রিশাদের হাত ধরে ঘুরে দাঁড়ানো জয়

ক্রীড়া প্রতিবেদক, ঢাকা প্রকাশিত: অক্টোবর ১৮, ২০২৫, ১১:৪৮ পিএম

বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের সাম্প্রতিক পারফরম্যান্সে একধরনের অনিশ্চয়তা, একধরনের ক্লান্তি জমে উঠেছিল। ব্যাটিং ব্যর্থতা, বোলিংয়ে ধার না থাকা, আর বারবার সুযোগ নষ্ট করার হতাশা সব মিলিয়ে মিরপুরের গ্যালারি যেন কিছুটা নিরুৎসাহিত ছিল। 

কিন্তু শনিবারের সেই বিকেলে চিত্রটা বদলে দিলেন এক তরুণ লেগ স্পিনার রিশাদ হোসেন।

মাত্র ২১ বছর বয়সী এই বোলার একাই বদলে দিলেন ম্যাচের গল্প। বাংলাদেশের ২০৭ রানের স্বল্প সংগ্রহকেও তিনি পরিণত করলেন এক দুর্দান্ত জয়ে।

ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে প্রথম ওয়ানডেতে বাংলাদেশ জিতেছে ৭৪ রানের বড় ব্যবধানে, রিশাদের রেকর্ড পারফরম্যান্সের কল্যাণে।

বাংলাদেশের ইনিংস শুরুটা খারাপ ছিল। কিন্তু মাঝপথেই যেন পুরোনো রোগ ফিরে এল। ওপেনার শুরুর জুটি ভাঙতেই মাঝে শান্তর (৩২), মেহেদী হাসানের (মিরাজ ১৭) এবং শেষদিকে তরুণ রিশাদ হোসেনের ঝড়ো ১৩ বলে ২৬ রানের ক্যামিও এই তিনটি ইনিংস মিলে দলকে টেনে তোলে।

বাংলাদেশের ইনিংস শেষ হয় ২০৭ রানে (৪৮.১ ওভারে অলআউট)। রান তেমন বড় নয়, কিন্তু উইকেটের চরিত্রে ছিল স্পিন সহায়তা, যা পরে হয়ে ওঠে রিশাদের রাজত্বের মঞ্চ।

ওয়েস্ট ইন্ডিজের ব্যাটাররা যখন ব্যাট হাতে নামল, শুরুটা মোটেও খারাপ ছিল না। ওপেনার ব্র্যান্ডন কিং ও কাইল মেয়ার্স ৩৫ রানের উদ্বোধনী জুটি গড়েছিলেন। কিন্তু এরপরই মঞ্চে নামেন রিশাদ এবং খেলার গতি সম্পূর্ণ বদলে যায়।

তার প্রথম বলেই তৈরি হয় বিভ্রান্তি, তৃতীয় ওভারেই প্রথম উইকেট। এরপর যেন আগুনের ফুলকি প্রতিটি স্পেলে নতুন কিছু, কখনো গুগলি, কখনো টপস্পিন, কখনো শর্ট-লেংথে ভেতরের দিকে মোচড়। ফলাফল: ৯ ওভারে মাত্র ৩৫ রানে ৬ উইকেট।

এই পরিসংখ্যান শুধু ম্যাচের নয়, বরং বাংলাদেশের ওয়ানডে ইতিহাসেও অন্যতম সেরা বোলিং পারফরম্যান্স।

রিশাদের শিকারদের মধ্যে ছিলেন ওয়েস্ট ইন্ডিজের প্রধান ব্যাটসম্যানরা নিকোলাস পুরান, শাই হোপ, রোভম্যান পাওয়েল সবাই পড়েছেন তার স্পিনের জালে। বিশেষ করে পুরানের বিপক্ষে তার লেগব্রেকটি যেন ক্লাসিক উদাহরণ; বলটি ভেতরে ঢুকে গিয়ে মাঝের স্টাম্প উপড়ে ফেলে দেয়।

ম্যাচ শেষে অধিনায়ক বলেন, রিশাদকে আমরা শুধু স্পিনার নয়, ম্যাচ উইনার হিসেবে দেখি। সে আজ সেটাই প্রমাণ করেছে। এ রকম জয় আমাদের আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে দেবে।

রিশাদ নিজে শান্ত স্বরে বলেন, আমি শুধু নিজের প্ল্যান মেনে বল করেছি। উইকেটটা সহায়তা করছিল। কোচ আগে থেকেই বলেছিলেন, ধৈর্য ধরো—বাকি কাজ বল নিজেই করবে।

এই জয় বাংলাদেশ দলের জন্য অনেকটা মুক্তির স্বাদ। সাম্প্রতিক নিউজিল্যান্ড ও আফগানিস্তান সফরের ব্যর্থতার পর ঘরের মাঠে এমন জয়ে দলে প্রাণ ফিরে এসেছে।

প্রথম ইনিংস শেষে অনেকে হয়তো ভেবেছিল, ২০৭ রানে ম্যাচ জেতা অসম্ভব। কিন্তু দ্বিতীয় ইনিংসের নবম ওভার থেকে যে গল্পটা লেখা শুরু হলো, সেটি শুধু এক ম্যাচ নয়—বাংলাদেশ ক্রিকেটে তরুণ প্রজন্মের উত্থানের প্রতীক হয়ে উঠল।

৯ম ওভারে প্রথম উইকেট রিশাদের। ১৫তম ওভারে দ্বিতীয় স্পেলে আরও দুটি। ২৪তম ওভারে ক্যারিবীয় মিডল অর্ডার গুটিয়ে গেল। শেষ পর্যন্ত ওয়েস্ট ইন্ডিজ অলআউট ১৩৩ রানে।

স্পিনের এমন শাসন বাংলাদেশে নতুন নয় সাকিব, রফিক, রাজ্জাকরা ছিলেনই। কিন্তু লেগ-স্পিনের ধারাবাহিক সাফল্য অতীতে দেখা যায়নি। সেই শূন্যস্থান পূরণ করছেন রিশাদ হোসেন, নিজের হাতে বাংলাদেশের নতুন এক অধ্যায় খুলছেন। এটি বাংলাদেশের ঘরের মাঠে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে সবচেয়ে বড় জয় (রানের ব্যবধানে) শেষ ৭ বছরে।

রিশাদ হলেন তৃতীয় বাংলাদেশি, যিনি ওয়ানডেতে ৬ উইকেট নিয়েছেন (পূর্বে—মাশরাফি ও সাকিব)।

ক্রিকেট বিশ্লেষক আতহার আলী খান বলেন, বাংলাদেশ বহুদিন ধরে একজন মানসম্মত লেগ স্পিনারের খোঁজে ছিল। রিশাদ সেই শূন্যতা পূরণ করছে। তার বোলিং শুধু নিয়ন্ত্রণে নয়, আক্রমণাত্মকও।

বাংলাদেশ, ওভারে ২০৭ (হৃদয় ৫১, মাহিদুল ৪৬, নাজমুল ৩২, রিশাদ ২৬, মিরাজ ১৭, সিলস৩/৪৮,চেজ২/৩০,গ্রিভস২/৩২।

ওয়েস্ট ইন্ডিজ, ৩৯ ওভারে ১৩৩ (কিং ৪৪, অ্যাথানেজ ২৭, হো১৫, রিশাদ৬/১৬, মোস্তাফিজ ২/৪৬। মিরাজ ১/১৬, তানভীর ১/৪৬।

ফল, বাংলাদেশ ৭৪ রানে জয়ী।  ম্যান অব দ্যা ম্যাচ, রিশাদ হোসেন।  সিরিজ, ৩ ম্যাচের সিরিজে বাংলাদেশ ১-০তে এগিয়ে।

অন্যদিকে সাবেক অধিনায়ক হাবিবুল বাশার মনে করিয়ে দেন, রিশাদের পারফরম্যান্স কেবল একটা দিন নয়, এটা এক প্রক্রিয়ার ফল। তাকে সুযোগ দিতে হবে, সময় দিতে হবে। তাহলেই বাংলাদেশ নতুন উচ্চতায় উঠবে।

এই ম্যাচে স্পষ্ট হয়েছে, বাংলাদেশের বোলিং আক্রমণ এখন আরও ভারসাম্যপূর্ণ। মোস্তাফিজুর, তাসকিন ও তানভীর, মেহেদী হাসানের অফ-স্পিন, আর রিশাদের লেগ-স্পিন—এই বৈচিত্র্যই প্রতিপক্ষকে চাপে রেখেছে।

তবে ব্যাটিংয়ে এখনো উদ্বেগ রয়ে গেছে। সাকিব, তামিম, মাহমুদউল্লাহদের ধারাবাহিকতা না ফিরলে বড় ম্যাচে চ্যালেঞ্জ বাড়বে। তবুও এই জয় প্রমাণ করে, দলে আত্মবিশ্বাস ফিরে এসেছে। আর তা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

রিশাদ, শান্ত, মেহেদী, শরিফুল—সবাই ২৫ বছরের নিচে। এই তরুণরাই এখন বাংলাদেশের নতুন মুখ। তাদের সাফল্য মানে দেশের ক্রিকেটের স্থায়িত্বের প্রতিশ্রুতি।

বিশেষ করে রিশাদকে ঘিরে এখন যে উচ্ছ্বাস, তা কেবল পরিসংখ্যান নয়—একটি নতুন স্বপ্নের প্রতিফলন।

ম্যাচ শেষ হতেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে একটাই নাম“রিশাদ হোসেন।

গ্যালারিতে দর্শকরা স্লোগান দিয়েছেন, “রিশাদ মানেই উইকেট! টুইটার ও ফেসবুকে ভেসে গেছে প্রশংসায়—“বাংলাদেশ অবশেষে পেল নিজের ওয়ার্ন।

ইএইচ