রুদ্ধশ্বাস ও হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের পর মিশরকে ৩-২ গোলে হারিয়ে বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনাল নিশ্চিত করেছে আর্জেন্টিনা। তবে মাঠের সেই উত্তেজনাকে ছাপিয়ে ফুটবল বিশ্বে এখন বড় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে ম্যাচের শেষদিকে রেফারিং এবং মিশরের কোচের একটি রহস্যময় ইশারা।
ম্যাচ চলাকালীন রেফারির একাধিক সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে যখন মিশরের ফুটবলাররা ক্ষোভ উগড়ে দিচ্ছিলেন, ঠিক তখনই সাইডলাইনে দাঁড়িয়ে প্রধান কোচ হোসাম হাসান নিজের দুই হাত বুকের ওপর ক্রসের (ইংরেজি ‘এক্স’ অক্ষরের) মতো করে এক ইঙ্গিতপূর্ণ বার্তা দেন। উত্তেজিত পরিস্থিতিতে তিনি হঠাৎ কেন এমন সংকেত দিলেন এবং ফুটবলীয় নিয়মে এর আসল মানে কী- তা নিয়ে এখন চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে।
যে কারণে দেখানো হয় ‘এক্স’ সংকেত: কব্জির কাছে দুই হাত ক্রস করে ‘এক্স’ আকৃতি তৈরি করা মূলত বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফার একটি দাপ্তরিক ও স্বীকৃত বিশেষ সংকেত। ম্যাচ চলাকালে মাঠে সম্ভাব্য যেকোনো ধরনের বর্ণবাদী (Racist) কিংবা বৈষম্যমূলক আচরণের শিকার হলে তার তাৎক্ষণিক অভিযোগ জানাতে খেলোয়াড়, কোচ বা ম্যাচ অফিশিয়ালরা এই ইশারা ব্যবহার করে থাকেন। এর মূল উদ্দেশ্য হলো- বৈষম্যের মতো গুরুতর অভিযোগ যেন রেফারি বা ম্যাচ কমিশনারদের নজর এড়িয়ে না যায় এবং প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিক আইনি প্রক্রিয়া যেন দ্রুত শুরু করা সম্ভব হয়।
মূলত ২০২৪ সালে থাইল্যান্ডের ব্যাংককে অনুষ্ঠিত ফিফার ৭৪তম কংগ্রেসে সর্বসম্মতিক্রমে এই দৃশ্যমান সংকেত ব্যবহারের নিয়ম অনুমোদন করা হয়। বিশ্ব ফুটবল থেকে বর্ণবাদ ও অন্যান্য বৈষম্যমূলক আচরণ চিরতরে দূর করতে লড়াই জোরদার করার অংশ হিসেবেই এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। তবে মাঠে ‘এক্স’ সংকেত দেওয়া মানেই যে ম্যাচ সঙ্গে সঙ্গে বন্ধ হয়ে যাবে, এমনটি নয়। এটি মূলত রেফারিকে সম্ভাব্য কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত বর্ণবাদী ঘটনার বিষয়ে সতর্ক করার একটি আনুষ্ঠানিক সতর্কবার্তা।
মাঠে কোনো খেলোয়াড় বা কোচ এই সংকেত প্রদর্শন করলে ফিফার নিয়মে তিনটি ধাপে ব্যবস্থা নেওয়ার স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে:
প্রথম ধাপ: উদ্ভূত পরিস্থিতি মূল্যায়নের জন্য রেফারি সাময়িকভাবে মাঠের খেলা বন্ধ রাখতে পারেন এবং স্টেডিয়ামে সতর্কবার্তা ঘোষণা করা হতে পারে।
দ্বিতীয় ধাপ: মাঠ বা গ্যালারি থেকে বৈষম্যমূলক আচরণ অব্যাহত থাকলে ম্যাচ স্থগিত করা হতে পারে এবং সুরক্ষার স্বার্থে দুই দলের খেলোয়াড়দের সাময়িকভাবে মাঠ ছেড়ে ড্রেসিংরুমে চলে যেতে বলা হবে।
তৃতীয় ও চূড়ান্ত ধাপ: পরিস্থিতির কোনো উন্নতি না হলে এবং পরিবেশ স্বাভাবিক করা না গেলে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি বা দলের সুরক্ষায় ম্যাচটি স্থায়ীভাবে পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হতে পারে।
এই সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার মাধ্যমে রেফারিদের জন্য স্পষ্ট নির্দেশনা এবং খেলোয়াড় বা কোচদের জন্য তাৎক্ষণিক অভিযোগ জানানোর একটি জোরালো দৃশ্যমান মাধ্যম নিশ্চিত করতে চায় ফিফা।
কেন এই সংকেত দিলেন হোসাম হাসান?
ম্যাচের শেষ মুহূর্তে এনজো ফার্নান্দেজ গোল করে আর্জেন্টিনাকে এগিয়ে নেওয়ার পর, আলবিসেলেস্তাদের উদ্যাপনের সময় মাঠের ভেতরে কোনো ফুটবলার বা স্টাফের পক্ষ থেকে বর্ণবাদী বা বৈষম্যমূলক মন্তব্য করা হয়েছে বলে মনে করেন মিশরের কোচ হোসাম হাসান। সেই গুরুতর অভিযোগটি অফিশিয়ালি জানাতেই তিনি ডাগআউটে দাঁড়িয়ে এই ‘এক্স’ সংকেত ব্যবহার করেন। তবে এই তীব্র বিতর্কের সময় পর্যন্ত হোসাম হাসানের আনা এই সুনির্দিষ্ট অভিযোগের পক্ষে কোনো প্রকাশ্য, জোরালো বা চূড়ান্ত তথ্য-প্রমাণ সংবাদমাধ্যমের সামনে আসেনি।
সবচেয়ে বড় বিতর্ক তৈরি হয় ফরাসি রেফারি ফ্রাঁসোয়া লেটেক্সিয়ারের ভূমিকা নিয়ে। হোসাম হাসান প্রোটোকল অনুযায়ী ‘এক্স’ সংকেত দেখানো সত্ত্বেও রেফারি খেলা বন্ধ করেননি; উল্টো সাইডলাইনে দাঁড়িয়ে তীব্র প্রতিবাদ জানানোয় মিশরের কোচকে একটি হলুদ কার্ড দেখান। ফলে রেফারির এই তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ফুটবল বিশ্বে ব্যাপক মতভেদের সৃষ্টি হয়েছে। ফুটবল বিশ্লেষকদের এক পক্ষের মতে, ফিফার নিয়ম অনুযায়ী বিষয়টি তখনই আরও গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখা উচিত ছিল। আবার অন্য পক্ষের দাবি, ফিফার মতো এত বড় আসরে খেলা বন্ধ করার মতো যথেষ্ট বা চাক্ষুষ কোনো প্রমাণ তখন রেফারির হাতে ছিল না।
ফিফার নতুন প্রোটোকলের বড় পরীক্ষা
২০২৬ সালের এই চলমান বিশ্বকাপই পুরুষ ফুটবল ইতিহাসের প্রথম আসর, যেখানে এই বিশেষ ‘এক্স’ সংকেতকে ফিফার আনুষ্ঠানিক ও দৃশ্যমান বর্ণবাদবিরোধী প্রোটোকলের অংশ হিসেবে সরাসরি মাঠে ব্যবহার করা হচ্ছে। ফলে কোটি কোটি বিশ্ব দর্শকের সামনে জাতীয় দলের একজন কোচের এই সংকেত ব্যবহার করাটা ভবিষ্যতে ফিফার বৈষম্য ও বর্ণবাদবিরোধী নীতিমালার অন্যতম একটি বড় উদাহরণ হয়ে থাকবে।
এখন দেখার বিষয়, ফুটবল মাঠ থেকে বর্ণবাদের মতো ব্যাধি দূর করতে ফিফার এই নতুন নিয়ম ভবিষ্যতে কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে, নাকি বিশ্বকাপের মতো হাইভোল্টেজ ম্যাচগুলোতে এটি কেবলই নতুন নতুন বিতর্কের জন্ম দিতে থাকবে!
জেএইচআর