ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের আশঙ্কা

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: জুলাই ১৫, ২০২৬, ০১:০৮ এএম
ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের আশঙ্কা
  • এল নিনো ও দেশের বর্তমান বন্যা পরিস্থিতি
  • বাংলাদেশ, আফগানিস্তান পাকিস্তান, কেনিয়া, উগান্ডা ও সোমালিয়াসহ বেশ কিছু দেশের লাখো মানুষ চরম ঝুঁকিতে রয়েছে

আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল রেসকিউ কমিটি (আইআরসি) এল নিনোর তীব্র প্রভাবে এশিয়া ও পূর্ব আফ্রিকার দেশগুলোতে বন্যা, ভূমিধস, তাপপ্রবাহ এবং বিভিন্ন সংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাবের বিষয়ে কঠোর সতর্কতা জারি করেছে। ২০২৬ সালের জুলাই মাসে প্রকাশিত এই প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, আফগানিস্তান, কেনিয়া, উগান্ডা ও সোমালিয়াসহ বেশ কিছু দেশের লাখো মানুষ এখন চরম ঝুঁকিতে রয়েছে। এল নিনোর বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক বিরূপ প্রভাবে আবহাওয়া পরিস্থিতি এতটাই চরম আকার ধারণ করেছে যে, এটি মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ও খাদ্য নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বাংলাদেশে গত ৫ জুলাই থেকে শুরু হওয়া ভারী বর্ষণ ও মৌসুমি বায়ুর সক্রিয় অবস্থানের ফলে চট্টগ্রাম ও সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল মারাত্মকভাবে প্লাবিত হয়েছে। আইআরসির তথ্যমতে, কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরে ভূমিধস ও বন্যায় ইতোমধ্যে অন্তত ১৫ জনের প্রাণহানি ঘটেছে এবং জুলাইয়ের শুরু থেকে ১০ হাজারের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের মতে, এ বছর জুলাই মাসের মাত্র ১১ দিনেই মাসের মোট বৃষ্টির ৭৫ শতাংশ ঝরেছে। নিম্নচাপের অস্বাভাবিক গতিপথ ও জলীয় বাষ্পপূর্ণ বাতাসের দিক পরিবর্তনের ফলে চট্টগ্রাম ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে এই বৃষ্টির মাত্রা অতীতের রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, ইতোমধ্যে দেশে এক লাখ হেক্টরের বেশি আবাদি জমি বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে।

পূর্ব আফ্রিকা (সোমালিয়া, কেনিয়া, উগান্ডা, ইথিওপিয়া): এই অঞ্চলের পরিস্থিতি সবচেয়ে উদ্বেগজনক। সোমালিয়ায় দীর্ঘদিনের খরা ও দুর্ভিক্ষের পর এখন এল নিনোজনিত বন্যার নতুন সংকট দেখা দিয়েছে, যা ৪৮ লাখ মানুষের জীবনকে বিপন্ন করে তুলেছে। কেনিয়ায় বছরের শেষ পর্যন্ত বন্যার ৮০-৮২ শতাংশ সম্ভাবনা রয়েছে। পাকিস্তান ও আফগানিস্তান: পাকিস্তানে তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও আকস্মিক বন্যার আশঙ্কা রয়েছে, বিশেষ করে উত্তরের পার্বত্য অঞ্চলে হিমবাহ গলনের কারণে বিপত্তি বাড়তে পারে। আফগানিস্তানে অস্বাভাবিক বৃষ্টির ফলে বিস্তৃত এলাকা বন্যার কবলে পড়ার পূর্বাভাস রয়েছে।

দুর্যোগের পাশাপাশি পানিদূষণ ও স্বাস্থ্য সংকটের আশঙ্কাও প্রবল। আইআরসির মতে, ইথিওপিয়া ও সোমালিয়ার প্রধান নদীগুলোর পানি দূষিত হওয়ায় কলেরা ও তীব্র পানিজনিত ডায়রিয়া ছড়িয়ে পড়ার উচ্চঝুঁকি তৈরি হয়েছে। দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠী, যাদের নতুন কোনো ধাক্কা সামাল দেয়ার সক্ষমতা নেই, তারাই সবচেয়ে বেশি বিপদের মুখে। আইআরসির জরুরি কার্যক্রমবিষয়ক ভাইস প্রেসিডেন্ট বব কিচেন জোর দিয়ে বলেন, ‘দুর্যোগ আঘাত হানার পর সহায়তা দেয়ার চেয়ে আগে ব্যবস্থা নেয়া অনেক বেশি মানবিক এবং ব্যয়সাশ্রয়ী।’

সংস্থাটি দাতা সংস্থা ও সরকারগুলোর প্রতি আহাম জানিয়েছে যেন অবিলম্বে এশিয়া ও পূর্ব আফ্রিকায় আগাম দুর্যোগ প্রস্তুতি কার্যক্রমে অর্থায়ন বাড়ানো হয়। নগদ সহায়তা, বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ এবং আগাম সতর্কবার্তা পৌঁছে দেয়ার মাধ্যমে প্রাণহানি ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ অনেক কমিয়ে আনা সম্ভব। এল নিনোর প্রভাবে সৃষ্ট এই বৈশ্বিক দুর্যোগ পরিস্থিতি আমাদের স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে যে, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি এখন আর কোনো তাত্ত্বিক আলোচনার বিষয় নয়, বরং এটি একটি জ্বলন্ত বাস্তব।

বাংলাদেশসহ সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর জন্য এই মুহূর্তের প্রধান দায়িত্ব হলো ত্রাণ তৎপরতার পাশাপাশি দুর্যোগকালীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন পরিকল্পনা নিশ্চিত করা। সরকার, আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং স্থানীয় সচেতন জনগোষ্ঠীর সমন্বিত উদ্যোগ ও আগাম প্রস্তুতিই পারে এই ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় থেকে লাখো মানুষকে রক্ষা করতে। প্রকৃতির এই চরম বৈরিতা মোকাবিলায় প্রযুক্তি ও মানবিক সংহতি উভয়ই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।