ম্যাচের শেষ বাঁশি বাজতেই মাঠজুড়ে যেন আবেগের এক মহাবিস্ফোরণ ঘটল। কেউ দৌড়ে গিয়ে সতীর্থকে জড়িয়ে ধরছেন, আবার কেউ বা আনন্দে মাঠের বুকেই গড়াগড়ি খাচ্ছেন। অন্যদিকে মাঠের ঠিক বিপরীত প্রান্তে দক্ষিণ কোরিয়ার ফুটবলারদের চোখে-মুখে তখন রাজ্যের হতাশা। কারণ, শক্তি ও ঐতিহ্যে এগিয়ে থাকা দক্ষিণ কোরিয়াকে ১-০ গোলে হারিয়ে ফুটবল ইতিহাসে এক নতুন রূপকথা লিখেছে দক্ষিণ আফ্রিকা। এই মহাকাব্যিক জয়ে নিজেদের ফুটবল ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে (শেষ ৩২) জায়গা করে নিল আফ্রিকার দেশটি।
বৃহস্পতিবার মেক্সিকোর মন্তেরেই স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপের ‘এ’ গ্রুপের শেষ রাউন্ডের ম্যাচে মুখোমুখি হয় দল দুটি। বাঁচা-মরার এই লড়াইয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার জয়ের নায়ক থাপেলো মাসেকো। দ্বিতীয়ার্ধের ৬৩তম মিনিটে তাঁর করা অনবদ্য একমাত্র গোলেই নিশ্চিত হয় দলের ঐতিহাসিক এই জয়। এই জয়ের ফলে তিন ম্যাচ শেষে ৪ পয়েন্ট নিয়ে গ্রুপের দ্বিতীয় স্থান দখল করেছে দক্ষিণ আফ্রিকা। অন্যদিকে ৩ পয়েন্ট নিয়ে টেবিলের তৃতীয় স্থানে নেমে গেছে দক্ষিণ কোরিয়া।
ম্যাচের আগের সমীকরণটি ছিল দুই দলের জন্যই বেশ সমীকরণপূর্ণ। নকআউট পর্বে যেতে হলে দক্ষিণ আফ্রিকাকে এই ম্যাচে জিততেই হতো, অন্য কোনো বিকল্প ছিল না। অপরদিকে আগের ম্যাচে চেক প্রজাতন্ত্রকে হারিয়ে ৩ পয়েন্ট পাওয়া দক্ষিণ কোরিয়ার জন্য কেবল একটি ড্র-ই যথেষ্ট ছিল। স্বাভাবিকভাবেই শক্তি ও অভিজ্ঞতার বিচারে ফেবারিট হিসেবেই মাঠে নেমেছিল কোরিয়ানরা। তবে মাঠের মরণপণ লড়াইয়ে সব কাগজ-কলমের হিসাব উল্টে দেয় দক্ষিণ আফ্রিকা।
প্রথমার্ধে দুই দলই বেশ কয়েকটি আক্রমণ ও পাল্টা-আক্রমণ চালালেও কাঙ্ক্ষিত গোলের দেখা পায়নি কেউ। তবে এই অর্ধে দক্ষিণ আফ্রিকাই তুলনামূলক বেশি গোলের সুযোগ তৈরি করতে পেরেছিল। বিশেষ করে থাপেলো মাসেকোর নিশ্চিত একটি গোলমুখী শট শেষ মুহূর্তে দারুণ দক্ষতায় ঠেকিয়ে দেন কোরিয়ান ডিফেন্ডার লি গিহিউক। ফলে গোলশূন্য সমতা নিয়েই বিরতিতে যায় দুই দল।
দ্বিতীয়ার্ধে গোলের গতি বাড়াতে এবং আক্রমণভাগ ধারালো করতে নিজেদের পোস্টার বয় সন হিউং-মিনকে মাঠে নামান দক্ষিণ কোরিয়ার কোচ। তবে গোলের খোঁজে কোরিয়ানরা অতিরিক্ত ওপরে উঠে খেলার সুযোগটিকেই দারুণভাবে কাজে লাগায় দক্ষিণ আফ্রিকা। ম্যাচের ৬৩তম মিনিটে শেপাং মোরেমির রক্ষণভেদী পাস পেয়ে বাম পায়ের নিখুঁত ও বাঁকানো শটে বল জালে জড়ান মাসেকো। ডি-বক্সের প্রায় ১৫ গজ দূর থেকে নেওয়া তাঁর শটটি কোরিয়ান গোলরক্ষককে পরাস্ত করে গোলপোস্টের ডানদিকের নিচের কোণায় আশ্রয় নেয়।
গোল হজম করার পর সমতায় ফিরতে মরিয়া হয়ে ওঠে দক্ষিণ কোরিয়া। ম্যাচের শেষ দিকে তারা একের পর এক আক্রমণ করলেও দক্ষিণ আফ্রিকার রক্ষণভাগ এবং গোলরক্ষক রনওয়েন উইলিয়ামস যেন চীনের প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়ে যান। তাঁদের দুর্ভেদ্য ডিফেন্স ভাঙতে না পেরে শেষ পর্যন্ত পরাজয় মেনেই মাঠ ছাড়তে হয় এশিয়ার জায়ান্টদের।
এই জয়ের মাধ্যমে বিশ্বকাপ ইতিহাসে সম্পূর্ণ নতুন এক অধ্যায় যোগ করল দক্ষিণ আফ্রিকা। এর আগে ১৯৯৮, ২০০২ ও ২০১০ সালের বিশ্বকাপে অংশ নিলেও কখনো গ্রুপ পর্বের বৈতরণী পার হতে পারেনি তারা। এবার সেই দীর্ঘ আক্ষেপ ও খরা ঘুচিয়ে প্রথমবারের মতো নকআউট পর্বে জায়গা করে নিল আফ্রিকার প্রতিনিধিরা। আগামী ২৮ জুন লস অ্যাঞ্জেলেসে রাউন্ড অব ৩২-এর মহাগুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে তাদের প্রতিপক্ষ হবে শক্তিশালী কানাডা।
একই সময়ে অনুষ্ঠিত গ্রুপের অন্য ম্যাচে স্বাগতিক মেক্সিকো ৩-০ গোলের বড় ব্যবধানে উড়িয়ে দিয়েছে চেক প্রজাতন্ত্রকে। এর ফলে তিন ম্যাচের সবকটিতে জয় তুলে নিয়ে পূর্ণ ৯ পয়েন্ট পেয়ে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হিসেবে পরের রাউন্ডে গেছে মেক্সিকো। বিপরীতে মাত্র ১ পয়েন্ট নিয়ে টুর্নামেন্ট থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিদায় নিয়েছে চেক প্রজাতন্ত্র।
তবে দক্ষিণ কোরিয়ার ভাগ্য এখনও পুরোপুরি ফুরিয়ে যায়নি। তিন ম্যাচে ৩ পয়েন্ট নিয়ে তারা গ্রুপে তৃতীয় স্থানে অবস্থান করছে। নিয়ম অনুযায়ী, গ্রুপ পর্বের সেরা আটটি তৃতীয় স্থানধারী দলের একটি হতে পারলে এখনো নকআউট পর্বে খেলার সুযোগ থাকবে তাদের। সে জন্য এখন তাদের চাতক পাখির মতো অধীর আগ্রহে তাকিয়ে থাকতে হবে অন্য গ্রুপগুলোর শেষ ম্যাচগুলোর ফলাফলের দিকে। তবে সমীকরণ যা-ই হোক না কেন, এদিনের ম্যাচটি নিঃসন্দেহে দক্ষিণ আফ্রিকার ফুটবল ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।
জেএইচআর