রাজনীতির ময়দানে অর্থের ঝনঝনানি

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ধনকুবেরদের জয়জয়কার

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ১৩, ২০২৬, ০৫:৫৩ পিএম

বাংলাদেশের নির্বাচনী রাজনীতিতে জনসেবার চেয়েও অনেক সময় বড় হয়ে ওঠে প্রার্থীর আর্থিক সামর্থ্য। সদ্য সমাপ্ত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সেই চিরচেনা চিত্রটিই আরও প্রকটভাবে ধরা পড়েছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এবং প্রার্থীদের জমা দেওয়া হলফনামার তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এবারের সংসদ নির্বাচনে টাকার জোর ছিল আকাশচুম্বী।

নির্বাচনী হলফনামার তথ্য অনুযায়ী, এবারের ভোটে অংশ নেওয়া প্রার্থীদের মধ্যে অন্তত ২৬ জন ছিলেন ‘শতকোটিপতি’। শুধু তাই নয়, ৮৯১ জন প্রার্থীর সম্পদ ছিল কোটির ঘরে। তবে চমকপ্রদ তথ্য হলো, শীর্ষ ১০ জন ধনীর তালিকায় থাকা প্রার্থীদের মধ্যে যারা বড় দলের হয়ে লড়াই করেছেন, তারা প্রায় সবাই বিজয়ী হয়েছেন। অন্যদিকে, অর্থবিত্তে পিছিয়ে না থাকলেও স্বতন্ত্র হয়ে লড়া শীর্ষ ধনীরা ভোটারদের মন জয়ে ব্যর্থ হয়েছেন।

নির্বাচনে শীর্ষ ১০ ধনীর তালিকায় ৭ জনই ছিলেন বিএনপির প্রার্থী। জনগণের রায়ে এই ৭ জনই বিজয়ী হয়ে সংসদে নিজেদের জায়গা নিশ্চিত করেছেন। বিপরীতে, তালিকার বাকি ৩ জন স্বতন্ত্র প্রার্থী বিপুল অর্থবিত্ত থাকা সত্ত্বেও হারের তিক্ত স্বাদ পেয়েছেন।

সবচেয়ে বেশি সম্পদের মালিক হিসেবে আলোচনায় ছিলেন ফেনী-৩ (সোনাগাজী ও দাগনভূঞা) আসনের বিএনপি প্রার্থী আবদুল আউয়াল মিন্টু। হলফনামার হিসেবে তাঁর ও তাঁর স্ত্রীর সম্পদের পরিমাণ ৬০৭ কোটি টাকা। নির্বাচনে তিনি ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে ১ লাখ ৫৭ হাজার ৪২৫ ভোট পেয়ে বেসরকারিভাবে বিজয়ী হয়েছেন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর মোহাম্মদ ফখরুদ্দিন পেয়েছেন ১ লাখ ৮ হাজার ১৬০ ভোট।

চট্টগ্রাম-৪ আসনে বিএনপির প্রার্থী মোহাম্মদ আসলাম চৌধুরী ৪৭৪ কোটি টাকার সম্পদ নিয়ে তালিকার দ্বিতীয় স্থানে রয়েছেন। যদিও আইনি জটিলতার কারণে এই আসনের ফলাফল ঘোষণা স্থগিত রাখা হয়েছে, তবে তাঁর সম্পদের পাহাড় নির্বাচনী মাঠে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছিল।

তৃতীয় শীর্ষ ধনী প্রার্থী ফখর উদ্দিন আহমেদ ময়মনসিংহ-১১ আসন থেকে বিএনপির টিকেটে জয়ী হয়েছেন। ২৯৯ কোটি টাকার সম্পদের মালিক এই প্রার্থী ১ লাখ ১০ হাজার ২১৪ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন।

কুমিল্লা-৮ আসন থেকে বিজয়ী হয়েছেন জাকারিয়া তাহের। শীর্ষ ১০ ধনীর তালিকায় চতুর্থ স্থানে থাকা এই বিএনপি নেতা ভোটারদের রায় পেতে সফল হয়েছেন এবং ১ লাখ ৬৯ হাজার ১৭৮ ভোট অর্জন করেছেন।

শীর্ষ ১০ ধনীর তালিকায় থাকা ৩ জন স্বতন্ত্র প্রার্থীর ফলাফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, রাজনীতিতে দলীয় প্রতীকের গুরুত্ব অপরিসীম। বিশাল সম্পদ থাকলেও স্বতন্ত্রভাবে লড়ে তারা জয়ের মুখ দেখেননি।

সালাউদ্দিন আলমগীর (টাঙ্গাইল-৮) তালিকার পঞ্চম স্থানে থাকা এই স্বতন্ত্র প্রার্থী ৭৭ হাজার ১৩০ ভোট পেয়ে দ্বিতীয় হয়েছেন। বিশাল অর্থবিত্তও তাঁকে জয়ের বন্দরে পৌঁছাতে পারেনি। এম এ এইচ সেলিম (বাগেরহাট): ষষ্ঠ অবস্থানে থাকা সেলিম বাগেরহাটের তিনটি আসন (১, ২ ও ৩) থেকে নির্বাচন করেছিলেন। তবে কোনো আসনেই তিনি জয়লাভ করতে পারেননি। মোহাম্মদ ফজলুল আজিম (নোয়াখালী-৬): নবম স্থানে থাকা এই স্বতন্ত্র প্রার্থীও পরাজয় বরণ করেছেন।

সপ্তম, অষ্টম এবং দশম স্থানে থাকা বাকি তিন বিএনপি প্রার্থীও জয়ের মালা পরেছেন  মো. জালাল উদ্দীন (চাঁদপুর-২)। তিনি ১ লাখ ৭২ হাজার ৫০৬ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন। গোলাম মোহাম্মদ সিরাজ (বগুড়া-৫), ২০৪ কোটি টাকার সম্পদের মালিক এই প্রার্থী ২ লাখ ৪৮ হাজার ৮৪৮ ভোট পেয়ে বিশাল ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন ও মো. সফিকুর রহমান (শরীয়তপুর-২) তালিকার দশম স্থানে থাকা এই প্রার্থী ১ লাখ ২৯ হাজার ৮১৪ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন।

টিআইবি-র তথ্যমতে, সংসদ নির্বাচনে কোটিপতি প্রার্থীদের আধিক্য প্রমাণ করে যে, রাজনীতি ক্রমশ সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। এবারের ৮৯১ জন কোটিপতি প্রার্থীর অংশগ্রহণ একটি রেকর্ড। হলফনামা বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত কয়েক বছরে অনেক প্রার্থীর সম্পদ কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। রাজনীতি যখন ব্যবসার হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তখন সাধারণ মানুষের অধিকার রক্ষার চেয়ে সম্পদ রক্ষা প্রার্থীর কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়।

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের ফলাফল স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, বাংলাদেশের নির্বাচনে 'দলীয় প্রতীক' এবং 'বিপুল সম্পদ' এই দুটির সমন্বয় থাকলে জয়ের সম্ভাবনা অনেকাংশে বেড়ে যায়। তবে শুধু সম্পদ দিয়ে স্বতন্ত্রভাবে লড়াই করে ভোটারদের মন জয় করা এখনও বেশ কঠিন।

এএন