বাংলাদেশে দীর্ঘদিনের প্রচলিত 'পরিবারতন্ত্রনির্ভর' রাজনীতির কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দেওয়ার অঙ্গীকার করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। তিনি ঘোষণা করেছেন, আগামী নির্বাচনে জামায়াত জয়ী হলে রাষ্ট্রপরিচালনায় কোনো বিশেষ পরিবারের আধিপত্য থাকবে না; বরং গড়ে তোলা হবে ১৮ কোটি মানুষের মালিকানাধীন এক নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি।
মঙ্গলবার সকালে যশোর শহরের ঐতিহাসিক ঈদগাহ ময়দানে আয়োজিত এক বিশাল নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় জাতীয় নির্বাচন ও গণভোটকে সামনে রেখে এই সভার আয়োজন করে যশোর জেলা জামায়াত।
বক্তব্যের শুরুতেই ডা. শফিকুর রহমান দেশের বর্তমান রাজনৈতিক সংকটের মূলে থাকা 'পরিবারকেন্দ্রিক' ক্ষমতার চর্চাকে কঠোর সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, “দশক পর দশক ধরে এ দেশের রাজনীতি নির্দিষ্ট কিছু পরিবারের হাতে জিম্মি হয়ে আছে। অতীতের সেই বস্তাপচা রাজনীতির অবসান ঘটানোর সময় এসেছে। আমরা এমন এক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখি, যেখানে যোগ্যতা হবে নেতৃত্বের মাপকাঠি, জন্মসূত্র নয়। জামায়াত ক্ষমতায় গেলে দেশে আর কোনো পরিবারতন্ত্রের রাজনীতি থাকবে না।
তিনি আরও যোগ করেন, আমরা কেবল আমাদের দলের জয় চাই না। আমরা চাই বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিকের জয়। দেশের ১৮ কোটি মানুষের মুখে হাসি ফোটানোই আমাদের মূল লক্ষ্য।
নির্বাচন ও গণভোট নিয়ে দলটির অবস্থান পরিষ্কার করে জামায়াত আমির বলেন, “আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি দেশের ইতিহাসে এক সন্ধিক্ষণ। সেদিন প্রথম হবে গণভোট। এই গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট মানেই হবে প্রকৃত আজাদি বা স্বাধীনতা, আর ‘না’ ভোট মানে হবে আবারও গোলামির জিঞ্জিরে আবদ্ধ হওয়া। এরপর হবে সরকার গঠনের জন্য প্রতীকের ভোট। জনগণকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে তারা কি সার্বভৌমত্ব রক্ষা করবে নাকি মাথা নত করবে।
নির্বাচনী মাঠে সাম্প্রতিক কিছু অপ্রীতিকর ঘটনার প্রেক্ষিতে মিত্র ও প্রতিদ্বন্দ্বী দল বিএনপির সমালোচনা করেন ডা. শফিকুর রহমান। বিশেষ করে নারীকর্মীদের ওপর হামলার ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, একদিকে আপনারা ফ্যামিলি কার্ডের কথা বলছেন, অন্যদিকে মা-বোনদের গায়ে হাত তুলছেন। যাদের হাতে একজন মা-ও নিরাপদ নন, তারা দেশকে কী নিরাপত্তা দেবেন?
বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও বিশৃঙ্খলার দিকে ইঙ্গিত করে তিনি আরও বলেন, যে দল নিজের কর্মীদেরই সামাল দিতে পারে না, তারা দেশ নিয়ন্ত্রণ করার যোগ্যতা রাখে না। আগে নিজেদের দলের মধ্যে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনুন। যদি শৃঙ্খলা ফেরাতে আমাদের কোনো সাহায্য লাগে, আমরা তা দিতে প্রস্তুত। তবে রাজপথে আমাদের মায়ের জাতিকে অপমান করা হলে তা কোনোভাবেই বরদাশত করা হবে না।
তরুণ সমাজের প্রতি আহ্বান জানিয়ে আমির বলেন, আমরা কারো পায়ে পা দিয়ে ঝগড়া করতে চাই না। কিন্তু আমাদের ওপর অন্যায়ভাবে বাধা এলে তা প্রতিহত করতে হবে। যুবসমাজকে বলব, যেখানেই বাধা আসবে, সেখানেই রুখে দাঁড়ান।
যশোরের ভোটারদের মন জয়ে স্থানীয় উন্নয়নের একগুচ্ছ প্রতিশ্রুতি দেন ডা. শফিকুর রহমান। তিনি ঘোষণা করেন:
সিটি করপোরেশন: যশোর শহরকে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত পূর্ণাঙ্গ সিটি করপোরেশনে উন্নীত করা হবে।
স্বাস্থ্যসেবা: যশোর মেডিকেল কলেজে ৫০০ শয্যাবিশিষ্ট আধুনিক হাসপাতাল নির্মাণ করা হবে, যাতে সাধারণ মানুষ সুলভে উন্নত চিকিৎসা পায়।
অবকাঠামো: জেলার যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং ভৌত অবকাঠামোর আমূল পরিবর্তন করা হবে।
বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে তিনি যশোরের ছয়টি সংসদীয় আসনের জন্য মনোনীত প্রার্থীদের জনগণের সামনে পরিচয় করিয়ে দেন এবং তাদের হাতে দলীয় প্রতীক 'দাঁড়িপাল্লা' তুলে দেন।
নির্বাচনী পরিবেশ সুষ্ঠু রাখতে প্রশাসনের ভূমিকার ওপর গুরুত্বারোপ করেন জামায়াত আমির। তিনি বলেন, প্রশাসনকে কোনো দলের লেজুড়বৃত্তি করলে চলবে না। আপনাদের অবশ্যই নিরপেক্ষ থাকতে হবে এবং জনগণের ভোটের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। আমরা যদি আচরণবিধি লঙ্ঘন করি, তবে প্রশাসন আমাদের শাস্তি দিক, আমরা তা মেনে নেব। কিন্তু কোনো রাজনৈতিক পক্ষ যেন প্রশাসনের ওপর খবরদারি করতে না পারে।
জনসভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার এবং ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নূরুল ইসলাম। সভাপতিত্ব করেন যশোর জেলা জামায়াতের আমির গোলাম রসুল।
২০২৬ সালের এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে জামায়াত আমির যে 'পরিবারতন্ত্র বিরোধী' কার্ড খেললেন, তা দেশের তরুণ ভোটারদের মধ্যে বড় প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। বিশেষ করে আওয়ামী লীগ পরবর্তী রাজনৈতিক শূন্যতায় জামায়াত ও বিএনপির মধ্যকার আধিপত্যের লড়াই এখন রাজপথ থেকে ব্যালট বক্সে রূপ নিতে যাচ্ছে।
এএন