আইনি জঠিলতা নিষ্পত্তির পরও প্রায় একযুগ ধরে রহস্যজনক কারণে নির্বাচন হচ্ছে না ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার ২ নং আছলামপুর ইউনিয়নে। যেখানে সর্বশেষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০১১ সালে। তৎকালীন নির্বাচনে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন ওই ইউনিয়নেরই ওমরপুরের বাসিন্দা কে এম সিরাজুল ইসলাম। যদিও ২০১৬ সালে তার মেয়াদও শেষ হওয়ার কথা। অথচ চলতি বছর ২০২২ শেষের সাথে সাথেই সিরাজুল ইসলামও চেয়ারম্যান হিসেবে পূর্ণ করতে যাচ্ছেন একযুগ। তবে এর জন্য নানা কলকাঠিও নাড়তে হয়েছে তাকে।
এরই মধ্যে ২০১৩ সালে আছলামপুর ইউনিয়ন ভেঙে নতুন করে ২ নং আছলামপুর ও ২০ নং ওমরপুর ইউনিয়ন গঠনের পর থেকেই একসাথে তিনি পালন করছেন দুটি ইউনিয়নেরই দায়িত্ব। বিভক্তের পর থেকেই ভবিষ্যৎ নির্বাচনি পরিকল্পনায় নিজ ইউনিয়ন ওমরপুর নিয়েই ব্যস্ত রয়েছেন সিরাজুল ইসলাম।
এদিকে সব ধরনের নাগরিক সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন আছলামপুরের জনসাধারণ। আছলামপুরে নতুন পরিষদ ভবন নির্মাণ হলেও সেখানে বসেন না চেয়ারম্যান সিরাজুল ইসলাম। আছলামপুরের লোকজনকেই পরিষদকেন্দ্রিক যেকোনো কাজের জন্য উল্টো দৌড়াতে হচ্ছে ওমরপুরে। সামাজিক সুরক্ষা ভাতাসহ সার্বিক বিষয়েই চরম বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন আছলামপুরের বাসিন্দারা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উপজেলার সব ইউনিয়নে উৎসবমুখর পরিবেশে নির্বাচন হলেও টানা দুই মেয়াদে ভোটের উৎসব নেই ২ নং আছলামপুর ও ২০ নং ওমরপুর ইউনিয়নে। পার্শ্ববর্তী লালমোহন উপজেলার সাথে আন্তঃউপজেলা সীমানা বিরোধের কারণেই নির্বাচন করা যাচ্ছে না বলে জানিয়েছে উপজেলা নির্বাচন কমিশন সূত্র।
অভিযোগ রয়েছে, বর্তমান চেয়ারম্যান নিজের লোক দিয়ে মামলা করিয়ে সীমানা বিরোধ সৃষ্টি করে দীর্ঘদিন চেয়ারম্যানের পদ আঁকড়ে ধরে রেখেছেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, লালমোহন উপজেলার কিছু অংশ নিয়ে বিরোধের জেরে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন সুফিয়া বেগম নামের এক ভোটার। এরপর থেকেই ওই ইউনিয়নে নির্বাচন থেকে বিরত রয়েছে নির্বাচন কমিশন। কিন্তু পার্শ্ববর্তী ইউনিয়নগুলোর নির্বাচনি আমেজ আন্দোলিত করছে আছলামপুর ও ওমরপুর ইউনিয়নের ভোটারদের।
তাদের জোর দাবি, অতিসত্বর বিরোধ নিষ্পত্তি করে নির্বাচন দেয়া হোক। কিন্তু দীর্ঘ সময়েও বিরোধ নিষ্পত্তি হয়নি। ফলে এই ইউনিয়নে ভোটও হচ্ছে না। উপজেলা নির্বাচন অফিস সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সীমানা বিরোধ থাকলেও নির্বাচন করতে বাধা নেই। যেহেতু আন্তঃউপজেলা বিরোধ তাই সমস্যা হলে সংসদ নির্বাচনও বন্ধ হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু সংসদ নির্বাচন হলেও ইউপি নির্বাচন বন্ধ থাকার আইনগত ভিত্তি নেই। তবে হাইকোর্টের স্থগিতাদেশের কারণে নির্বাচন আয়োজন করা সম্ভব হয়নি।
২০১৮ সালের সংসদ নির্বাচনের পর আইনগত বাধা না থাকা সত্ত্বেও কেন নির্বাচন হচ্ছে না— এ সংক্রান্ত একটি রিট আবেদন করেন মোহাম্মদ মহসিন হাওলাদার নামের এক ভোটার। তার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সংসদ নির্বাচন হলেও ইউপি নির্বাচন আয়োজনের বিপক্ষে রায় দেয় হাইকোর্ট।
পরবর্তিতে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বািভাগে আবেদন করেন বাদী মহসিন। তথ্য পর্যালোচনা করে আন্তঃউপজেলা বিরোধ সত্ত্বেও সংসদ নির্বাচন আয়োজন হওয়ায় ইউপি নির্বাচন আয়োজনে আইনগত বাধা নেই বলে রায় দেয় আপিল বিভাগ। একই সাথে নির্বাচন কমিশনকে চার মাসের মধ্যে ইউনিয়নটিতে নির্বাচন আয়োজনের নির্দেশ দেন বিচারপতি মো. নুরুজ্জামানের নেতৃত্বাধীন পাঁচ সদস্যের আপিল আদালত।
অন্য বিচারপতিরা হলেন— ওবায়দুল হাসান, বোরহান উদ্দিন, এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি কৃষ্ণ দেবনাথ। গত ১৮ মে এই আদেশ দেয়া হয়েছে। অথচ নির্ধারিত চার মাস পার হলেও এখনো তফসিলই ঘোষণা করেনি নির্বাচন কমিশন। স্থানীয় নির্বাচন অফিস থেকে নির্বাচন আয়োজন প্রস্তুতির কথা জানিয়ে ইসি সচিবালয়ে চিঠিও দেয়া হয়েছে। এরপরও অজানা কারণে তফসিল ঘোষণা করছে না নির্বাচন কমিশন।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে কমিশনের আদালত অবমাননার বিষয়টি নজরে এনে অবিলম্বে তফসিল ঘোষণার আবেদন জানিয়ে স্থানীয় সরকার বিভাগ, প্রধান নির্বাচন কমিশন, নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সচিব ও যুগ্ম সচিব বরাবর লিখিত আবেদন করেছেন আছলামপুর ইউনিয়নের ভোটার ও অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা আবুল কাশেম।
তিনি আমার সংবাদকে বলেন, যেহেতু আন্তঃউপজেলা বিরোধ তাই সমস্যা থাকলে সংসদ নির্বাচনই হতো না। যেহেতু সংসদ নির্বাচন হয়েছে তাই ইউপি নির্বাচনে বাধা নেই। বিষয়টি আমরা আগে থেকেই বলে আসছি। কিন্তু কেউ কর্ণপাত করেনি। উচ্চ আদালত রায় দেয়ার পরও অদৃশ্য কারণে তফসিল হচ্ছে না।
সাবেক এ সেনা কর্মকর্তা বলেন, ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই করতে গিয়ে নিঃস্ব হয়ে গেছি। এলাকার মানুষের আবদার রক্ষা করতে গিয়ে নিজের জমি বিক্রি করে মামলার খরচ যোগাড় করেছি। এখন আদালতের রায়ের পরও নির্বাচন হচ্ছে না। তাই আদালত অবমাননার বিষয়টি নজরে এনে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোতে আবেদন করেছি।
তিনি বলেন, সাধারণ জনগণের মধ্যে একটি আলোচনা আছে যে, অযৌক্তিক ঝামেলা পাকিয়ে দীর্ঘদিন চেয়ারম্যানের পদ্য আঁকড়ে রাখতে চাচ্ছেন বর্তমান চেয়ারম্যান। নির্বাচন আয়োজনে পদে পদে দাপ্তরিক বাধার পেছনেও তার টাকা ও ক্ষমতার জোর আছে বলে জনমনে সন্দেহ রয়েছে বলে মনে করেন তিনি।
এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে নির্বাচন পরিচালনা বিভাগের উপসচিব মো. আতিয়ার রহমান আমার সংবাদকে বলেন, আদালতের রায় থাকলেও নতুন করে ভোটার তালিকা হালনাগাদের বিষয় ছিল তাই দেরি হচ্ছে।
উপজেলা নির্বাচন অফিস প্রস্তুতির কথা জানালেও কেন তফসিল হচ্ছে না জানতে চাইলে তিনি বলেন, এখন আমরাও প্রস্তুত আছি। শিগগিরই নির্বাচন আয়োজনের পদক্ষেপ নেয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, ইতোমধ্যে নোট ইস্যু হয়েছে। নির্বাচন কমিশন পাস করলেই তফসিল ঘোষণা হবে। বিষয়টি নিয়ে আসলামপুর ইউনিয়নের ভোটারদের সাথে কথা হয় আমার সংবাদের।
তাদের মধ্যে স্থানীয় একটি মাদ্রাসার শিক্ষক মোসলেহ উদ্দিন সিরাজী বলেন, ২০১৩ সালে ইউনিয়নটি বিভক্ত হওয়ার পর থেকে এ এলাকার নাগরিকরা চরম বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। ইউপি ভবন ও চেয়ারম্যানের বাড়ি নতুন ইউনিয়নে হওয়াল পুরোনো ঐতিহ্যবাহী এই ইউনিয়নের জনগণ বিপাকে পড়ে। নিয়মানুযায়ী নতুন ইউপি ভবন হয়েছে কিন্তু নির্বাচন না হওয়ায় নেই নাগরিক সুবিধা। নতুন করে আরও তিনটিসহ মোট ওয়ার্ড সংখ্যা ৯। কিন্তু মেম্বার আছেন চারজন। যারা প্রায় একযুগ ধরে দায়িত্বে আছেন। নতুন ইউনিয়ন ওমরপুর নিয়ে পরিকল্পনা সাজিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন চেয়ারম্যান। আছলামপুর নিয়ে তার কোনো ভাবনা নেই। এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন চেয়ারম্যান এ কে এম সিরাজুল ইসলাম।
তিনি আমার সংবাদকে বলেন, মূলত সীমানা বিরোধের কারণেই দীর্ঘদিন নির্বাচন হচ্ছে না। বিষয়টি সমাধানের জন্য আমি বারবার এমপি মহোদয়ের সাথে যোগাযোগ করেছি। নির্বাচন চেয়ে একজন আদালতে মামলা করেছে। আদালত নির্বাচন আয়োজনের জন্য রায়ও দিয়েছে। আমি সবাইকে সার্বিক সহায়তা করেছি। আশা করি শিগগিরই তফসিল হবে।
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন