অস্তিত্ব সংকটে দেশের চা শিল্প

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: জুলাই ২১, ২০২৬, ১২:৪১ এএম
অস্তিত্ব সংকটে দেশের চা শিল্প

প্রায় ১৭০ বছরের ঐতিহ্যবাহী বাংলাদেশের চা শিল্প বর্তমানে এক নজিরবিহীন বৈপরীত্য ও অভূতপূর্ব সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একদিকে সামপ্রতিক বছরগুলোতে অনুকূল আবহাওয়া, পরিমিত বৃষ্টিপাত এবং আধুনিক বাগান ব্যবস্থাপনা ও প্রযুক্তি প্রয়োগের কল্যাণে দেশে রেকর্ড পরিমাণ চা উৎপাদন হচ্ছে; অন্যদিকে নানামুখী আর্থিক, পরিবেশগত ও রাজস্ব-সংক্রান্ত সংকটের কারণে বাগান মালিক, ক্ষুদ্র চাষি এবং সাধারণ চা শ্রমিকদের জীবন ও জীবিকা আজ চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছে।

বাংলাদেশ চা বোর্ডের প্রদত্ত সাম্প্রতিকতম তথ্যাবলি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দেশের চা শিল্পের উৎপাদনে একটি ধারাবাহিক ঊর্ধ্বগতি ছিল। ২০২৩ সালে দেশে রেকর্ড পরিমাণ ১০ কোটি ২ লাখ কেজি (১০০.২ মিলিয়ন কেজি) চা উৎপাদিত হয়েছিল। এর পরবর্তী বছর ২০২৪ সালে আবহাওয়াগত প্রতিকূলতার কারণে উৎপাদন সামান্য হ্রাস পেয়ে ৯ কোটি ৩০ লাখ কেজিতে (৯৩ মিলিয়ন কেজি) নামলেও ২০২৫ সালে তা পুনরুজ্জীবিত হয়ে দাঁড়ায় ৯ কোটি ৪৯ লাখ কেজিতে (৯৪.৯ মিলিয়ন কেজি)। চলতি ২০২৬ সালে মৌসুমের শুরুতে আগাম বৃষ্টিপাত এবং অনুকূল আবহাওয়া থাকার কারণে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ১০ কোটি ৪০ লাখ কেজি (১০৪ মিলিয়ন কেজি) ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।

কেবল উৎপাদনই নয়, প্রথম দর্শনে চট্টগ্রাম ও শ্রীমঙ্গলের নিলাম বাজারের পরিসংখ্যানও বেশ ইতিবাচক চিত্র তুলে ধরে। বাংলাদেশ চা বোর্ড ও চা ব্যবসায়ীদের সংগঠন সূত্রে জানা গেছে, নিলাম বাজারে চায়ের গড় বিক্রয়মূল্য গত এক দশকের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। ২০২৩-২০২৪ অর্থবছরে যেখানে প্রতি কেজি চায়ের গড় বিক্রয়মূল্য ছিল ১৭১ টাকা ২৪ পয়সা, সেখানে ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পেয়ে ২০২৪-২০২৫ অর্থবছর অতিক্রম করে ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে প্রতি কেজি চায়ের গড় দাম দাঁড়িয়েছে ২৪৫ টাকা ৫০ পয়সায়।

তবে অর্থনীতিবিদ ও শিল্প বিশেষজ্ঞদের মতে, এই আপাত চমকপ্রদ ও ইতিবাচক পরিসংখ্যানের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক চরম ব্যবসায়িক মন্দা ও গভীর কাঠামোগত সংকট। কাগুজে দাম বৃদ্ধি পেলেও বাস্তবে ক্রমবর্ধমান উৎপাদন খরচের সাথে সামঞ্জস্য রেখে বাগানগুলো লাভজনক হতে পারছে না। চা শিল্পের বর্তমান সংকট সৃষ্টির পেছনে মূল অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে আকাশচুম্বী উৎপাদন খরচ। বিগত কয়েক বছরে আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের মূল্য বৃদ্ধি, দেশীয় মুদ্রার অবমূল্যায়ন এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে দফায় দফায় ভর্তুকি প্রত্যাহারের কারণে চা উৎপাদনের প্রতিটি ধাপে ব্যয় আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে।

সংশ্লিষ্ট চা বাগান মালিক এবং অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের হিসাব অনুযায়ী, চা উৎপাদনের মোট ব্যয়ের কাঠামো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়— শ্রমিক ব্যয় (৮০%): মোট উৎপাদন খরচের প্রায় ৮০ শতাংশই সরাসরি চা শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি, বোনাস, রেশন, চিকিৎসা, আবাসন ও অন্যান্য সামাজিক নিরাপত্তা সুবিধা প্রদানে ব্যয় হয়। চা শিল্প সম্পূর্ণ শ্রমঘন হওয়ায় এই খরচ কমানোর কোনো সুযোগ নেই। আনুষঙ্গিক উপকরণের ব্যয় (২০%): অবশিষ্ট ২০ শতাংশ ব্যয় হয় জ্বালানি তেল (ডিজেল), বিদ্যুৎ, প্রাকৃতিক গ্যাস, রাসায়নিক সার (ইউরিয়া, টিএসপি, এমপি), কীটনাশক, সেচ ব্যবস্থা এবং প্রক্রিয়াকরণ যন্ত্রপাতির রক্ষণাবেক্ষণ খাতে।

জ্বালানি তেল, বিদ্যুৎ এবং গ্যাসের দাম অস্বাভাবিক বৃদ্ধির ফলে কারখানা পরিচালনা ও প্রক্রিয়াকরণ খরচ বহুলাংশে বেড়ে গেছে। অন্যদিকে, চায়ের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় এবং মান ধরে রাখতে ব্যবহূত আমদানিকৃত সার ও বিশেষায়িত কীটনাশকের দাম বাড়ায় বাগানের উৎপাদন খরচ প্রতি কেজিতে গড়ে ২৭০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত ঠেকেছে। অথচ নিলামে অনেক সাধারণ বা মাঝারি মানের চা প্রতি কেজি ২০০ থেকে ২২০ টাকার বেশি দামে বিক্রি করা যাচ্ছে না। ফলে প্রতি কেজি চা উৎপাদনে বাগান মালিকদের ঘাটতি বা লোকসান হচ্ছে ৫০ থেকে ৮০ টাকা পর্যন্ত।

চা শিল্পের আর্থিক সংকটের সবচেয়ে প্রত্যক্ষ ও ভয়াবহ মাশুল গুনতে হচ্ছে এই শিল্পের মূল চালিকাশক্তি চা শ্রমিকদের। দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের শ্রীমঙ্গল, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, সিলেট, চট্টগ্রাম ও পঞ্চগড় এলাকার ১৬৭টি নিবন্ধিত চা বাগান এবং শত শত ক্ষুদ্র চাবাগানে প্রায় দেড় লাখেরও বেশি নিয়মিত ও অনিয়মিত শ্রমিক কর্মরত আছেন। দেশের আকাশচুম্বী মূল্যস্ফীতি এবং জীবনযাত্রার ব্যয় অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পেলেও বর্তমানে চায়ের শ্রমিকরা দৈনিক মাত্র ১৭৮ টাকার কিছু ওপর (ক্যালেন্ডার ও এলাউন্স মিলিয়ে ১৭৮-১৮০ টাকা) মজুরি পাচ্ছেন। বর্তমান বাজারের ভোগ্যপণ্যের দামের তুলনায় এই মজুরি দিয়ে ৪-৫ সদস্যের একটি পরিবারের দৈনন্দিন চাল, ডাল, তেল ও ওষুধপত্রের সংস্থান করা একেবারেই অসম্ভব।

আর্থিক ও মানবিক এই দ্বিমুখী সংকটের সাথে যুক্ত হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রত্যক্ষ ও মারাত্মক বাস্তবপ্রমাণ। চা একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ফসল, যার জন্য সুনির্দিষ্ট বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার প্রয়োজন হয়। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে চা অঞ্চলগুলোতে আবহাওয়ার চরমভাবাপন্নতা দেখা যাচ্ছে। অনিয়মিত বৃষ্টিপাত ও তীব্র খরা: বর্ষা মৌসুমে অতিবৃষ্টি এবং চয়ন মৌসুমে দীর্ঘ অনাবৃষ্টির কারণে চা গাছের কচি কুঁড়ি গজানো ব্যাহত হচ্ছে। অতিরিক্ত উত্তাপের ফলে চা পাতা ‘বার্ন’ বা পুড়ে যাচ্ছে।

লাল মাকড় ও পোকার আক্রমণ: ক্রমাগত তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে চা বাগানে লাল মাকড়, থ্রিপস এবং হেলোপেল্টিস বা মশা পোকার আক্রমণ আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এসব পোকা কচি পাতার রস চুষে খেয়ে পাতা শুষ্ক করে ফেলে, যার ফলে চায়ের ফলন ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পায়। কীটনাশক প্রয়োগে বাধ্যবাধকতা: পোকা দমনে অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহার করতে গিয়ে বাগানগুলোর উৎপাদন ব্যয় যেমন বাড়ছে, তেমনি আন্তর্জাতিক মানের জৈব চা তৈরির নিয়ম লঙ্ঘন হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।

দেশীয় চায়ের সঠিক মূল্য না পাওয়ার পেছনে একটি অন্যতম প্রধান কারণ হচ্ছে সীমান্ত সংলগ্ন এলাকাগুলো থেকে বেআইনিভাবে নিম্নমানের চা প্রবেশ করা। বিশেষ করে ভারতের আসাম, ত্রিপুরা ও পশ্চিমবঙ্গ সীমান্ত দিয়ে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ চোরাই চা অসাধু সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বাংলাদেশে ঢোকানো হচ্ছে। সীমান্তবর্তী এলাকা যেমন পঞ্চগড়, সিলেট, শ্রীমঙ্গল ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিভিন্ন চোরাই রুট দিয়ে শুল্ক ফাঁকি দিয়ে আনা এই অতি নিম্নমানের চা বাজারজাত করা হচ্ছে।

চোরাই পথে আসা চায়ের আমদানি মূল্য বা ট্যাক্স না থাকায় তারা অত্যন্ত কম দামে দেশের সাধারণ চা প্যাকেটজাতকারী ও খোলা বাজার ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করে দেয়। এর ফলে দেশের সাধারণ ও মাঝারি মানের চা উৎপাদনকারীরা চরম বিপাকে পড়ছেন। ব্লেন্ডিং কোম্পানিগুলো কম দাম পেয়ে নিম্নমানের চোরাই চা কিনে দেশীয় উন্নত চায়ের সাথে মিশিয়ে বাজারে ছাড়ছে, যার ফলে দেশীয় ভালো মানের চায়ের চাহিদা নিলাম বাজারে কমে যাচ্ছে এবং চা বাগানের মালিকরা তাদের ন্যায্য মূল্য প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

বর্তমানে চা বাগান পরিচালনার জন্য বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে নেয়া ঋণের সুদের হার প্রায় ১৩ শতাংশ বা তারও বেশি। উচ্চ সুদের হারের কারণে চা বাগানের মালিকদের পক্ষে নতুন করে মূলধনি বিনিয়োগ করা বা বাগান সংস্কার করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। বাগান মালিক ও চা বোর্ডের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল- চা শিল্প যেহেতু সম্পূর্ণভাবে জমি ও আবহাওয়ানির্ভর একটি ফসল, তাই এটাকে শিল্প ঋণের আওতায় না রেখে পূর্ণাঙ্গভাবে ‘কৃষি খাত’-এর অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। কৃষি খাতের মতো চা বাগানগুলোকেও ৪ থেকে ৫ শতাংশ সুদে দীর্ঘমেয়াদি বিশেষ ঋণ, সারে সরকারি ভর্তুকি এবং সেচ ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ বিলে বিশেষ ছাড় দেয়া প্রয়োজন। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে নীতিগত এই দাবি ঝুলে থাকায় বিনিয়োগ সংকট দিন দিন ঘনীভূত হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞ, বাংলাদেশ চা বোর্ড, বাংলাদেশ চা সংসদ এবং অর্থনীতিবিদদের মতে, এই পৌনে দুইশো বছরের প্রাচীন শিল্পকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে হলে অবিলম্বে সমন্বিত ও কঠোর রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

১. সীমান্ত পাহারা ও চোরাচালান বন্ধ: বিজিবি, কাস্টমস ও স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বয়ে সীমান্ত এলাকাগুলোতে নজরদারি কঠোর করতে হবে। অবৈধ চোরাই চা বাজারে প্রবেশ বন্ধে কঠোর অভিযান পরিচালনা করা আবশ্যক।

২. চা শিল্পকে পূর্ণাঙ্গ ‘কৃষি মর্যাদা’ দান: চা শিল্পকে শিল্প ঋণের পরিবর্তে কৃষি ঋণের আওতায় এনে সর্বোচ্চ ৪-৫% সুদে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি ঋণ সুবিধার বন্দোবস্ত করতে হবে। সেচ কাজের জন্য বিদ্যুতে কৃষি ভতুর্কি প্রদান করা জরুরি।

৩. শ্রমিক কল্যাণে বিশেষ তহবিল: শ্রমিকদের ন্যূনতম জীবনমান নিশ্চিত করতে মালিক ও সরকারের যৌথ অর্থায়নে ‘চা শ্রমিক সামাজিক সুরক্ষা তহবিল’ গঠন করতে হবে, যাতে ৫% বার্ষিক মজুরি বৃদ্ধি নিশ্চিত হয় এবং রেশন ও চিকিৎসা সংকট দূর হয়।

৪. জলবায়ু সহনশীল জাত উদ্ভাবন ও সেচ সহায়তা: বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউটের মাধ্যমে উচ্চ ফলনশীল ও খরা/কীটপতঙ্গ সহনশীল চায়ের নতুন জাত উদ্ভাবন করতে হবে এবং আধুনিক ড্রিপ সেচ ব্যবস্থার জন্য প্রণোদনা দিতে হবে।

৫. গুণগত মান উন্নয়ন ও প্রিমিয়াম টি তৈরি: উচ্চমানের অর্গানিক ও অর্থোডক্স চা উৎপাদনের জন্য বাগানগুলোকে বিশেষ প্রক্রিয়াজাতকরণ যন্ত্রপাতি আমদানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা প্রদান করা উচিত, যাতে আন্তর্জাতিক রপ্তানি বাজার পুনরুদ্ধার করা যায়।

বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও উত্তরাঞ্চলের অর্থনীতির মূল ভিত্তি এবং প্রায় দেড় লাখ শ্রমিকের রুটি-রুজির একমাত্র অবলম্বন এই চা শিল্প আজ এক চরম সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়েছে। রেকর্ড উৎপাদনের আত্মতুষ্টিতে ভোগার কোনো সুযোগ নেই; কারণ অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ব্যয়ের ত্বরান্বিত বৃদ্ধি, চোরাচালানের ধাক্কা, জলবায়ুর বিরূপ প্রতিক্রিয়া এবং উচ্চ ব্যাংক সুদের চক্রে পড়ে ঐতিহ্যবাহী এই শিল্পটি নিঃশব্দে দেউলিয়া হওয়ার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। সরকারি নীতিতে দ্রুত পরিবর্তন, চা শিল্পকে কৃষির পূর্ণাঙ্গ মর্যাদা দান, সীমান্ত চোরাচালান বন্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ এবং মালিক-শ্রমিক সুসম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠাই কেবল পারে প্রায় ১৭০ বছরের এই গৌরবান্বিত শিল্পকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করতে।