উত্তর আমেরিকার মাটিতে চলমান ফুটবল বিশ্বকাপে প্রতিটি দলই এসেছে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতে। তবে টুর্নামেন্ট শুরুর আগে যে দলটিকে নিয়ে ফুটবল পণ্ডিত বা সাধারণ সমর্থকদের প্রত্যাশা ছিল একেবারেই শূন্যের কোঠায়, তারা হলো আফ্রিকার ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্র কেপ ভার্দে।
মাত্র সাড়ে পাঁচ লাখ জনসংখ্যার এই দেশটির প্রথমবার বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করাটাই ছিল এক পরম বিস্ময়। কিন্তু মাঠের খেলায় সব হিসাব-নিকাশ উল্টে দিয়ে, নিজেদের ‘জায়ান্ট কিলার’ বা পরাশক্তি-বধকারী খ্যাতির প্রতি পূর্ণ বিচার করে উত্তর আমেরিকার বিশ্বমঞ্চে এক অবিশ্বাস্য রূপকথা রচনা করে চলেছে কেপ ভার্দের ‘ব্লু শার্কস’রা।
আফ্রিকান অঞ্চলের বাছাইপর্বে একের পর এক শক্তিশালী দলকে স্তব্ধ করে দিয়ে তারা যেভাবে মূল আসরের টিকিট কেটেছিল, ঠিক সেই একই রূপকথার ধারা তারা বজায় রেখেছে মূল পর্বেও। বিশ্বমঞ্চে তাদের এই স্বপ্নযাত্রা এখন আর কেবল কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয়, বরং বিশ্ব ফুটবলের নতুন এক শক্তির উত্থানের গল্প।
প্রত্যাশার চাপহীন এক রূপকথার শুরু
ভৌগোলিক ও জনমিতিক দিক থেকে কেপ ভার্দে অত্যন্ত ছোট একটি দেশ। আটলান্টিক মহাসাগরের বুকে অবস্থিত ১০টি আগ্নেয় দ্বীপের এই সমষ্টির মোট জনসংখ্যা ইউরোপ বা আমেরিকার যেকোনো একটি বড় শহরের চেয়েও কম।
স্বাভাবিকভাবেই, ফুটবল অবকাঠামো কিংবা বড় টুর্নামেন্ট খেলার অভিজ্ঞতায় তারা অন্যান্য পরাশক্তিদের চেয়ে বহু যোজন পিছিয়ে ছিল। যখন কেপ ভার্দে তাদের ইতিহাসের প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করে, তখন ফুটবল বিশ্বের সিংহভাগ মানুষের ধারণা ছিল- দলটি কেবল অভিজ্ঞতা অর্জন করতেই বিশ্বমঞ্চে এসেছে। গ্রুপ পর্বের তিনটি ম্যাচ খেলেই হয়তো বিদায় নিতে হবে তাদের।
কিন্তু কেপ ভার্দের ফুটবলারদের মনে ছিল অন্যরকম জেদ। কোনো ধরনের প্রত্যাশার চাপ না থাকায় তারা মাঠে নেমেছে সম্পূর্ণ ভয়ডরহীন ফুটবল খেলার মানসিকতা নিয়ে। এই মানসিকতাই তাদের আফ্রিকার কঠিনতম বাছাইপর্ব পার হতে সাহায্য করেছিল, যেখানে তারা ঘানা, নাইজেরিয়া বা ক্যামেরুনের মতো পরাশক্তিদের পেছনে ফেলে উত্তর আমেরিকার টিকিট নিশ্চিত করেছিল। আর এখন মূল পর্বেও তাদের সেই লড়াকু মনোভাব বড় বড় দলগুলোর জন্য আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কেন তাদের বলা হয় ‘ব্লু শার্কস’ ও ‘জায়ান্ট কিলার’?
কেপ ভার্দে জাতীয় ফুটবল দলকে তাদের সমর্থকেরা ভালোবেসে ডাকেন ‘ব্লু শার্কস’ বা নীল হাঙর। সমুদ্রঘেরা দেশের এই ফুটবলাররা মাঠের ভেতরেও ঠিক হাঙরের মতোই আক্রমণাত্মক ও ক্ষুধার্ত। গত কয়েক বছরে আফ্রিকান কাপ অব নেশনস (আফকন) এবং বিশ্বকাপের বাছাইপর্বে তারা বেশ কয়েকটি বড় দলকে হারিয়ে ‘জায়ান্ট কিলার’ বা বড় দল বধকারী হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করেছে।
ফুটবল বোদ্ধাদের মতে, কেপ ভার্দের এই সাফল্যের মূল চাবিকাঠি হলো তাদের প্রবাসী ফুটবলারদের জাতীয় দলে অন্তর্ভুক্তি। পর্তুগাল, নেদারল্যান্ডস ও ফ্রান্সসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে থাকা কেপ ভার্দে বংশোদ্ভূত একঝাঁক তরুণ ও অভিজ্ঞ ফুটবলারকে একত্রিত করে তৈরি করা হয়েছে এই দল।
ইউরোপীয় ক্লাব ফুটবলের আধুনিক কৌশল এবং আফ্রিকান ফুটবলের সহজাত শারীরিক শক্তি ও গতির এক দারুণ মিশ্রণ ঘটেছে এই ব্লু শার্কস শিবিরে। ফলে, প্রতিপক্ষ যত বড় নামই হোক না কেন, কেপ ভার্দের হাই-প্রেসিং ফুটবল ট্যাকটিকসের সামনে থতমত খেয়ে যাচ্ছে সবাই।
উত্তর আমেরিকার মাটিতে স্বপ্নের উড্ডয়ন
চলমান বিশ্বকাপে উত্তর আমেরিকার চোখধাঁধানো স্টেডিয়ামগুলোতে কেপ ভার্দে যখন প্রথম মাঠে নামে, তখন গ্যালারির সিংহভাগ দর্শকই ছিল প্রতিপক্ষের পক্ষে। কিন্তু ম্যাচ যত গড়িয়েছে, কেপ ভার্দের নান্দনিক ও লড়াকু ফুটবল মন জয় করে নিয়েছে নিরপেক্ষ দর্শকদেরও। গতিশীল উইঙ্গারদের আক্রমণ, মাঝমাঠের নিখুঁত নিয়ন্ত্রণ এবং রক্ষণভাগের ইস্পাতকঠিন দৃঢ়তা- সব মিলিয়ে প্রথম ম্যাচ থেকেই তারা চমক দেখাতে শুরু করে।
বাছাইপর্বের সেই অবিশ্বাস্য ফর্ম যে কোনো ফ্লুক বা ভাগ্যের জোর ছিল না, তা তারা প্রমাণ করেছে মূল আসরের গ্রুপ পর্বের ম্যাচগুলোতে। গ্রুপ পর্বের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে তথাকথিত ফেভারিটদের রুখে দিয়ে বা হারিয়ে দিয়ে তারা নকআউট পর্বের দিকে এগিয়ে চলেছে।
দলটির কোচ ম্যাচ পরবর্তী এক সংবাদ সম্মেলনে আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, আমাদের হারানোর কিছু ছিল না। আমরা যখন দেশ থেকে রওনা হয়েছিলাম, আমাদের দেশের মানুষের চোখে শুধু একটাই স্বপ্ন ছিল- বিশ্ব যেন জানতে পারে কেপ ভার্দেও ফুটবল খেলতে পারে। আজ আমাদের ছেলেরা সেই মর্যাদা ধরে রেখেছে। আমরা এখানে কোনো দলের কাছে স্রেফ পয়েন্ট উপহার দিতে আসিনি, আমরা আমাদের নিজেদের ইতিহাস লিখতে এসেছি।
মনস্তাত্ত্বিক শক্তি ও দলীয় সংহতি
কেপ ভার্দের এই রূপকথার পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান তাদের দলীয় সংহতি। দলে কোনো ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো বা লিওনেল মেসির মতো বিশ্বখ্যাত সুপারস্টার নেই, আর এটাই তাদের সবচেয়ে বড় শক্তি। মাঠের ১১ জন খেলোয়াড় একে অপরের জন্য লড়াই করেন। একজনের ভুল অন্যজন নিজের সর্বোচ্চটা দিয়ে পুষিয়ে দেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কেপ ভার্দের ফুটবলারদের এই মনস্তাত্ত্বিক দৃঢ়তা এসেছে তাদের জাতীয় পরিচয় এবং কঠোর পরিশ্রমের মানসিকতা থেকে। প্রতিকূল আবহাওয়া এবং সীমিত সম্পদের মধ্য থেকে উঠে আসা এই ফুটবলাররা বিশ্বমঞ্চের প্রতিটি মুহূর্তকে উপভোগ করছেন। তাদের খেলায় কোনো ক্লান্তি নেই, নেই কোনো হারের ভয়।
বিশ্ব ফুটবলে এক নতুন বার্তা
কেপ ভার্দের এই অবিশ্বাস্য পারফরম্যান্স বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা এবং ফুটবল বিশ্লেষকদের একটি নতুন বার্তা দিচ্ছে- ফুটবল এখন আর কেবল গুটিকয়েক বড় দেশ বা বড় বাজেটের দলের একচেটিয়া সম্পত্তি নয়। সঠিক পরিকল্পনা, প্রবাসে থাকা প্রতিভাদের সঠিক মূল্যায়ন এবং মাঠের ভেতরের শৃঙ্খলা থাকলে সাড়ে পাঁচ লাখ জনসংখ্যার একটি দেশও বিশ্ব কাঁপিয়ে দিতে পারে।
উত্তর আমেরিকার এই বিশ্বকাপে কেপ ভার্দের দৌড় শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে থামবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। তারা হয়তো কোয়ার্টার ফাইনাল, সেমিফাইনাল বা তারও বেশি দূর যেতে পারে, কিংবা যেকোনো মুহূর্তে বিদায় নিতে পারে।
কিন্তু ফলাফলের ঊর্ধ্বে উঠে ব্লু শার্কসরা ইতিমধ্যে যা অর্জন করেছে, তা ফুটবল ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। বিশ্বের কোটি কোটি সুবিধাবঞ্চিত ও ছোট দেশের ফুটবলারদের জন্য কেপ ভার্দে এখন এক পরম অনুপ্রেরণার নাম। ব্লু শার্কসদের এই রূপকথা প্রমাণ করে দিল যে, ফুটবলে স্বপ্নের কোনো সীমানা নেই।
এএন