাওয়া বা জবাবদিহির আওতায় আনা অসম্ভব হয়ে পড়ে। গণভোটের মাধ্যমে জনগণের ম্যান্ডেট নেওয়ার চেষ্টা নিঃসন্দেহে গণতান্ত্রিক, কিন্তু সেখানে সরকারের একপাক্ষিক অবস্থান এবং দায়মুক্তির মানসিকতা উদ্বেগের জন্ম দিচ্ছে।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন এবং তার পূর্ববর্তী গণভোট প্রক্রিয়ায় এ প্রশ্নের উত্তরগুলো পরিষ্কার হওয়া জরুরি। সংস্কার কেবল কাগজে কলমে ভালো হলেই চলে না, তার প্রয়োগ এবং বিফলতার দায়ভার নেওয়ার মতো দায়বদ্ধ পক্ষও থাকতে হয়। অন্তর্বর্তী সরকার কি সেই দায়ভার নিতে প্রস্তুত? নাকি এ প্রোডাক্ট বা সংস্কার প্রস্তাব ভবিষ্যতে কেবল একটি পরীক্ষামূলক দলিল হিসেবেই থেকে যাবে?
ইএইচ