আইনের মারপ্যাঁচে কমছে না অবৈধ ক্লিনিকের দৌরাত্ম্য

মাহমুদুল হাসান প্রকাশিত: আগস্ট ৩০, ২০২২, ০২:৪৮ এএম
আইনের মারপ্যাঁচে কমছে না অবৈধ ক্লিনিকের দৌরাত্ম্য

সিলেটের চল্লিশোর্ধ্ব দিনমজুর ইলিয়াস মিয়া পায়ের ইনফেকশন নিয়ে এসেছিলেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। ঢামেক হাসপাতালে চিকিৎসা না মিললেও পড়েছিলেন দালালের খপ্পরে। উন্নত চিকিৎসার কথা বলে তারা ইলিয়াসকে নিয়ে আসেন চানখারপুলের ঢাকা জেনারেল হাসপাতালে। চানখারপুল মোড় থেকে নাজিমুদ্দিন রোড ধরে কয়েক মিনিট হাঁটলেই চোখ পড়বে হাসপাতালটি। সেখানেই তার পা কেটে ফেলা হয়।

এখনো ভর্তি তিনি হাসপাতালটিতে। তার মতো আরও চারজন রোগী হাসপাতালটিতে ভর্তি আছেন। তাদের সবাইকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে দালালরা নিয়ে এসেছেন। ৫১ নাজিমুদ্দিন রোডের পাঁচ তলা ভবনের দ্বিতীয় তলায় পরিচালিত হাসপাতালটির নেই কোনো অনুমোদন। অথচ বাইরের সাইনবোর্ডে লেখা সব ধরনের অপারেশনসহ পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল।

গত জুনে অবৈধ হাসপাতাল ও ক্লিনিকের বিরুদ্ধে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাঁড়াশি অভিযানে হাসপাতালটি বন্ধ করা হয়েছিল। কিন্তু দালাল চক্রটি দমে যায়নি। ফের চালু করেছে। অপারেশন, প্যাথলজিক্যাল টেস্টসহ সব ধরনের ব্যবসা অব্যাহত রেখেছে।

গতকাল সোমবার দুপুরে অভিযান চলাকালে হাসপাতালের আশপাশের ব্যবসায়ীরা আমার সংবাদকে জানান, ঢাকা জেনারেল হাসপাতালকে তারা দালালদের হাসপাতাল নামেই চেনেন। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের একটি দালাল চক্র হাসপাতাল গড়ে তোলে। তারা ঢামেক হাসপাতাল থেকে রোগী বাগিয়ে আনেন।

অভিযানকালে হাসপাতালটির কোনো লাইসেন্স দেখাতে পারেনি। অপারেশন থিয়েটারসহ সর্বত্র অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, মেয়াদোত্তীর্ণ ম্যাটেরিয়ালসের ব্যবহার দেখে অভিযানকারী দল বিস্ময় প্রকাশ করেন।

হাসপাতালে ডা. মো. জাফর মিয়া, ডা. মো. জয়নাল হোসেন এবং ডা. তানভীর হাসান নামে তিনজন সার্বক্ষণিক চিকিৎসক রয়েছে বলা হলেও অভিযানকালে ডা. তানভির হাসান নামে এক চিকিৎসককে পাওয়া যায়। তবে তিনি অনিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানে কাজ করার বিষয়ে কোনো কথা বলতে রাজি হননি।

হাসপাতালের একজন পরিচালক মো. শামসুদ্দিন আমার সংবাদকে বলেন, গত জুনে অভিযানের পর আমরা অনুমোদনের জন্য ব্যাংকে টাকা জমা দিয়েছি। আমাদের লাইসেন্সের কাজগুলো প্রসেসিংয়ে আছে।

গত জুনে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বন্ধ করে দেয়ার পর কিভাবে চালু করা হলো এবং অপারেশন করা হচ্ছে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, অপারেশন বন্ধের পূর্বে করা হয়েছিল। কিন্তু ডেট একটু ভুল হয়েছে! এখানে আরেকটা রোগী আছে লং লাইফ হাসপাতালে অপারেশন হয়েছে। জাফর স্যার ড্রেসিংয়ের জন্য এখানে ভর্তি রেখেছেন।

নারায়ণগঞ্জের এক রোগীকে সম্প্রতি এখানে অপারেশন করা হয়েছে কিনা— জানতে চাইলে তিনি বলেন, গত ১৫ দিন তিনি এখানে আসেননি। হয়ত এই সময়ে ভুলে ম্যানেজার করে ফেলেছেন। তবে এখানে কোনো ওটি বেজ কাজ হয় না বলেও তিনি জানান।

হাসপাতালটিতে অভিযান পরিচালনা করেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতাল ও ক্লিনিক শাখার সহকারী পরিচালক ও ডা. মো. বিল্লাল হোসেন।

তিনি আমার সংবাদকে বলেন, গত জুন মাসে এই হাসপাতালটিতে এসেছিলাম, তখনোই হাসপাতালটিকে বন্ধের নির্দেশনা দিয়েছিলাম, কিন্তু আাামাদের প্রচলিত আইনকে উপেক্ষা করে তারা কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এখানে তারা নিয়মিত রোগী ভর্তি করছে, অপারেশনসহ নিয়মিত পরীক্ষা-নিরীক্ষাও করছে। অপারেশন থিয়েটার থেকে শুরু করে কোনোটাই আসলে মান সম্মত না।

এই অবৈধ অনিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান এভাবে চলতে পারে না। এই প্রতিষ্ঠান আমরা আজকেই বন্ধের নির্দেশনা দিচ্ছি। তারা বলেছে লাইসেন্সের জন্য আবেদন করেছে, কিন্তু এখনো লাইসেন্স পায়নি। কিন্তু আমরা এখানে দেখতে পাচ্ছি যে, অপারেশন থিয়েটার থেকে শুরু করে অন্যান্য যেসব কার্যক্রম চলছে, সব জায়গাতেই অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ বিরাজ করছে। এখানে মেয়াদ উত্তীর্ণ মেটারিয়ালস ব্যবহার করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, ঢাকা জেনারেল হাসপাতালে আসার আগে খিদমাহ লাইফ কেয়ার ডায়াগনস্টিক সেন্টারে গিয়েছিলাম। সেই প্রতিষ্ঠানটিও অনুমোদনহীন হওয়ায় বন্ধ করা হয়েছে।

এসময় তিনি আরও জানান, অবৈধ হাসপাতালে বিএমডিসির রেজিস্ট্রেশনভুক্ত কোনো চিকিৎসক প্রাইভেট প্র্যাকটিস করেন। তাহলে তাদের বিষয়ে বিএমডিসিতে লিখব যে অনিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানে নিবন্ধিত যেসব চিকিৎসক প্র্যাকটিস করছেন তাদের বিষয়ে যেন আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করেন।

মেডিকেল অফিসার দেওয়ান মো. মেহেদী হাসান বলেন, বেসরকারি হাসপাতাল ক্লিনিক পরিচালনার পুরোনো আইনের কারণে আমাদের হাতে ম্যাজিস্ট্রেসি পাওয়ার নেই। এজন্য আমরা বন্ধের নির্দেশ প্রদান করতে পারি। কিন্তু জরিমানা কিংবা সিলগালা করতে পারি না। আমরা আশা করছি অচিরেই এই আইনটি সংশোধন হবে। তখন হয়ত আমরা মেজিস্ট্রেসি পাওয়ার পেতে পারি। তার আগ পর্যন্ত চলমান আইনে আমরা যতটা পারি ব্যবস্থা নেয়ার চেষ্টা করব। আমরা যেসব প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দিচ্ছি তাদের একটি অনুলিপি স্থানীয় প্রশাসনের কাছে সরবরাহ করব। যাতে তারাও তদারকি করতে পারেন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতাল ও ক্লিনিক শাখা রাজধানীর খিলগাঁও, উত্তরা, যাত্রাবাড়ী, চকবাজার, লালবাগ, কচুক্ষেত ও বনানীতে অভিযান পরিচালনা করে ঢাকা জেনারেল হাসপাতাল ছাড়াও খিলগাঁও জেনারেল হাসপাতাল, সেন্ট্রাল বাসাবো জেনারেল হাসপাতাল, মাতুয়াইল কনক জেনারেল হাসপাতাল, শনিরআখড়া সালমান হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার, বকশিবাজার খিদমাহ লাইফ কেয়ার ডায়াগনস্টিক সেন্টার, বনানী হেয়ার ট্রান্সপ্লান্ট কসমেটিক সার্জারি কনসালটেন্সি অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার এবং ঢাকা পেইন স্পাইন সেন্টার বন্ধ করে।

গতকাল সোমবার দুপুরে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক ডা. মাহমুদুর রহমান অভিযান চালিয়ে নিবন্ধন না থাকায় খিলগাঁও রেলগেট এলাকায় খিলগাঁও জেনারেল হাসপাতাল বন্ধ করে দেন।

এর আগে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আহমেদুল কবিরের নেতৃত্বে আরেকটি টিম রাজধানীর বনানী এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে।

এসময় নিবন্ধন না থাকায় বনানীর হেয়ার ট্রান্সপ্লান্ট অ্যান্ড কসমেটিক্স সার্জারি সেন্টার নামে একটি প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেয়া হয়। অভিযান প্রসঙ্গে আহমেদুল কবীর বলেন, এখানে হেয়ার ট্রান্সপ্লান্ট, লেজার ট্রিটমেন্ট, ফিজিওথেরাপিসহ চুলের নানা চিকিৎসা করা হয়। ওরা বলছে, তারা নাকি জানত না যে, লেজার ট্রিটমেন্টের জন্য অধিদপ্তরের অনুমোদন দরকার। এজন্য আমরা এই প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ করে দিয়েছি।

এছাড়াও এখানে ভারতের যে চিকিৎসক ডা. মনোজ খান্না লেজার ট্রিটমেন্ট চিকিৎসা দিয়ে থাকেন বলে যে ছবি লাগানো হয়েছে, কিন্তু তিনি এখানে চিকিৎসা দিতে আসেন না। বৃহস্পতিবার পর্যন্ত এই অভিযান অব্যাহত থাকবে।

সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগনিয়ন্ত্রণ বিভাগের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. বেনজির আহমেদ আমার সংবাদকে বলেন, দেশের বেসরকারি হাসপাতাল, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ক্লিনিক, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতাল ও ক্লিনিক শাখার যে লোকবল আছে তা দিয়ে এত বড় সেক্টর সামলানো সম্ভব না। এক সময় তো দেশে মাত্র কয়েকশ বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ছিল। এখন তো ছোট বড় হিসাব করলে অর্ধ লক্ষ হবে। এজন্য আলাদা একটি অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

সারা দেশে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা ও তদারকির জন্য প্রচুর লোকবল দরকার। সেই সাথে যুযোপযোগী আইন লাগবে। আইনে সর্বোচ্চ ক্ষমতা অধিদপ্তরকে দিতে হবে। তারা যেন দ্রুত ব্যবস্থা নিতে পারেন। অনুমোদন ছাড়া বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক চালু করার শাস্তি দীর্ঘমেয়াদি কারাবরণ করতে হবে। দুই চার বছর জেল খেটে যেন বেরিয়ে আসতে না পারে। কারণ তারা মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে।

তিনি বলেন, আইন সংশোধন, সক্ষমতা বৃদ্ধি আর প্রচুর অর্থ বরাদ্দ দিতে হবে। কারণ শুধু ঢাকা নয়, সারা দেশে এই অধিদপ্তরকে চষে বেড়াতে হবে। ভালো গাইড লাইন তৈরি করতে হবে। পরিকল্পনা মাফিক কাজ করতে হবে। এর বাইরে আর কোনো সমাধান নেই।