ছায়াবৃত রোনালদো ও মার্তিনেজের ‘আর্জেন্টিনা-স্পেন’ তত্ত্ব: পর্তুগালের বিশ্বকাপ ভাবনার ব্যবচ্ছেদ

স্পোর্টস ডেস্ক প্রকাশিত: জুন ১৮, ২০২৬, ১২:১৬ পিএম

বিশ্বকাপের মঞ্চে পর্তুগাল যখনই মাঠে নামে, ফুটবল বিশ্বের স্পটলাইট স্বাভাবিকভাবেই কেড়ে নেন একজন, ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। নিজের ষষ্ঠ বিশ্বকাপ খেলতে নামা এই মহাতারকাকে নিয়ে প্রত্যাশার পারদ সবসময়ই আকাশচুম্বী।

তবে মাঠের বাস্তবচিত্র মাঝে মাঝে বড্ড নিষ্ঠুর। ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোর মতো লড়াকু দলের বিপক্ষে পর্তুগালের ১-১ গোলের হতাশাজনক ড্র এবং পুরো ম্যাচ জুড়ে রোনালদোর নিষ্প্রভ উপস্থিতি এখন ফুটবল মহলে সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয়। প্রশ্ন উঠেছে কোচের কৌশল নিয়ে, প্রশ্ন উঠেছে রোনালদোর কার্যকারিতা নিয়ে।

কিন্তু সব সমালোচনাকে এক পাশে ঠেলে পর্তুগিজ কোচ রবার্তো মার্তিনেজ আশ্রয় নিয়েছেন ইতিহাসের। প্রথম ম্যাচের হোঁচটকে তিনি দেখছেন ভবিষ্যতের ট্রফি জয়ের জ্বালানি হিসেবে।

নব্বই মিনিটে ছাব্বিশ স্পর্শ, রোনালদো কি শুধুই নামের ভারে? ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোর রক্ষণভাগের কড়া পাহাড়ায় পুরো ম্যাচে বলতে গেলে নিখোঁজ ছিলেন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। পরিসংখ্যানের পাতা ওল্টালে তাঁর এই ম্যাচের পারফরম্যান্সকে কোনোভাবেই তাঁর নামের সাথে মেলানো যায় না। ম্যাচ ডিউরেশন নব্বই মিনিট অর্থাৎ পুরো ম্যাচ, বল স্পর্শ মাত্র ছাব্বিশ বার এবং শট সংখ্যা তিনটি, যার প্রতিটিই ছিল লক্ষ্যভ্রষ্ট।

ম্যাচের শুরু থেকেই তাঁকে চেনা ছন্দে পাওয়া যায়নি। বলের জন্য তাঁকে নিচে নেমে আসতে হয়েছে, যা তাঁর স্বাভাবিক ফরোয়ার্ড পজিশনকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। বয়স এবং ফিটনেস নিয়ে প্রশ্ন না থাকলেও, ম্যাচের গতি নির্ধারণে তাঁর আগের সেই চিরচেনা ধার যে অনেকটাই ম্লান, তা এই ম্যাচে স্পষ্ট। ওপেন প্লে থেকে বড় আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে তাঁর সর্বশেষ গোলটি এসেছিল ২০২১ সালের উনিশ জুন। এরপর থেকে দীর্ঘ দশ ম্যাচ ধরে বড় টুর্নামেন্টে, বিশ্বকাপ ও ইউরো মিলিয়ে, গোলখরায় ভুগছেন এই কিংবদন্তি।

মার্তিনেজের অটল বিশ্বাস, সেরা গোলদাতাকে তোলার অযৌক্তিকতা নিয়ে ম্যাচ শেষে সংবাদ সম্মেলনে অবধারিতভাবেই প্রশ্ন উঠেছিল। যে খেলোয়াড় পুরো ম্যাচে নিজের ছায়া হয়ে ছিলেন, তাঁকে কেন দ্বিতীয়ার্ধে তুলে নিয়ে নতুন কোনো আক্রমণাত্মক খেলোয়াড় নামানো হলো না? স্প্যানিশ কোচ রবার্তো মার্তিনেজ অবশ্য অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে নিজের সিদ্ধান্তের পক্ষে সাফাই গেয়েছেন।

মার্তিনেজের যুক্তি ছিল সহজ কিন্তু কৌশলগতভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। তাঁর মতে, যখন দলের গোল প্রয়োজন, তখন মাঠ থেকে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর মতো একজন বিশ্বসেরা ফিনিশারকে তুলে নেওয়া আত্মঘাতী। মার্তিনেজ বলেন, যে ম্যাচে আপনার গোল দরকার, সেখানে বিশ্বের সেরা গোলদাতাকে মাঠ থেকে তুলে নেওয়ার কোনো অর্থ হয় না, সে যেকোনো মুহূর্তে ম্যাচের ভাগ্য বদলে দিতে পারে। কোচের এই অন্ধবিশ্বাস পর্তুগালের আক্রমণভাগকে কিছুটা স্থবির করে দিয়েছিল কি না, তা নিয়ে এখন চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে।

রক্ষণাত্মক মানসিকতা এবং ছন্দপতনের নেপথ্যে ম্যাচের ষষ্ঠ মিনিটেই জোয়াও নেভেসের চমৎকার গোলে এগিয়ে গিয়েছিল পর্তুগাল। সমর্থকেরা যখন বড় জয়ের স্বপ্ন দেখছেন, ঠিক তখনই যেন দলের খেলায় এক অদ্ভুত স্থবিরতা ভর করে। গোল করার পর সাধারণত দলগুলো আরও আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে, কিন্তু পর্তুগাল হেঁটেছে উল্টো পথে। তারা ঝুঁকি নেওয়া বন্ধ করে শুধু বল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করেছে।

পুরো ম্যাচে পর্তুগাল মাত্র ছয়টি শট নিতে পেরেছে, যা তাদের আক্রমণভাগের দুর্বলতা ও সৃজনশীলতার অভাবকে নগ্নভাবে ফুটিয়ে তোলে। মার্তিনেজ নিজেই দলের এই মানসিকতার সমালোচনা করে বলেছেন, গোল করার পর সেই আবেগ দলকে আরও আত্মবিশ্বাসী করে তোলে এবং দ্বিতীয় গোলের দিকে ঠেলে দেয়, কিন্তু আমাদের ক্ষেত্রে উল্টোটা হয়েছে।

ইতিহাসের আশ্রয় নিয়ে আর্জেন্টিনা ও স্পেনের উদাহরণ টেনেছেন কোচ। প্রথম ম্যাচ ড্র করে পর্তুগিজ শিবিরে যখন চিন্তার ভাঁজ, তখন কোচ মার্তিনেজ সবাইকে মনে করিয়ে দিয়েছেন বিশ্বকাপের প্রাচীন এক সত্য, শুরুটা শেষ কথা নয়। তিনি ইতিহাসের দুটি বড় উদাহরণ টেনে দলের ও সমর্থকদের আত্মবিশ্বাস ধরে রাখার চেষ্টা করেছেন।

প্রথম উদাহরণে কাতার বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম ম্যাচেই সৌদি আরবের কাছে হেরে বসেছিল লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনা, কিন্তু সেই ধাক্কা সামলে তারা টুর্নামেন্টে দারুণভাবে ঘুরে দাঁড়ায় এবং শেষ পর্যন্ত বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ট্রফি উঁচিয়ে ধরে। দ্বিতীয় উদাহরণে দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম ম্যাচে সুইজারল্যান্ডের কাছে ১-০ গোলে হেরেছিল তৎকালীন ফেভারিট স্পেন, অথচ সেই স্পেনই পরবর্তীতে টিকিটাকা ফুটবলের জাদুতে বিশ্বজয় করেছিল। মার্তিনেজের মতে, প্রথম ম্যাচের পারফরম্যান্স দিয়ে কখনোই ভবিষ্যৎ চ্যাম্পিয়ন নির্ধারণ করা যায় না। কঙ্গোর বিপক্ষে এই ড্র তাদের জন্য একটি সতর্কবার্তা, যা দলকে আরও শক্তিশালী করবে।

কে গ্রুপের সমীকরণ এবং উজবেকিস্তান চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ১-১ গোলের ড্রয়ে পর্তুগালের নকআউট পর্বের পথ কিছুটা কঠিন হলেও অসম্ভব কিছু নয়। কে গ্রুপে তাদের পরবর্তী ম্যাচ আগামী তেইশ জুন, প্রতিপক্ষ নবাগত উজবেকিস্তান। গ্রুপের বর্তমান অবস্থায় পর্তুগাল এক ম্যাচ খেলে ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোর সাথে ১-১ গোলে ড্র করেছে এবং উজবেকিস্তান এক ম্যাচ খেলে কলম্বিয়ার কাছে ৩-১ ব্যবধানে পরাজিত হয়েছে। উজবেকিস্তান তাদের প্রথম ম্যাচে কলম্বিয়ার কাছে হারলেও তাদের হালকাভাবে নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। প্রথমবার বিশ্বকাপে আসা দলটি পর্তুগালের বিপক্ষে নিজেদের প্রমাণ করতে মরিয়া হয়ে থাকবে।

ভবিষ্যৎ পথপন্থা হিসেবে পর্তুগালের কী করা উচিত, তা নিয়ে ভাবার সময় এসেছে। উজবেকিস্তান ম্যাচের আগে পর্তুগালকে মূলত তিনটি জায়গায় দ্রুত পরিবর্তন আনতে হবে। প্রথমত রোনালদোর ভূমিকা পুনর্মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। রোনালদোকে যদি পুরো নব্বই মিনিট খেলাতেই হয়, তবে মাঝমাঠ থেকে তাঁর কাছে বলের সরবরাহ বাড়াতে হবে। ব্রুনো ফার্নান্দেজ বা বার্নার্ডো সিলভাদের আরও কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে।

দ্বিতীয়ত আক্রমণে বৈচিত্র্য আনা দরকার। শুধু উইং বা ওয়ান টু ওয়ান পাসিংয়ের ওপর ভরসা না করে দূরপাল্লার শট এবং বক্সের ভেতর ফাঁকা জায়গা তৈরি করার দিকে নজর দিতে হবে। তৃতীয়ত ঝুঁকি নেওয়ার মানসিকতা তৈরি করতে হবে। মার্তিনেজকে তাঁর দলকে বোঝাতে হবে, রক্ষণাত্মক ফুটবল খেলে বা শুধু বল ধরে রেখে গোল পাওয়া সম্ভব নয়। আধুনিক ফুটবলে আক্রমণই শ্রেষ্ঠ রক্ষণ।

ডিআর কঙ্গো ম্যাচটি পর্তুগালের চোখ খুলে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। মার্তিনেজের আর্জেন্টিনা স্পেন তত্ত্ব কেবল সান্ত্বনা নাকি সত্যিই তারা ঘুরে দাঁড়াতে পারবে, তার উত্তর মিলবে তেইশ জুনের উজবেক বধের মিশনের দিন। পর্তুগিজ রাজপুত্র ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো তাঁর টানা দশ ম্যাচের গোলখরা কাটিয়ে ফিনিক্স পাখির মতো জেগে উঠবেন, এটাই এখন কোটি ফুটবল ভক্তের প্রত্যাশা।

প্রথম ম্যাচের এই হোঁচট কি পর্তুগালকে চ্যাম্পিয়নের ট্র্যাকে ফিরিয়ে আনবে, নাকি রোনালদোর শেষ বিশ্বকাপের স্বপ্ন অধরাই থেকে যাবে? আপনার কী মনে হয়, পরের ম্যাচে মার্তিনেজের কি রোনালদোকে শুরুর একাদশে রাখা উচিত, নাকি তরুণ কোনো স্ট্রাইকারকে সুযোগ দেওয়া উচিত?

জেএইচআর