‘নায়ক’। এই শব্দ বা বিশেষণটির সাথে বাংলাদেশের যে নায়কের সাথে সবচেয়ে বেশি মানানসই— তিনি নায়করাজ রাজ্জাক। নায়কদের মধ্যে তিনিই বাংলাদেশের সিনেমায় রাজত্ব করেছিলেন বিধায় কাহিনিকার, গীতিকার, সাংবাদিক আহমদ জামান চৌধুরী খোকা তারই বন্ধু নায়ক রাজ্জাকের নামের আগে বিশেষণ ‘নায়করাজ’ যুক্ত করেছিলেন। আর তখন থেকেই বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ নায়ক রাজ্জাককে ‘নায়করাজ রাজ্জাক’ বলেই অভিহিত করা হয়ে থাকে। ২০১৭ সালের ২১ আগস্ট নায়করাজের প্রয়াণ হয়।
চলচ্চিত্রবাসী তথা বাংলাদেশের সিনেমাপ্রেমী দর্শককে কাঁদিয়ে তিনি চিরদিনের জন্য পরপারে চলে যান। নায়করাজের মৃত্যুবার্ষিকীতে তার পরিবারের পক্ষ থেকে বিশেষ আয়োজন রাখা হয়েছে প্রতিবারের মতোই।
নায়করাজের সবচেয়ে আদরের ছেলে খালিদ হোসেন সম্রাট বলেন, ‘আব্বার মৃত্যুবার্ষিকীতে যথারীতি ফজরের নামাজ পড়ে আমি কবরের কাছে যাই, দোয়া-দুরুদ পড়ি। গুলশান আজাদ মসজিদ ও এতিমখানার বাচ্চাদের খাওয়া-দাওয়া করানো হয়ে থাকে।
আবার নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে আব্বার নামে একটি মাদ্রাসা পরিচালিত হয়। সেখানেও মিলাদ মাহফিল ও খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়ে থাকে।’ শিল্পী সমিতির সভাপতি চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন জানান, আজ বাদ আসর মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে।
এদিকে চ্যানেল আইয়ের নিয়মিত অনুষ্ঠান তারকা কথন’র প্রযোজক অনন্যা রুমা জানান আজ তারকা কথন অনুষ্ঠানে নায়ক রাজ রাজ্জাক’কে নিয়ে স্মৃতিচারণ করবেন চিত্রনায়িকা সুজাতা, সুরকার-সঙ্গীত পরিচালক ইমন সাহা, সঙ্গে থাকবেন নায়ক রাজের ছেলে সম্রাট।
নায়ক নায়ক রাজ রাজ্জাকের সঙ্গে এই প্রজন্মের অনেকেই সিনেমাতে অভিনয় করেছেন। আবার কেউ কেউ সিনেমাতে অভিনয় না করলেও নাটকে অভিনয় করেছেন। আবার কেউ কেউ নিজেদের সিনেমার অভিষেকের পূর্বে দোয়া নিতে গিয়েছেন। এমন ক’জনের স্মৃতিচারণই উঠে এসেছে আজকের বিশেষ এই আয়োজনে।
অপু বিশ্বাস : আমার সৌভাগ্য যে শ্রদ্ধেয় এফআই মানিক পরিচালিত নায়িকা হিসেবে আমার প্রথম সিনেমা ‘কোটি টাকার কাবিন’ সিনেমায় আমি রাজ্জাক আঙ্কেলকে পেয়েছিলাম। তিনি আমাকে খুব স্নেহ করতেন। পরবর্তীতে সম্রাটকে নিয়ে যখন তিনি ‘আমি বাঁচতে চাই’ সিনেমাটি নির্মাণ করলেন, আমি নায়িকা হলাম; তখনই আসলে তাকে খুব কাছে থেকে দেখা-অনুভব করা। আমার একটি নাম আছে ‘লক্ষ্মী’, এটা অনেকেই জানেন না। রাজ্জাক আঙ্কেল জানতেন। এ কারণেও তিনি আমাকে ভীষণ আদর করতেন। কারণ, তার স্ত্রীর নামও লক্ষ্মী। আমার বিশ্বাস, তিনি বেঁচে থাকলে আমার একমাত্র সন্তান জয়কেও তিনি ভীষণ আদর করতেন। তার প্রয়াণ দিবসে তার বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি।
সাবরিনা সুলতানা চৌধুরী কেয়া : আমার প্রথম সিনেমা মনতাজুর রহমান আকবর স্যার পরিচালিত ‘কঠিন বাস্তব’-এ আমি তার মেয়ের চরিত্রে অভিনয় করার সুযোগ পেয়েছিলাম। পরবর্তীতে আরও বেশ কয়েকটি সিনেমায় অভিনয়ের সুযোগ পাই। রাজ্জাক আঙ্কেল তার নির্মিত শেষ সিনেমা ‘আয়না কাহিনী’তেও আমাকে নায়িকা হিসেবে নিয়েছিলেন। এটাও আমার পরম সৌভাগ্য। আমাকে তিনি এবং লক্ষ্মী আন্টি নিজের মেয়ের মতোই আদর করতেন। বাবা বলে ডাকতাম বিধায় তার চলে যাওয়ায় আমার নিজের ভেতর এখনো যে কষ্ট, হাহাকার— তা বলে বোঝানোর মতো নয়। প্রতি মুহূর্তে তার শূন্যতা, তার আদর-স্নেহ ভীষণ মিস করি। বাবাকে আল্লাহ বেহেশত নসিব করুন— এ দোয়াই করি।
আজমেরী হক বাঁধন : পরম শ্রদ্ধা জানাই নায়করাজ রাজ্জাক আঙ্কেলের মৃত্যুবার্ষিকীতে। যে বিষয়টি আমি বিশেষত বলতে চাই, তা হলো— রাজ্জাক আঙ্কেলের দুই সন্তান বাপ্পা ভাই এবং সম্রাট দুজনের সঙ্গেই আমার কাজ করা হয়েছে। রাজ্জাক আঙ্কেল এবং অবশ্যই লক্ষ্মী আন্টি তাদের ছেলেদের মানুষের মতো মানুষ করেছেন, এখানেই বাবা-মা হিসেবে তারা স্বার্থক। বাপ্পা ভাই, সম্রাট দুজনই এত ভদ্র যে, তাদের কথা বিশেষভাবে বলতেই হয়। আর রাজ্জাক আঙ্কেলের নির্দেশনায় আমার সিনেমা করার কথা ছিল। কিন্তু হয়নি। তবে ‘দায়ভার’ নাটকে তার নির্দেশনায় অভিনয় করতে পেরেছি, এটাও অনেক বড় প্রাপ্তি। একজন এত বড় নায়ক হয়েও এত ডাউন টু আর্থ ছিলেন তিনি ভাবাই যায় না। দোয়া করি আল্লাহ তাকে বেহেশত নসিব করুন।
মেহজাবীন চৌধুরী : খুব সম্ভবত ২০১২ সালের কথা। সেই সময়টাতেই আমি নায়করাজ রাজ্জাক আঙ্কেলের পরিচালনায় ‘চেনা হয়ে যায় অচেনা’ নাটকে অভিনয় করার সুযোগ পেয়েছিলাম। আমার বিপরীতে ছিলেন সম্রাট ভাই। যতদূর মনে পড়ে উত্তরা, দিয়াবাড়ি এবং রাজ্জাক আঙ্কেলের বাসাতেও শুটিং হয়েছিল। এত বড় মাপের একজন নায়ক-পরিচালকের নির্দেশনা খুব কাছে থেকে দেখা বলতে হয়, ভীষণ আন্তরিকতা নিয়ে তিনি কাজ করতেন। প্রত্যেকটি দৃশ্য সমান যত্ন নিয়ে নির্মাণ করতেন। তার মতো এমন ব্যক্তিত্বের সঙ্গে কাজ করতে পারাটা ছিল আমার জন্য ভীষণ ভালো লাগার। তিনি আমাদের মাঝে নেই, তবুও তিনি আছেন তার কর্মে। তার বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করি।
বিদ্যা সিনহা মিম : আমার সৌভাগ্য হয়েছিল যে, আমি নায়করাজ রাজ্জাক আঙ্কেলের নির্দেশনায় একটি মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক গল্পের নাটক ‘আমি যুদ্ধে যাবো’তে অভিনয় করার সুযোগ পেয়েছিলাম। আঙ্কেলকে সহশিল্পী হিসেবে হয়তো অনেকেই পেয়েছেন। কিন্তু তার নির্দেশনায় কাজ করতে পারাটা আমার কাছে একটু বেশি রোমাঞ্চকর মনে হয়েছিল। মনে আছে, এটি রচনা করেছিলেন মান্নান হীরা। এতে সহশিল্পী হিসেবে ছিলেন মামুনুর রশীদ স্যারসহ আরও বেশ কজন। আঙ্কেল আমাকে খুব স্নেহ করতেন। সবচেয়ে বড় কথা, তিনি যখন পাশে এসে দাঁড়াতেন, কথা বলতেন, মনেই হতো না তিনি নায়করাজ। কারণ, তিনি তার নিজের মেয়ের মতো আদর-ভালোবাসা দিয়ে কাজটা বুঝিয়ে দিতেন। আমার অভিনয় জীবনের বড় প্রাপ্তি তার নির্দেশনায় কাজ করতে পারা। প্রার্থনা করি আল্লাহ তাকে পরপারে ভালো রাখুন।
অপূর্ব : আমি সেভাবে আসলে সিনেমার শিল্পী নই। নাটকেই আমাকে সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। তবে সিনেমাতে অভিনয় করেছি। আমার প্রথম সিনেমা ছিল ‘গ্যাংস্টার রিটার্নস’। সিনেমাটি মুক্তির আগে আমি তার আশীর্বাদ নিতে তারই বাসা ‘লক্ষ্মী কুঞ্জ’তে গিয়েছিলাম। মনে আছে, সেদিন তিনি সকাল ১০টায় তার সঙ্গে নাস্তা করতে বলেছিলেন। আমি এবং জান্নাতুল ফেরদৌস পিয়া তার দেয়া সময়েই তার বাসায় উপস্থিত হয়েছিলাম। তিনি আমাদের সঙ্গে অনেকক্ষণ কথা বললেন, আমাদের দুজনকে দোয়া করে দিয়েছিলেন। তার সঙ্গে কাটানো সেই সময়টা এখনো স্মৃতিতে উজ্জ্বল। দোয়া করি আল্লাহ যেন রাজ্জাক আঙ্কেলকে বেহেশত নসিব করেন।
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন