২০২৬ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ

আইসিসি বনাম ডব্লিউসিএ—ক্রিকেটারদের অধিকার নিয়ে উত্তপ্ত বিশ্ব ক্রিকেট

ক্রীড়া প্রতিবেদক প্রকাশিত: জানুয়ারি ৩১, ২০২৬, ০৩:৪৯ পিএম
সংগৃহীত ছবি

আগামী ৭ ফেব্রুয়ারি থেকে মাঠে গড়াতে যাচ্ছে ২০২৬ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ। কিন্তু টুর্নামেন্ট শুরু হওয়ার মাত্র কয়েক দিন আগে মাঠের লড়াই ছাপিয়ে এখন আলোচনার কেন্দ্রে আইসিসি এবং ক্রিকেটারদের বৈশ্বিক সংগঠন 'ওয়ার্ল্ড ক্রিকেটার্স অ্যাসোসিয়েশন' (ডব্লিউসিএ)-এর মধ্যকার তীব্র সংঘাত। মূলত ক্রিকেটারদের ব্যক্তিগত সত্তার অধিকার (ইমেজ রাইটস), তথ্যের মালিকানা এবং টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণের বিতর্কিত শর্তাবলি নিয়ে বিশ্ব ক্রিকেটের নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইসিসি এখন এক বড়সড় আইনি ও নৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে।

ইএসপিএন-ক্রিকইনফোর সাম্প্রতিক তথ্যের ভিত্তিতে জানা গেছে, এই দ্বন্দ্বের সূত্রপাত হয়েছে ২০২৬ বিশ্বকাপের জন্য আইসিসির পাঠানো খেলোয়াড়দের অংশগ্রহণের শর্তাবলি (Squad Terms) নিয়ে। ডব্লিউসিএ-এর অভিযোগ, আইসিসি ২০২৪ সালে করা দ্বিপাক্ষিক চুক্তির শর্তগুলো ভঙ্গ করে নতুন এবং ‘শোষণমূলক’ কিছু নিয়ম খেলোয়াড়দের ওপর চাপিয়ে দিতে চাইছে।

ডব্লিউসিএ-এর প্রধান নির্বাহী টম মোফাট এক চিঠিতে আইসিসিকে জানিয়েছেন, নতুন এই শর্তগুলো খেলোয়াড়দের মৌলিক অধিকারকে খর্ব করে। বিশেষ করে যারা তুলনামূলক ছোট দেশ থেকে আসা বা আর্থিকভাবে অসচ্ছল ক্রিকেটার, তাদের ওপর এই নিয়মগুলো বেশি প্রভাব ফেলবে।

আইসিসি এই বিতর্কের জবাবে এক অদ্ভুত যুক্তি দাঁড় করিয়েছে। সংস্থাটির দাবি, ২০২৪ সালে করা চুক্তিটি ছিল কেবল আটটি নির্দিষ্ট ক্রিকেট বোর্ডের (এনজিবি) জন্য। এই তালিকায় আছে—অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড, নিউজিল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকা, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, আয়ারল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস ও স্কটল্যান্ড। উল্লেখ্য, নিরাপত্তার অজুহাতে ভারতে খেলতে না যাওয়ায় এই তালিকা থেকে বাদ পড়েছে বাংলাদেশ, আর সেখানে জায়গা করে নিয়েছে স্কটল্যান্ড।

অন্যদিকে, ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা এবং নেপালের মতো দেশগুলোর ক্রিকেট বোর্ড ডব্লিউসিএকে স্বীকৃতি দেয় না। ফলে সেসব দেশের ক্রিকেটাররা এই সংগঠনের সরাসরি সদস্য নন। তবে ডব্লিউসিএ-এর দাবি, তাদের করা চুক্তিটি আইনিভাবে সংগঠনের সকল সদস্যের জন্য কার্যকর হওয়া উচিত, তারা বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ করুক বা না করুক।

ডব্লিউসিএ-এর প্রধান নির্বাহী টম মোফাট গত ১৫ জানুয়ারি এক মেমোর মাধ্যমে আটটি প্রধান অসংগতির কথা তুলে ধরেছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো-

আইসিসির নতুন শর্ত অনুযায়ী, একজন ক্রিকেটার বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া মানেই হলো তিনি তার ছবি ও ভিডিও ব্যবহারের পূর্ণ লাইসেন্স আইসিসিকে দিয়ে দিচ্ছেন। এমনকি আইসিসির বাণিজ্যিক পার্টনাররা কোনো নির্দিষ্ট দলের মাত্র তিনজন খেলোয়াড়ের ছবি ব্যবহার করে নিজেদের পণ্যের প্রচার চালাতে পারবে। আগে এই নিয়মটি ছিল অনেক বেশি সীমাবদ্ধ এবং এতে খেলোয়াড় বা ডব্লিউসিএ-এর সম্মতির প্রয়োজন হতো। এখন আইসিসি চাইছে ক্রিকেটারদের সম্মতি ছাড়াই এই বাণিজ্যিক সুবিধা নিতে।

বর্তমানে আধুনিক ক্রিকেটে খেলোয়াড়দের ফিটনেস ও পারফরম্যান্স ডেটা অত্যন্ত মূল্যবান। আইসিসি চায় এই তথ্যের সম্পূর্ণ মালিকানা নিজেদের অধীনে রাখতে, যাতে তারা বোর্ডের অনুমতি নিয়ে তা ব্যবসায়িক কাজে লাগাতে পারে। কিন্তু ডব্লিউসিএ-এর কড়া অবস্থান হলো—একজন মানুষের বায়োলজিক্যাল ডেটার মালিক কেবল সেই ব্যক্তি নিজেই। তার অনুমতি ছাড়া এটি অন্য কারো কাছে হস্তান্তর করা ডিজিটাল নিরাপত্তা ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তার লঙ্ঘন।

আইসিসির সবচাইতে বিতর্কিত শর্তটি হলো—যদি কোনো ক্রিকেটার বিশ্বকাপে মাঠে নামেন, তবে ধরে নেওয়া হবে তিনি আইসিসির দেওয়া সব শর্ত মেনে নিয়েছেন। এখানে সই করা বা না করা কোনো বিষয় নয়। ডব্লিউসিএ এই পদ্ধতিকে ‘একতরফা’ ও ‘অগণতান্ত্রিক’ বলে আখ্যা দিয়েছে।

বাংলাদেশকে বিশ্বকাপ থেকে বাদ দেওয়া নিয়ে এমনিতেই আইসিসি ও ডব্লিউসিএ-এর মধ্যে শীতল লড়াই চলছিল। বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের বাদ দেওয়াকে ডব্লিউসিএ শুরু থেকেই পক্ষপাতদুষ্ট হিসেবে দেখে আসছে। এবারের এই নতুন শর্তের বিতর্ক সেই ক্ষোভকে আরও উসকে দিয়েছে। টম মোফাট সরাসরি বলেছেন, আইসিসি ও সদস্য বোর্ডগুলো মিলে খেলোয়াড়দের প্রাপ্য সুরক্ষাগুলো কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। তারা ক্রিকেটারদের সহকর্মী নয়, বরং 'মালিক' হতে চাইছে।

বড় দেশের ক্রিকেটাররা (যেমন অস্ট্রেলিয়া বা ইংল্যান্ড) তাদের বোর্ডের কাছ থেকে প্রচুর বেতন পান, তাই তারা হয়তো এসব শর্ত নিয়ে মাথা ঘামান না। কিন্তু জিম্বাবুয়ে, নামিবিয়া, যুক্তরাষ্ট্র বা ইতালির মতো দেশের ক্রিকেটারদের জন্য আইসিসি ইভেন্টই আয়ের প্রধান উৎস। ডব্লিউসিএ মনে করে, এই দুর্বলতাকে পুঁজি করেই আইসিসি এমন শোষণমূলক শর্ত চাপিয়ে দিচ্ছে। কারণ, এই ক্রিকেটারদের পক্ষে বিশ্বকাপ বর্জন করা বা আইসিসির বিরুদ্ধে সরাসরি দাঁড়ানো আর্থিকভাবে অসম্ভব।

যদিও টম মোফাট পরিষ্কার করেছেন যে তারা বিশ্বকাপ পণ্ড করতে চান না, তবে আইসিসির এই নীরবতা পরিস্থিতির অবনতি ঘটাতে পারে। আইসিসি এখনো ডব্লিউসিএ-এর সর্বশেষ চিঠির কোনো উত্তর দেয়নি। ক্রিকেট বিশ্লেষকদের মতে, যদি বিশ্বকাপ শুরুর আগে এই সমস্যার সমাধান না হয়, তবে টুর্নামেন্ট চলাকালীন খেলোয়াড়দের পক্ষ থেকে প্রতিবাদের কোনো নতুন রূপ দেখা যেতে পারে।

একটি টুর্নামেন্ট যেখানে ক্রিকেটের প্রসার হওয়ার কথা, সেখানে আইনি লড়াই এবং ক্রিকেটারদের অধিকার হরণের বিতর্ক ক্রিকেটের ভাবমূর্তিকে বিশ্বমঞ্চে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। এখন দেখার বিষয়, ৭ ফেব্রুয়ারির আগে আইসিসি তাদের অবস্থান পরিবর্তন করে কি না।

এএন