জামায়াত নীরবতায় অন্য কিছু!

আবদুর রহিম প্রকাশিত: আগস্ট ২৪, ২০২৩, ১১:৪৬ পিএম
  • একই মঞ্চে জামায়াত বিএনপি আন্দোলনে নামছে বলে গুঞ্জন, রয়েছে একক কর্মসূচিও  
  • সরকারের উদ্দেশ্য বুঝতে পেরেই কৌশলী জামায়াত নীরব কর্মসূচিতে সরকার ব্যর্থ বলে মনে করছে দলটি
  • সাঈদী ইস্যুতে দলের অভ্যন্তরে প্রশ্ন, মাঠ পর্যায়ে ক্ষোভ থাকলেও রহস্যজনক নীরবতা
  • পর্যবেক্ষণ ছিল কর্মসূচিতে মানুষের মৃত্যুশঙ্কার নির্বাচনপূর্ব সংঘাত এড়ানোই ছিল টার্গেট

দাবি আদায়ে জামায়াত অতীতেও সফল হয়েছে আগামীতেও হবে। জঙ্গি ইস্যু সরকারের নাটক 
—মতিউর রহমান আকন্দ

হঠাৎ জামায়াতে ইসলামীতে নীরবতা! গত ১৪ আগস্ট দলের নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী মারা যান। এ ইস্যুতেও বড় কোনো কর্মসূচি নেই। মৃত্যুর দুদিন পর একটি সংবাদ সম্মেলন করে দোয়া মাহফিল ও ১০ দিন পর গত বুধবার প্রতিবাদ বিক্ষোভ কর্মসূচি দিয়েই অনেকটা অন্তরালে। মৃত্যুর দিন রাতের বেলায় পিজি হাসপাতালে জড়ো হয়ে লাশ আটকিয়ে পুলিশের সঙ্গে যারা সংঘর্ষে জড়ায় তারা অনেকেই জামায়াতের পদবিধারী কেউ নন, সাঈদী ভক্ত ও অনুসারীই— বলছেন নীতিনির্ধারকরা। জামায়াতের রহস্যময় নীরব ভূমিকা নিয়ে দলের অভ্যন্তরেও অনেকে প্রশ্ন তুলেছের বলে জানা গেছে। মাঠপর্যায়ের অনেকে ক্ষুব্ধ হয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে স্ট্যাটাস দিতেও দেখা গেছে। অন্যদিকে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মী, সরকারের প্রশাসনিক কর্মকর্তা সাঈদী ইস্যুতে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে পদ হারাতেও দেখা গেছে। মসজিদে মসজিদে দোয়া করে প্রায় অর্ধ-শতাধিক ঈমাম চাকরি হারিয়েছেন বলেও গণমাধ্যমে খবর এসেছে।

দলটির নির্ভরযোগ্য সূত্র বলছে, দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী সঠিক চিকিৎসা পেয়েছে কি-না, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কোনো অবহেলা ছিল কি-না, এ বিষয়ে দলের ভারপ্রাপ্ত আমির, সাবেক এমপি অধ্যাপক মুজিবুর রহমান সাঈদী মৃত্যুতে তদন্ত চেয়েছেন এবং শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন। এর আগে ২০১৩ সালে সাঈদীর রায় ঘোষণায় সারা দেশে দেড় শতাধিক লোক মারা গেছে। তাই এবার পুরো সাঈদী বিষয়টিকে জামায়াত খুবই স্পর্শকাতর হিসেবে বিবেচনা করেছে। সরকারের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের বিষয়টিকে রাজনৈতিকভাবেই মোকাবিলা করেছে দলটি। দলের পক্ষ থেকে যদি বড় কোনো কর্মসূচি দেয়া হতো তাহলে অতীতের মতো সাধারণ মানুষের মৃত্যু শঙ্কা তৈরি হতো বলেও জামায়াতের পর্যবেক্ষণ ছিল এবং সরকার আগামী দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বিশ্ব দরবারে সন্ত্রাসী দল হিসেবে জামায়াতকে উপস্থাপন করতেও চেষ্টা করত বলে দলটির ভাষ্য। 

দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী ইস্যুতে দলের নেতাকর্মীরা যেমন আবেগ আপ্লুত তেমন সাধারণ মানুষও এতে সম্পৃক্ত হলে অন্য কিছু ঘটে যেত। জামায়াতের নীতিনির্ধারণী সূত্র বলছে, সরকার জামায়াতকে বিশ্ব দরবারে প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্য অনেক পরিকল্পনাই এঁকেছে। সেটি তারা বুঝতে পেরে আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে অনেক সতর্কতার সাথেই তারা হাঁটছে। অতীতে তারা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের জন্য আন্দোলন করে দাবি আদায়ে সফল হয়েছে। এবারও তারা তত্ত্বাবধায়ক সরকার ইস্যুতে আন্দোলনের পরিকল্পনা করছে। বিএনপির সঙ্গে শুরুতে এক দফার দাবি আদায়ে যুগপৎ কর্মসূচিতে এক সাথে হাঁটলেও দলীয় কৌশলে পিছু হটে। উপরে উপরে বিএনপির সঙ্গে জামায়াতের দূরত্ব রয়েছে এমন খবর থাকলেও ভেতরে ভেতরে জামায়াত-বিএনপির একই উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের টার্গেট রয়েছে বলেই সংশ্লিষ্টদের দাবি। রাজনৈতিক কৌশলে আপাতত দুই দল একলা চলো নীতিতে রয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, স্বল্প সময়ের জন্য কেয়ারটেকার সরকার বাস্তবায়নে জামায়াত-বিএনপি একই মঞ্চেই আন্দোলনে নামতে পারে। এ ছাড়া জামায়াতের থাকবে একক কর্মসূচি এবং বিএনপি শর্ট টাইমে যে আন্দোলনের  চিন্তা করছে সেখানে জামায়াতও অন্যতম সঙ্গী হবে। বিএনপির এক নীতিনির্ধারণী সূত্র বলছে, জামায়াতের সঙ্গে বিএনপির এখন তেমন আর দূরত্ব নেই। আন্তর্জাতিক কিছু পলিসির কারণে একলা চলো নীতিতে রয়েছে দুই দল। 

আবার আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতার মাধ্যমেই খুব শিগগিরই দুই দল এক সাথে মাঠে নামবে— এমন কথাও শোনা যাচ্ছে। এ ছাড়া খালেদা জিয়া যতদিন জীবিত রয়েছেন,  জামায়াতের সাথে দূরত্ব হওয়ার তেমন কোনো সম্ভাবনা নেই। এ ছাড়া দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানও জামায়াত বিষয়ে পজেটিভ রয়েছেন। যখন বৃহৎ স্বার্থে প্রয়োজন হবে তখনই ঘোষণা আসবে। 

দলের নীরবতা ও সামগ্রিক বিষয়ে নিয়ে জানতে চাইলে নাম প্রকাশে অচ্ছুিক দলের এক কেন্দ্রীয় মজলিশে সূরা সদস্য আমার সংবাদকে বলেন, ‘জামায়াত এ দেশের জনগণের অধিকার বাস্তবায়নের জন্য রাজনীতি করে। সত্যের পক্ষে কথা বলায়, দেশ ও মানুষের জন্য কথা বলায়, ইসলামের পক্ষে কথায় বলায় এ দলটিকে অনেক নির্যাতন-জুলুমের শিকার হতে হয়েছে। প্রতিষ্ঠার পর থেকে বহু ষড়যন্ত্রের সম্মুখীন হতে হয়েছে। আদালতকে ব্যবহার করে ফরমায়েশি রায়ে শীর্ষ নেতাদের ফাঁসির পর সরকার মনে করেছিল, জামাতের ভূমিকা ও অবস্থান বিনষ্ট হয়ে যাবে। কিন্তু এখানেও জনগণের মেন্ডেডবিহীন সরকার ব্যর্থ হয়েছে। জামায়াত নিয়ে কোনো প্রোপাগান্ডাই এ দেশের মানুষ অতীতেও বিশ্বাস করেনি, আগামীতেও করবে না।’ 

তিনি বলেন, ‘দেশের প্রয়োজন ও সংকটের সময় জনগণের পক্ষে কথা বলে জামায়াত অতীতেও যেমন সফল হয়েছে, কেয়ারটেকার সরকার দাবি আদায় করেছে। চলমান এ রাজনৈতিক দুঃসময়ে জামায়াত আগামীতেও জনগণের পক্ষে ভূমিকা পালন করবে ইনশাআল্লাহ!  জঙ্গি নিয়ে সরকার যে রাজনৈতিক অ্যাজেন্ডা বাস্তবায়নের চেষ্টা চালাচ্ছে, জঙ্গি জঙ্গি যে নাটক শুরু করেছে তা এবার আর দেশের মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না। গেলো সপ্তাহে আমাদের নেতা বিশ্বনন্দিত ইসলামিক নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ঘটনায় সরকার চেয়েছিল জামায়াত রাজপথে নেমে জ্বালাও-পোড়াওয়ের আন্দোলন করুক। আমরা সেটি বুঝতে পেরে সরকারের ফাঁদে পা দেইনি। আমরা শান্তিপূর্ণ আন্দোলন করেছি এবং তার চিকিৎসায় কোনো অবহেলা ছিল কি-না, এ নিয়ে তদন্ত দাবি করেছি। ঢাকায় তার জানাজা না দেয়ায় এ দেশের মানুষই সরকারকে ঘৃণা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে। 

তিনি বলেন, দেশের রাজনীতির সামগ্রিক সব বিষয়ে আমাদের নজর রয়েছে। যখন যেই ভূমিকা প্রয়োজন হবে দেশের জনগণকে নিয়ে তা বাস্তবায়ন করা হবে।’

জামাতের কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক মতিউর রহমান আকন্দ আমার সংবাদকে বলেন, ‘কেয়ারটেকার সরকার বিষয়টি জামাতের মৌলিক আন্দোলনের বিষয়, জামাতের পক্ষ থেকে এটি উদ্ভাবক। কেয়ারটেকার সরকার দাবি আদায়ের ভূমিকা ও তাত্ত্বিক বিষয় জনগণের অধিকার আদায়ের জন্যই জামায়াতের পক্ষ থেকেই নেয়া হয়েছে। এ দাবি আদায়ে জামায়াত অতীতেও সফল হয়েছে, আগামীতেও জনগণকে নিয়ে আন্দোলনে সফল হবে।’ 

তিনি আরো বলেন, ‘সমপ্রতি আমরা একটি জঙ্গি নাটক দেখতে পাচ্ছি, আমরা স্পষ্ট করে বলছি,  জঙ্গিবাদের বিষয়ে জামায়াতে ইসলামী চরম বিরোধী। ইসলামের জঙ্গিবাদের কোনো স্থান নেই। সরকার বিদেশিদের নজরে আসতে এ জঙ্গি নাটক শুরু করেছে। কিন্তু এবার আর তারা সফল হবে না। জনগণ সব কিছুই বুঝে গেছে। কেয়ারটেকার সরকার দাবি আদায়ের মাধ্যমে সরকার খুব শিগগিরই বিদায় হবে।