- এবার উত্তরায় বিজিবি মার্কেট ও বায়তুল মোকাররমের স্বর্ণের মার্কেটে আগুন
- কারণ খতিয়ে দেখছে পুলিশ, কাজ করছে র্যাবের গোয়েন্দা দল
- অগ্নিঝুঁকি নিরসনে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে ফায়ার সার্ভিসের মতবিনিময়
রাজধানীতে ধারাবাহিকভাবে জ্বলছে মার্কেট থেকে বিপণিবিতান। একের পরপর অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় নানা সন্দেহ দানা বাঁধছে জনমনে। ক্ষতিগ্রস্তরা বলছেন, এসব নাশকতা। কেউ কেউ আবার উড়িয়ে দিচ্ছেন দুর্ঘটনা হিসেবে। খোদ প্রধানরমন্ত্রী শেখ হাসিনাও আগুনের এসব ঘটনায় সন্দেহ প্রকাশ করছেন। সতর্ক থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন সবাইকে। এদিকে ঘটনা ঘটার পরই ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ থেকে শুরু করে সংশ্লিষ্ট সরকারি সব দপ্তরের তৎপরতা বাড়ে। যদিও আগুনের এসব ঘটনা থামছেই না। গতকাল সোমবারও রাজধানীর উত্তরায় বিজিবি মার্কেটে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে বৈদ্যুতিক তারের মাধ্যমে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে বায়তুল মোকাররম মার্কেটেও।
ফায়ার সার্ভিস সদর দপ্তর জানায়, উত্তরার বিজিবি মার্কেটে সকাল ১০টা ২৫ মিনিটের দিকে আগুনের ঘটনা ঘটে। পরে ফায়ার সার্ভিসের ১০টি ইউনিট ১১টা ১০ মিনিটের দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। যদিও এ ঘটনায় হতাহতের কোনো খবর জানাতে পারেনি ফায়ার সার্ভিস। এর কয়েক ঘণ্টার পর বায়তুল মোকাররমের স্বর্ণের মার্কেটেও অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। তবে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা ঘটনাস্থলে আসার আগেই আগুন নিভে যায় বলে জানান ফায়ার সার্ভিসের ডিএডি শাহজাহান শিকদার। ধারাবাহিকভাবে ঘটা অগ্নিকাণ্ডের এসব ঘটনা নাশকতা কি-না, তা খতিয়ে দেখা দরকার বলে জানিয়েছেন ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মাইন উদ্দিন। তিনি বলেন, ‘আমি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে অনুরোধ করব, এ বিষয়টি খতিয়ে দেখার জন্য। কেন একের পর এক মার্কেটগুলোতে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে।’
এদিকে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল-মামুন বলেছেন, রাজধানীতে ঘটে যাওয়া প্রতিটি অগ্নিকাণ্ডের কারণ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। নাশকতার প্রমাণ পাওয়া গেলে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। রাজধানীর সিদ্ধেশ্বরী স্কুল অ্যান্ড কলেজ মাঠের এক অনুষ্ঠানে পুলিশপ্রধান এ কথা বলেন। আইজি বলেন, ‘আমরা ইদানীং লক্ষ করছি, রাজধানীর কয়েকটি মার্কেটে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। প্রতিটি ঘটনা পুলিশ খতিয়ে দেখছে। এখানে যদি কোনো নাশকতার ঘটনা থাকে, তাহলে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’ বারবার এ অগ্নিকাণ্ডের বিষয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার খন্দকার গোলাম ফারুক বলেন, ‘পুলিশের পক্ষ থেকে আমরা সব বিষয় মাথায় রেখে তদন্ত করব। এগুলো নিছক দুর্ঘটনা, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো কারণ আছে তা খতিয়ে দেখা হবে।’ র্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন জানিয়েছেন, নিউমার্কেটের আগুন নাশকতা কি-না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এ জন্য র্যাবের গোয়েন্দা দল কাজ করছে।
এদিকে, ধারাবাহিক অগ্নিকাণ্ডের পর বিভিন্ন মার্কেট নিয়ে এখন চুলচেরা বিশ্লেষণ করেছে ফায়ার সার্ভিস। সেই আলোকে অগ্নিঝুঁকির একটি তালিকাও প্রকাশ করেছে তারা। এই তালিকায় রয়েছে ৫৮টি মার্কেট। যদিও বিভিন্ন সময়ে অগ্নিকাণ্ডের পর তদন্ত কমিটি গঠন করে ফায়ার সার্ভিস। তবে সেই তদন্তের সুপারিশের আলোকে বাস্তবায়ন হয় না কিছুই। এবারও ঢাকা নিউমার্কেটের পাশে গাউছিয়া মার্কেটসহ ৯টি মার্কেটকে ‘অধিক ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এ ছাড়া ১৪টি মার্কেটকে ‘মাঝারি ঝুঁকিপূর্ণ’ এবং ৩৫টি মার্কেটকে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ তালিকায় রাখা হয়েছে। ফায়ার সার্ভিস পরিচালক (অপারেশন) লেফটেন্যান্ট কর্নেল তাজুল ইসলাম এ নিয়ে সংবাদ সম্মেলনও করেন। তিনি বলেন, রাজধানীতে যে ৫৮টি ভবনকে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, তার সবগুলোই বাণিজ্যিক। এর মধ্যে ৯টি ‘অধিক ঝুঁকিপূর্ণ’, ১৪টি মাঝারি’ আর ৩৫টি ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। অধিক ঝুঁকিপূর্ণের তালিকায় গাউছিয়া মার্কেট ছাড়াও রয়েছে ফুলবাড়িয়ার বরিশাল প্লাজা মার্কেট, টিকাটুলীর রাজধানী সুপার মার্কেট, লালবাগের আলাউদ্দিন মার্কেট, চকবাজারের শাকিল আনোয়ার টাওয়ার, শহীদ উল্লাহ মার্কেট, সদরঘাটের শরীফ মার্কেট, মাশা কাটারা ২২ মার্কেট এবং সিদ্দিক বাজারের রোজ নীল তিস্তা মার্কেট।
অগ্নিঝুঁকি নিরসনে ব্যবসায়ীদের সাথে ফায়ার সার্ভিসের মতবিনিময় : অগ্নিঝুঁকি নিরসনে দোকান মালিক ও ব্যবসায়ীদের সাথে মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। ফায়ার সার্ভিস অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মাইন উদ্দিনের নির্দেশনায় রবি ও সোমবার ঢাকার বিভিন্ন দোকান মালিক ও ব্যবসায়ীদের সাথে এই মতবিনিময় সভা ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স সদর দপ্তরের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত হয়। মতবিনিময় সভার সময়কাল ছিল রোববার সকাল ১০টা থেকে ১২টা এবং সোমবার বেলা ২টা থেকে বিকেল ৪টা। মতবিনিময় সভায় নেতৃত্ব দেন ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের পরিচালক (অপারেশন ও মেইনটেন্যান্স) লে. কর্নেল মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম চৌধুরী। ফায়ার সার্ভিসের বিভিন্ন পদমর্যাদার কর্মকর্তারা এবং এনএসআই ও ডিজিএফআইর প্রতিনিধিরা এতে উপস্থিত ছিলেন। মতবিনিময় সভায় গাউছিয়া মার্কেট, রাজধানী ও নিউ রাজধানী সুপার মার্কেট, মৌচাক মার্কেট, গুলিস্তান পাতাল মার্কেট, বরিশাল প্লাজা, বঙ্গ হোমিও মার্কেট, আজাহার মার্কেট, এনেক্সকো টাওয়ার মার্কেট, ওয়ান স্টার হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট, গোল্ডেন প্লাজা মার্কেট, বঙ্গবাজার কমপ্লেক্স মহানগর ইউনিট ইত্যাদি মার্কেটের ব্যবসায়ী সমিতির নেতারা, হোটেল ও দোকানের মালিক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীসহ মার্কেটের নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত সিকিউরিটি গার্ডরা অংশগ্রহণ করেন।
মতবিনিময় সভায় পরিচালক (অপারেশন্স ও মেইনটেনেন্স) লে. কর্নেল মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম চৌধুরী মার্কেট পরিদর্শনের ফলাফল অনুযায়ী অগ্নিনিরাপত্তার দিক থেকে মার্কেটের বিভিন্ন অসঙ্গতি তুলে ধরেন। তিনি এসব সমস্যা সমাধানে করণীয় বিষয়েও সবাইকে ধারণা প্রদান করেন। পাশাপাশি তিনি ব্যবসায়ীদের উদ্দেশ্যে বলেন, জীবন ও সম্পদের সুরক্ষা দেয়ার জন্য মার্কেট ও শপিংমলের অগ্নিনিরাপত্তা বৃদ্ধিতে আপনাদের সবার সমন্বিত সহযোগিতা প্রয়োজন। আপনারা আন্তরিক হলেই কেবল ভবিষ্যতে বঙ্গবাজার ও নিউ মার্কেটের মতো ভয়াবহ অগ্নিদুর্ঘটনা থেকে আপনাদের প্রিয় প্রতিষ্ঠান রক্ষা করা সম্ভব হবে। এ সময় ব্যবসায়ী ও দোকান মালিক সমিতির নেতারা তাদের মতামত ব্যক্ত করে জানান, ফায়ার সার্ভিসের পরামর্শ অনুযায়ী তারা তাদের মার্কেট ও শপিংমলের অগ্নিঝুঁকি নিরসনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করবেন।
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন