পাঁচ সিটিতে সবার নজর

সৈয়দ সাইফুল ইসলাম প্রকাশিত: মে ৬, ২০২৩, ১২:১৩ এএম
পাঁচ সিটিতে সবার নজর

আ.লীগের ছায়া থেকে বের হলে একজন কর্মীও খুঁজে পাওয়া যাবে না
—মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া
আ.লীগ সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য

উপযুক্ত বিকল্প না থাকায় প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হচ্ছে না
—ড. বদিউল আলম মজুমদার
সুজন সম্পাদক

সিটি নির্বাচনে বিএনপির আগ্রহ নেই
—জয়নুল আবদীন ফারুক
বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা

নির্বাচন কমিশন ঘোষিত তফসিল অনুযায়, মে ও জুনে পাঁচ সিটি কর্পোরেশনে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। আগামী দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন কেমন হবে, নির্বাচন কমিশন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানে কতটা সক্ষম হবে, বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো কমিশনের ওপর কতটা আস্থা রাখতে পারবে, ক্ষমতায় থেকে নির্বাচন দিলে সরকারের আচরণ কেমন থাকবে— এমন নানা প্রশ্নের উত্তর মিলবে পাঁচ সিটি নির্বাচনে। নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, পাঁচ সিটিতে নির্বাচন পরিস্থিতি বিদেশিরাও লক্ষ রাখছেন। নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে না এমন রাজনৈতিক দল, বিদেশি উন্নয়নসহযোগী ও ব্যবসায়ীসহ নানাভাবে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে যারা সবসময় সতর্ক দৃষ্টি রাখেন তারাও সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের দিকে নজর রাখছেন। বিএনপিসহ রাজপথে থাকা বিরোধী দলগুলো নির্বাচনে অংশ না নেয়ায় জয়ের ব্যাপারে ক্ষমতাসীন দল মনোনীত প্রার্থীর বিজয় অনেকটাই নিশ্চিত। স্থানীয় সরকারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই সিটি নির্বাচনগুলোতে প্রধান বিরোধী দল অংশ না নেয়ায় নির্বাচন যে তীব্র প্রতিযোগিতাপূর্ণ হচ্ছে না তা স্পষ্ট। তবে দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলে কিছুটা হলেও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ভোট হতে পরে। 

একইভাবে বিএনপি নির্বাচনে না যাওয়ার কারণে দলটির কোনো জনপ্রিয় নেতা ভোটের মাঠে এলে কিছুটা প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ভোট হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে। সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্নভাবে নির্বাচনে আসতে বিএনপিসহ রাজপথে থাকা বিরোধী দলগুলোকে উৎসাহিত করা হচ্ছে। বি-বাড়িয়ার মতো উকিল আবদুস সাত্তার স্টাইলে বিএনপির জনপ্রিয় কোনো প্রার্থীকে নির্বাচনে নিয়ে আসার চেষ্টা চলছে বলেও রাজনৈতিক মহলে আলোচনা রয়েছে। বিএনপি নির্বাচনে না গেলে ভুল করবে, রাজনীতির মূল ধারা থেকে হারিয়ে যাবে, এমন বক্তব্য দিচ্ছে সরকার ও আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল নেতারা। গত ১৮ এপ্রিল প্রবীণ রাজনীতিবিদ ও আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের অন্যতম সদস্য তোফায়েল আহমেদ তার নির্বাচনি এলাকায় দরিদ্র নারীদের শাড়ি বিতরণ অনুষ্ঠানে বলেছেন, ‘নির্বাচনে অংশ না নিলে বিএনপি রাজনীতি থেকে হারিয়ে যাবে।’ তিনি বলেন, ‘রাজনীতির প্রাণকেন্দ্র হচ্ছে নির্বাচন, সে কারণে যারা নির্বাচনে অংশ নেবে না তারা রাজনীতি থেকে হারিয়ে যাবে।’ বিশ্লেষকরা বলছেন, ১৯৮৬ সালে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে রাজপথে সোচ্চার হয় আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল। তারা এরশাদের অধীনে নির্বাচনে না যাওয়া সিদ্ধান্ত নেয় কিন্তু এক পর্যায়ে আওয়ামী লীগ ও জামায়াতে ইসলামী এরশাদের অধীনে ভোটে যায়। নির্বাচনে না যাওয়ার কারণে তখন বিএনপিকে নিয়ে নানা বিশ্লেষণ হয়েছে, রাজনীতিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা তখন বলাবলি করছিলেন— নির্বাচনে অংশ না নেয়ার কারণে বিএনপি রাজনীতির মূল কক্ষপথ থেকে হারিয়ে যাবে। রাজনীতির মূল ধারা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ঘটেছে এর উল্টো ঘটনা। ১৯৮৬ সালে নির্বাচন বর্জনকারী দল বিএনপি ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনে অংশ নিয়ে সরকার গঠন করেছে। ফলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, নির্বাচনে অংশ নেয়া বা না নেয়া সব সময় এক রকম ফল বলে আনে না। 

সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার আমার সংবাদকে বলেন, ‘নির্বাচন মানে সিদ্ধান্ত গ্রহণ, তাই নির্বাচনে উপযুক্ত বিকল্প না থাকলে সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়া সুযোগ থাকে না।’ তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, ‘আপনার কাছে যদি দুটি গ্লাসে দুই ধরনের পানি থাকে, অর্থাৎ একটি গ্লাসে সিদ্ধ পানি, অন্য গ্লাসে ময়লা পানি, এ ক্ষেত্রে আপনি অবশ্যই সিদ্ধ পানি গ্রহণ করবেন। যেহেতু উপযুক্ত আর বিকল্প নেই। নির্বাচনেরও একই অবস্থা। ভোটের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নিতে হলে একাধিক বিকল্প উপযুক্ত প্রার্থী থাকতে হয়, সেটি না থাকলে নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয় না। সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনগুলোতে বিএনপিসহ বড় রাজনৈতিক দলগুলোর প্রার্থী না থাকায় এ নির্বাচনগুলোও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হচ্ছে না। তবে এই নির্বাচন থেকে সরকার তাদের মাঠ পর্যবেক্ষণ ও কৌশল নির্ধারণ করতে পারে।’ জাতীয় সংসদের সাবেক চিফ হুইপ ও বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা জয়নুল আবদীন ফারুক আমার সংবাদকে বলেন, ‘সুষ্ঠু নির্বাচনের কোনো সম্ভাবনা নেই বলেই বিএনপি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন থেকে শুরু করে কোনো নির্বাচনেই অংশ না নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বর্তমান সরকারের অধীনে কোনো গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হওয়ার কোনো সম্ভাবনা দেখছে না তারা।’ তিনি বলেন, ‘দলীয় সিদ্ধান্তের কারণে সিটি নির্বাচন কেমন হবে, কারা এ নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে— এ নিয়ে বিএনপির কোনো আগ্রহ নেই। তিনি বলেন, ‘দলীয় সরকারের অধীনে জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও অংশ নেবে না বিএনপি।’ 

আওয়ামী লীগ সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও গাজীপুর সিটি নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া দলীয় মেয়র প্রার্থীকে বিজয়ী করতে মাঠে অবস্থান করছেন। নিয়মিত সভা-সমাবেশ ও অভ্যন্তরীণ বৈঠকে মিলিত হচ্ছেন। গত ৩ মে দল থেকে মনোনয়ন না পাওয়া সাবেক মেয়র জাহাঙ্গীর আলমকে উদ্দেশ্য করে মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া বলেন, ‘জনগণ আওয়ামী লীগকে ভালোবাসে। আওয়ামী লীগের ছায়াতল থেকে বের হয়ে দেখুন একজন কর্মীও খুঁজে পাবেন না আপনার পেছনে।’ এবার নৌকার বিরোধিতা যে করবে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে হুঁশিয়ারিও দেন তিনি। প্রসঙ্গত, নির্বাচন কমিশন গত ৩ এপ্রিল পাঁচ সিটি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে। সে অনুযায়ী গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনে ভোট হবে আগামী ২৫ মে, খুলনা ও বরিশাল সিটি কর্পোরেশনে হবে ১২ জুন এবং রাজশাহী ও সিলেট সিটি কর্পোরেশনে হবে ২১ জুন।