বিশ্বকাপে রেফারির দ্বিমুখী নীতি

বালোগানের লাল কার্ড ও মেসির ‘ছাড়’ নিয়ে তুমুল বিতর্ক

স্পোর্টস ডেস্ক প্রকাশিত: জুলাই ২, ২০২৬, ১২:৫৬ পিএম
পায়ের পিছনের অংশে আঘাত করেন বালোগান বসনিয়ান ডিফেন্ডার তারিক মুহারেমোভিচের । ছবি : সংগৃহীত

চলমান ফুটবল বিশ্বকাপের নকআউট পর্বের শুরুতেই রেফারির সিদ্ধান্ত এবং ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (ভিএআর) প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে বড় ধরনের বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বৃহস্পতিবার সকালে সান ফ্রান্সিসকোতে অনুষ্ঠিত শেষ ৩২ দলের রাউন্ডের ম্যাচে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার বিপক্ষে ২-০ গোলের দারুণ জয় তুলে নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। 

এই জয়ের মাধ্যমে তারা টুর্নামেন্টের শেষ ষোলো নিশ্চিত করলেও, পুরো ফুটবল বিশ্বের আলোচনা এখন ম্যাচটিতে যুক্তরাষ্ট্রের ফরোয়ার্ড ফ্লোরিয়ান বালোগানের পাওয়া একটি লাল কার্ড এবং তার সূত্র ধরে আর্জেন্টিনার অধিনায়ক লিওনেল মেসির এক পুরোনো ঘটনাকে কেন্দ্র করে।

ম্যাচের ৪৫ মিনিটে গোল করে দলকে এগিয়ে নেওয়া বালোগান ৬৪ মিনিটে সরাসরি লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন। ব্রাজিলিয়ান রেফারি রাফায়েল ক্লাউসের এই নাটকীয় সিদ্ধান্ত বিশ্বকাপের ধারাভাষ্যকার, ফুটবল পণ্ডিত এবং সাধারণ সমর্থকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। 

সবার মনে এখন একটাই প্রশ্ন- প্রায় একই ধরনের ফাউল করে আলজেরিয়ার বিপক্ষে লিওনেল মেসি যেখানে পার পেয়ে গিয়েছিলেন, সেখানে বালোগানকে কেন এত বড় শাস্তি পেতে হলো? ফুটবলের সর্বোচ্চ আসরে নিয়মের এমন দ্বিমুখী প্রয়োগ নিয়ে এখন উত্তাল ফুটবল অঙ্গন।

মাঠের সেই নাটকীয় মুহূর্ত

ম্যাচের দ্বিতীয় অর্ধের তখন ৬২ মিনিটের খেলা চলছে। যুক্তরাষ্ট্রের ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে থাকা অবস্থায় বল দখলের জন্য বসনিয়ান ডিফেন্ডার তারিক মুহারেমোভিচের সঙ্গে গতিতে কিছুটা পিছিয়ে পড়েন বালোগান। দৌড়ের একপর্যায়ে মুহারেমোভিচ বলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেন এবং সামনে থাকা বলটি তার বাঁ পায়ের দারুণ শটে ক্লিয়ার করেন। ঠিক সেই মুহূর্তে বালোগান পেছন থেকে ছুটে এসে তাকে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, গতি সামলাতে না পেরে বালোগানের ডান পায়ের বুটের তলা মুহারেমোভিচের ডান পায়ের গোড়ালির পেছনের অংশে সরাসরি আঘাত করে।

মজার বিষয় হলো, রেফারি রাফায়েল ক্লাউস শুরুতে এই ঘটনাটিকে ফাউল হিসেবেও গণ্য করেননি, এমনকি কোনো ফ্রি-কিকও দেননি। ট্যাকলের তীব্রতায় দুই খেলোয়াড়ই চোট পেয়ে মাঠে শুয়ে পড়লে খেলা কিছুক্ষণের জন্য বন্ধ থাকে। ঠিক এই সময়েই দৃশ্যপটে হাজির হয় ভিএআর (VAR)। ভিএআর কর্মকর্তারা রেফারি ক্লাউসকে মাঠের পাশের মনিটরে গিয়ে ঘটনার রিপ্লে দেখার পরামর্শ দেন। মনিটরে স্লো-মোশনে ভিডিও ফুটেজটি দেখার পর মাঠে ফিরে নিজের আগের সিদ্ধান্ত বদলে বালোগানকে সরাসরি লাল কার্ড দেখান রেফারি।

মেসির স্মৃতি ও রিও ফার্ডিনান্ডের তোপ

বালোগানের এই লাল কার্ডের পর ফুটবল বিশ্বে নতুন করে আলোচনার ঝড় তুলেছে আর্জেন্টিনার প্রথম ম্যাচের একটি ঘটনা। আলজেরিয়ার বিপক্ষে সেই ম্যাচে প্রায় হুবহু একই কায়দায় আলজেরিয়ান ডিফেন্ডার আইসা মান্দির পায়ের পেছনের অংশে বুটের তলা দিয়ে মাড়িয়ে দিয়েছিলেন লিওনেল মেসি। সে সময় আলজেরিয়ার ফুটবলাররা মেসির লাল কার্ডের জোরালো দাবি জানালেও পোলিশ রেফারি সাইমন মার্চিনিয়াক কেবল ফাউলের বাঁশি বাজিয়েই ক্ষান্ত হন, কোনো কার্ড দেখানোর প্রয়োজন মনে করেননি। এমনকি ভিএআর-ও তখন নীরব ছিল।

বালোগানের লাল কার্ডের পর এই দুটি ঘটনার তুলনা করে ম্যাচ শেষে বিবিসি-র স্টুডিওতে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন ইংল্যান্ডের সাবেক কিংবদন্তি ডিফেন্ডার রিও ফার্ডিনান্ড। 

তিনি বলেন, "ঠিক এই ধরনের ধোঁয়াশাপূর্ণ জায়গাগুলোতেই সাধারণ মানুষ এবং ফুটবলপ্রেমীরা ভিএআর-এর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। ফুটবলের মাঠে সবাই নিয়মের একই ধরনের প্রয়োগ দেখতে চায়। আলজেরিয়ার বিপক্ষে মেসির সেই ট্যাকলটার কথা আমাদের সবার মনে আছে। 

অনেকেরই স্পষ্ট ধারণা ছিল ওটা সরাসরি লাল কার্ড পাওয়ার মতো অপরাধ ছিল। কিন্তু রহস্যজনকভাবে সেটি ঠিকঠাক খতিয়ে দেখা হলো না, কোনো শাস্তিও দেওয়া হলো না। আর আজ বালোগানের ট্যাকলটা দেখুন- ভিএআর নিজে থেকে মাঝে নাক গলাল, রেফারিকে মনিটর দেখতে বাধ্য করল এবং আচমকা একটা সরাসরি লাল কার্ড বের করে দেওয়া হলো। এই যে তারকার নাম বা দলের ওজন দেখে নিয়মের আলাদা প্রয়োগ, এটাই খেলোয়াড়, কোচ ও সমর্থকদের সবচেয়ে বেশি হতাশ করে।

'স্লো-মোশন' বনাম স্বাভাবিক গতি, সু স্মিথের ব্যাখ্যা

বিবিসির হয়ে ধারাভাষ্য দেওয়ার সময় ইংল্যান্ড নারী ফুটবল দলের সাবেক স্ট্রাইকার সু স্মিথ ঘটনাটির একটি প্রযুক্তিগত ও মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তাঁর মতে, ভিএআর-এর স্টিল ছবি বা স্লো-মোশন অনেক সময় ঘটনার আসল তীব্রতাকে ভুলভাবে উপস্থাপন করে। 

স্মিথ বলেন, রিপ্লে দেখার সময় ফ্রেমটা যখন আটকে (ফ্রিজ ফ্রেম) রাখা হয়, তখন বুটের অবস্থান দেখে আপনার মনে হতেই পারে যে এটা শতভাগ লাল কার্ড পাওয়ার মতোই অপরাধ। কিন্তু খেলাটি স্বাভাবিক গতিতে দেখলে সিদ্ধান্তটা বড্ড বেশি কঠোর মনে হবে। তিনি আরও যোগ করেন, বালোগানের কোনো অসৎ উদ্দেশ্য ছিল না, দুর্ভাগ্যবশত কেবল তার পা-টা ভুল জায়গায় পড়ে গিয়েছিল।

ক্ষুব্ধ ডেম্পসি ও পচেত্তিনোর প্রতিক্রিয়া

যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক তারকা ফরোয়ার্ড এবং বিশ্বকাপের অন্যতম ধারাভাষ্যকার ক্লিন্ট ডেম্পসিও এই সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেছেন। ম্যাচ পরবর্তী বিশ্লেষণে তিনি বলেন, "মাঠের সুন্দর ফুটবল নিয়ে কথা বলার বদলে এখন আমাদের আবারও রেফারিদের ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে কথা বলতে হচ্ছে। আমার মনে হয় যুক্তরাষ্ট্র দলকে বড্ড বেশি কঠোর শাস্তি দেওয়া হয়েছে। ফ্লোরিয়ান বালোগান এমন কোনো জঘন্য অপরাধ করেনি, যার জন্য ওকে সরাসরি লাল কার্ড দেখাতে হবে। বিশ্বকাপের মতো এত বড় একটা টুর্নামেন্টের নকআউট ম্যাচে এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে রেফারিকে শতভাগ নিশ্চিত হতে হবে, কারণ এই একটি সিদ্ধান্ত পুরো ম্যাচের ভাগ্য এবং একটি দলের স্বপ্ন নির্ধারণ করে দিতে পারে।

ম্যাচ শেষে সংবাদ সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্রের আর্জেন্টাইন কোচ মরিসিও পচেত্তিনোও নিজের ক্ষোভ চেপে রাখতে পারেননি। তিনি বালোগানের পাশে দাঁড়িয়ে স্পষ্ট ভাষায় বলেন, এটা কোনো অবস্থাতেই লাল কার্ড হতে পারে না। প্রতিপক্ষ খেলোয়াড়ের পা মাড়িয়ে দেওয়ার কোনো উদ্দেশ্যই বালোগানের ছিল না। ও কেবল বলটি ব্লক করতে চেয়েছিল।

পরবর্তীতে যখন পচেত্তিনোকে তাঁর স্বদেশী তারকা লিওনেল মেসির সেই একই রকম ফাউল এবং পার পেয়ে যাওয়ার ঘটনা নিয়ে প্রশ্ন করা হয়, তখন তিনি কিছুটা কৌশলী অথচ নিরপেক্ষ অবস্থান নিয়ে বলেন, "আমার দৃষ্টিকোণ থেকে, এই দুটির কোনোটিই লাল কার্ড পাওয়ার মতো ফাউল ছিলনা। ফুটবল একটি গতিশীল খেলা, এখানে এমন কন্টাক্ট হতেই পারে। কিন্তু দুটির ক্ষেত্রে দুই রকম বিচার মেনে নেওয়া কঠিন।

শেষ ষোলোর আগে বড় ধাক্কা

বসনিয়াকে হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে জায়গা করে নিলেও যুক্তরাষ্ট্রের আনন্দ উদযাপনে বিষাদের ছায়া ফেলেছে এই লাল কার্ড। টুর্নামেন্টের নিয়ম অনুযায়ী, সরাসরি লাল কার্ড পাওয়ায় শেষ ষোলোর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে বেলজিয়ামের বিপক্ষে মাঠে নামতে পারবেন না দলের প্রধান আক্রমণভাগের ভরসা ফ্লোরিয়ান বালোগান। 

নকআউটের হাইভোল্টেজ ম্যাচে বেলজিয়ামের মতো শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে বালোগানের অনুপস্থিতি পচেত্তিনোর দলের জন্য এক বিরাট বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে। এখন দেখার বিষয়, এই বিতর্কিত সিদ্ধান্তের ধাক্কা সামলে মার্কিন দল শেষ ষোলোর বৈতরণী পার হতে পারে কি না।

এএন