পার্লারের আড়ালে লিঙ্গ সার্জারি

মো. মাসুম বিল্লাহ প্রকাশিত: জুলাই ৩১, ২০২২, ০১:১৮ এএম
পার্লারের আড়ালে লিঙ্গ সার্জারি

বিউটি পার্লারে নারীদের রূপচর্চার আড়ালে পুরুষদের লিঙ্গ রূপান্তর করে হিজড়া বানিয়ে আসছিল একটি চক্র। এ চক্রের মূলহোতা হাদিউজ্জামানের নেই কোনো ডাক্তারি সনদ। একসময় চিকিৎসকের সহকারী হিসেবে কাজ করে এখন তিনি নিজেই সার্জন বনে গেছেন।

হিজড়াদের ‘গুরুমা’কেন্দ্রিক একটি দল পুরুষদের প্রলোভন দেখিয়ে হাদিউজ্জামানের পার্লারে এনে পুরুষাঙ্গ কেটে ফেলত। স্তন বৃদ্ধির জন্য শরীরে দেয়া হতো স্ত্রী হরমোন ইনজেকশন। দীর্ঘ পাঁচ বছরে শতাধিক রূপান্তরকামী পুরুষের অস্ত্রোপচার করেছে তারা।

গত শুক্রবার রাতে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে চক্রের মূলহোতা হাদিউজ্জামান, তার স্ত্রী সোনিয়া আক্তারসহ দুই সহযোগীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। রাজধানীর মালিবাগে মাহি হাসান টাওয়ারের চতুর্থ তলায় স্ত্রীর নামে ‘লেজার বিউটি পার্লার’ খুলে এসব অপকর্ম চালাচ্ছিল হাদিউজ্জামান। তাদের সহযোগী দুজন হলো— নুর ইসলাম ও জনি আহম্মদ।

বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) রমনা বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার এইচ এম আজিমুল হক। এ সময় পার্লারের বিশেষ একটি কক্ষে অভিযান চালিয়ে অপারেশনের বিভিন্ন সরঞ্জাম এবং হরমোন পরিবর্তনের ওষুধ উদ্ধার করা হয়েছে।

উপ-পুলিশ কমিশনার এইচ এম আজিমুল হক জানান, দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে বিশেষ চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য দেখে রূপান্তরকামী পুরুষদের টার্গেট করে ঘনিষ্ঠতা বাড়াত হিজড়াদের ‘গুরুমা’কেন্দ্রিক চক্রের সদস্যরা।

এরপর ওই পুরুষদের নিজেদের ডেরায় নিয়ে আদর-আপ্যায়নের মাধ্যমে আস্থা অর্জন করে দলে রেখে দেয়া হতো। এরপর তাদের শরীরে বিশেষ হরমন প্রবেশ করানো শুরু হতো। একপর্যায়ে পুরুষ থেকে নারীতে রূপান্তরের প্রলোভন দেখানো হতো।

বিভিন্ন কৌশলে এই রূপান্তরকামী পুরুষদের হাদিউজ্জামানের পার্লারে এনে অপারেশন করে কেটে ফেলা হতো পুরুষাঙ্গ। স্তন বৃদ্ধির জন্য শরীরে স্ত্রী হরমোন ইনজেকশন দেয়া হতো। রূপান্তরের কাজে ব্যবহূত সব ধরনের ওষুধ বিদেশ থেকে আনা হতো। হাদিউজ্জামান তার পার্লারে রূপান্তরকামী পুরুষদের অস্ত্রোপচারের পর কৃত্রিম স্তন প্রতিস্থাপনের কাজও করতেন। এ ছাড়া গায়ের রং ফর্সা করা ও ঠোঁটের সৌন্দর্য বর্ধনের জন্য সার্জারি করতেন তিনি।

হাদিউজ্জামানের পরিচয় সম্পর্কে পুলিশ কর্মকর্তা আজিমুল হক বলেন, একসময় খুলনায় এক সার্জনের সহকারী হিসেবে কাজ করতে গিয়ে কৌশলে রপ্ত করে ফেলেন হাদিউজ্জামান। পরে ঢাকায় এসে নিজেই বনে যান সার্জন। খুলে বসেন লেজার বিউটি পার্লার।

সেখানে রূপান্তরকারী পুরুষদের অস্ত্রোপচার ও লিঙ্গ পরিবর্তনের কাজ করা হতো। প্রতিটি সার্জারির আগে হাদিউজ্জামান এক লাখ করে টাকা নিতেন। চিকিৎসক হিসেবে তার কোনো সনদ নেই। নিজেকে চিকিৎসক পরিচয় দিয়ে শতাধিক পুরুষের অস্ত্রোপচার ও হরমোন চিকিৎসা করেছেন।

হিজড়াদের গুরুমায়েরা এই চক্রের মাঠপর্যায়ে কাজ করেন উল্লেখ করে আজিমুল হক বলেন, ‘এই চক্রের সঙ্গে জড়িত তৃতীয় লিঙ্গের গুরুমায়েরা, তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়া হবে। তাদের বিষয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। বর্তমানে গ্রেপ্তার চার আসামিকে রমনা থানায় করা মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়েছে।

আদালত তাদের দুই দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন। রিমান্ডে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। এর সঙ্গে আর কারা জড়িত তাদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করার চেষ্টা চলছে। যারাই জড়িত থাকুক, তাদের আইনের আওতায় আনা হবে।

এদিকে রূপান্তরকামী পুরুষদের অবৈধভাবে অস্ত্রোপচার ও হরমোন চিকিৎসায় গুরুমাদের জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেছে হিজড়া কল্যাণ ফেডারেশন।

ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি আবিদা সুলতানা মিতু বলেন, ‘অনেক পুরুষ স্বেচ্ছায় তৃতীয় লিঙ্গে রূপান্তরিত হয়। এর কারণ তারা তখন বিভিন্ন ধরনের কাজ করতে পারে। পথেঘাটে চাঁদাবাজি ছাড়াও বিভিন্ন মাদক চক্র তাদের ব্যবহার করে।