তিনি সবারই খোদা...

শামসুল আলম প্রকাশিত: মে ১০, ২০২৬, ১২:৩২ পিএম

“আমাকে কষ্ট দিয়ে খোদার কাছে সুখ চাও? খোদা কিন্তু আমারও!”- মির্জা গালিবের এই বাক্যটির গভীর উপলব্ধি মানবসভ্যতার চিরন্তন সত্যকে অসাধারণ সরলতায় প্রকাশ করে!

এই একটি বাক্যের মধ্যেই লুকিয়ে আছে মানবজীবনের নৈতিক ভারসাম্য, অন্যায়ের পরিণতি এবং সৃষ্টিকর্তার ন্যায়বিচারের প্রতি গভীর বিশ্বাস। মানুষ প্রায়ই ক্ষমতা, অর্থ, প্রভাব কিংবা ব্যক্তিস্বার্থের মোহে ভুলে যায়- যাকে সে অন্যায়ভাবে আঘাত করছে, সেও একজন মানুষ; তারও একটি হৃদয় আছে, তারও রয়েছেন একই স্রষ্টা- যিনি সবার পালনকর্তা। পৃথিবীর আদালতকে হয়তো ফাঁকি দেওয়া যায়, মানুষের চোখে ধুলো দেওয়া যায়, কিন্তু আহত হৃদয়ের আর্তনাদকে চিরকাল স্তব্ধ রাখা যায় না।

ইতিহাস সাক্ষী- অন্যায়ের উপর কখনো স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। সাময়িকভাবে শক্তিশালী মনে হলেও অন্যায়ের ভিত সবসময়ই দুর্বল। কারণ মানুষের দীর্ঘশ্বাস, বঞ্চনার কান্না এবং নীরব অভিশাপ একসময় সমাজ, রাষ্ট্র কিংবা ব্যক্তিজীবনের দেয়ালে প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরে আসে। যাকে অন্যায়ভাবে অপমান করা হয়, যার অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়, যার হৃদয় অকারণে ভেঙে দেওয়া হয়- তার নীরব কষ্টও একসময় আকাশ স্পর্শ করে। স্রষ্টার কাছে মজলুমের ফরিয়াদ পৌঁছায় সরাসরি ,দরকার হয় না কোনো মাধ্যম কিংবা ডাকটিকিট!

আজকের পৃথিবীতে প্রায়ই দেখা যায়- ক্ষমতার লড়াইয়ে মানুষ মানুষকে ব্যবহার করছে, প্রতারণা করছে, মিথ্যা অপবাদ দিচ্ছে, হৃদয় ভাঙছে। কেউ নিজের অবস্থান শক্ত করতে অন্যের স্বপ্ন ধ্বংস করছে, কেউ নিজের স্বার্থ রক্ষায় অন্যের জীবন অন্ধকার করে দিচ্ছে। কিন্তু ইতিহাসের নির্মম শিক্ষা হলো- কারও রাত অন্ধকার করে নিজের ভোর কখনো স্থায়ীভাবে আলোকিত করা যায় না।

বাংলা সাহিত্যেও এই উপলব্ধির প্রতিধ্বনি পাওয়া যায়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও বলেছিলেন, 
“অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে, 
তব ঘৃণা যেন তৃণসম দহে।”

অর্থাৎ অন্যায় করা যেমন অপরাধ, অন্যায়ের সামনে নীরব থাকা তেমনি এক ধরনের নৈতিক পরাজয়। সমাজে যখন অন্যায়কে স্বাভাবিক করে তোলা হয়, তখন ধীরে ধীরে মানুষের বিবেক নিস্তেজ হয়ে পড়ে। ব্যক্তি তখন শুধু নিজের লাভ-ক্ষতির হিসাব করে, ন্যায়-অন্যায়ের পার্থক্য ভুলে যায়। সেখান থেকেই শুরু হয় সামাজিক অবক্ষয়।

শেক্সপিয়ার “ম্যাকবেথ”-এ দেখিয়েছেন, অন্যায় ক্ষমতা মানুষকে সাময়িক সাফল্য দিলেও শেষ পর্যন্ত তা ভয়, অস্থিরতা ও আত্মধ্বংস ডেকে আনে। আবার মহাত্মা গান্ধী বলেছিলেন, “অন্যায়ের সঙ্গে আপস মানেই অন্যায়কে শক্তিশালী করা।”

মানুষ যখন অন্যায়ের মাধ্যমে উন্নতি করতে চায়, তখন সে হয়তো দ্রুত কিছু অর্জন করে, কিন্তু ভেতরে ভেতরে নিজের শান্তি হারিয়ে ফেলে। কারণ সত্য ও ন্যায়বোধ মানুষের অন্তরের গভীরে প্রোথিত। বাহ্যিক জৌলুস দিয়ে সেই শূন্যতা পূরণ করা যায় না।

রাষ্ট্র পরিচালনা, প্রশাসন, রাজনীতি কিংবা ব্যক্তিজীবন, সবখানেই এই নৈতিক সত্য সমানভাবে প্রযোজ্য। যেখানে মেধার পরিবর্তে তদবির, সততার পরিবর্তে আনুগত্য, আর যোগ্যতার পরিবর্তে অর্থ ও প্রভাব স্থান দখল করে নেয়, সেখানে অবিচার প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়, তখন জনগণের আস্থা ভেঙে পড়ে। মাত্রাতিরিক্ত হলে কখনও নেমে আসে খোদায়ী প্রতিকার। একটি রাষ্ট্রের জন্য এর চেয়ে ভয়ংকর সংকট আর কিছু হতে পারে না।

তবে আশার জায়গা এখানেই, মানুষের ভেতরে এখনো বিবেক বেঁচে আছে। অন্যায় যতই প্রবল হোক, ইতিহাস শেষ পর্যন্ত ন্যায়ের পক্ষেই দাঁড়ায়। অন্ধকার যত গভীরই হোক, আলো ফিরে আসার পথ খুঁজে নেয়। আহত মানুষের দীর্ঘশ্বাস যেমন আকাশে পৌঁছে যায়, তেমনি তার ধৈর্য, সততা ও সত্যও একদিন সম্মানের জায়গা করে নেয়।

তাই আমাদের মনে রাখতে হবে, কারও অধিকার হরণ করে, তার হৃদয় ভেঙে কখনো প্রকৃত সুখী হওয়া যায় না। ন্যায়, সহমর্মিতা, সততা ও মানবিকতাই শেষ পর্যন্ত মানুষকে বড় করে, সমাজকে সুন্দর করে এবং রাষ্ট্রকে স্থিতিশীল করে।

কারণ পৃথিবীতে সবকিছুর ঊর্ধ্বে, মানুষের চোখ এড়িয়ে গেলেও একজন ন্যায়বিচারক সর্বদা আছেন, আর তিনি সবারই খোদা। তাঁর বিচারে কোনো ভুল থাকে না।

লেখক: সিনিয়র ব্যুরোক্রেট, সমসাময়িক ঘটনার বিশ্লেষক