- সাম্প্রতিক সময়ে খুনোখুনিতে বেড়েছে ছুরির ব্যবহার, সারা দেশে একই অবস্থা
সম্পর্ককেন্দ্রিক তুচ্ছ বিষয়ে খুনোখুনির ঘটনা বেশি ঘটছে
—তৌহিদুল হক, সমাজ ও অপরাধ গবেষক
অপরাধের চিত্র অনুযায়ী পুলিশ পেট্রোলিং বাড়ানোসহ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপও গ্রহণ করা হয়
—মুখপাত্র, ডিএমপি
যেসব বিষয়ে বড়জোর তর্কবিতর্ক হতে পারে, সেসব বিষয়েও ঘটছে খুনোখুনি। হালের এই চিত্র গোটা দেশজুড়ে। ঢাকা ও ঢাকার বাইরে সম্প্রতি বেশকটি খুনের ঘটনা ঘটেছে। যার বেশিরভাগই অতি তুচ্ছ বিষয়ে। এর মধ্যে কুমিল্লার একটি পেট্রোল পাম্পে ১০০ টাকার জন্য এক কর্মচারীর ছুরিকাঘাতে আরেক কর্মচারী খুন হন। ঝালকাঠিতে পরকীয়ার অভিযোগে তরুণীকে পার্কে নিয়ে ছুরিকাঘাতে খুন করেন জেলা ছাত্রলীগের সহসভাপতি আলী ইমাম খান অনু। ঢাকার শনিরআখড়ায় দনিয়া কলেজের সামনে গত সপ্তাহে তাজুল ইসলাম নামে এক এসএসসি পরীক্ষার্থীকে ছুরিকাঘাতে খুন করা হয়। হাইকোর্টের সামনেও ছুরিকাঘাতে অজ্ঞাত এক যুবককে খুন করা হয়। একইদিন সন্ধ্যায় চাঁনখারপুলেও অজ্ঞাত আরেক যুবককে ছুরিকাঘাতের ঘটনা ঘটে। ঢাকার বাইরে একেকটি খুনের নেপথ্যে একেক কারণ জানা গেলেও ঢাকায় বেশিরভাগ ঘটনাই ঘটাচ্ছে কিশোর গ্যাং সদস্যরা। যারা কথায় কথায় অন্যের ওপর করছে হামলা, মারধর ও ছুরিকাঘাত। ঢাকাসহ সারা দেশের বেশিরভাগ খুনের ঘটনায় দেখা যাচ্ছে দেশি অস্ত্রের ব্যবহার বেড়েছে। বিশেষ করে ছুরির ব্যবহার ঘটছে বেশি। খুনোখুনির ঘটনায় এটির ব্যবহার বাড়ার অন্যতম কারণ ছুরি সহজলভ্য। বাসাবাড়িতে হাত বাড়ালেই পাওয়া যাচ্ছে এটি। ছুরি কেনায়ও নেই কোনো জটিলতা। এ সুযোগেই ছুরির ব্যবহারে বাড়ছে খুনের ঘটনা।
ঢাকায় গত বুধরার প্রতিপক্ষের ছুরিকাঘাতে তাজুল ইসলাম নামে এক এসএসসি পরীক্ষার্থী নিহত হয়। এ সময় সায়েম নামে আরও এক শিক্ষার্থী গুরুতর আহত হয়েছে। ওইদিন সন্ধ্যায় যাত্রাবাড়ীর শনিরআখড়া দনিয়া কলেজের সামনে এ ঘটনা ঘটে। তাজুল দনিয়া এ কে স্কুল অ্যান্ড কলেজের চলমান এসএসসি পরীক্ষার্থী ছিল। গত ৯ মার্চ হাইকোর্ট সংলগ্ন রাস্তায় ছুরিকাঘাতে অজ্ঞাত এক যুবক নিহত হন। সন্ধ্যা ৭টার দিকে এ ঘটনা ঘটে। মুমূর্ষু অবস্থায় তাকে দুই পথচারী ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। চিকিৎসক রাত সোয়া ৮টার দিকে তাকে মৃত ঘোষণা করেন। পথচারীরা জানান, তারা হাইকোর্টের সামনের রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলেন। এ সময় দেখেন ওই যুবক রাস্তার পাশ থেকে হেঁটে এসে একটি রিকশার সঙ্গে ধাক্কা খান। তখন তারা অন্য একটি রিকশায় করে তাকে হাসপাতালে নিয়ে যান। তবে নিহত যুবকের সঙ্গে কী হয়েছে, সে বিষয়ে কিছু জানেন না বলে জানিয়েছেন তারা। নিহতের বুক ও পাঁজরসহ কয়েক স্থানে ধারালো অস্ত্রের আঘাত রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
ঝালকাঠিতে জেলা ছাত্রলীগের সহসভাপতি অনু সায়মা নামের এক তরুণীকে পার্কে ডেকে ছুরিকাঘাতে খুন করা হয়; অতঃপর খুনি থানায় আত্মসমর্পণ করেন। তার দাবি, সম্পর্কের একপর্যায়ে চার বছর আগে তারা গোপনে কাজী ডেকে বিয়েও করেন। কিন্তু বিয়ের কথা দুই পরিবারের কেউ জানত না। ফেসবুক পোস্টে সায়মার বিরুদ্ধে অন্যের সঙ্গে সম্পর্কের অভিযোগ আনেন অনু। তিনি দাবি করেন, এর জেরেই সায়মাকে ডেকে নিয়ে তিনি খুন করেন। তবে সায়মার বাবা শাহাদাৎ তালুকদার অভিযোগ করে বলেন, চার বছর ধরেই আলী ইমাম নামে ওই ছেলে তার মেয়েকে উত্ত্যক্ত করে আসছিল। তিন মাস আগে বাড়ির সামনেই সায়মাকে বিরক্ত করছিল আলী ইমাম। তা দেখতে পেয়ে মেয়েকে বিরক্ত করতে নিষেধ করেছিলেন তিনি। এ কারণে ক্ষিপ্ত হয়ে মেয়েকে হত্যা করা হতে পারে বলে ধারণা করছেন সায়মার বাবা। এছাড়া ঢাকাসহ সারা দেশে বিদেশি অস্ত্রের ব্যবহারেও ঘটছে খুনোখুনির ঘটনা। এছাড়া পিটিয়ে হত্যার ঘটনাও ঘটছে কোথাও কোথাও। সম্প্রতি রাজবাড়ীর পাংশা পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক মিজানকেও প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয়। শিক্ষকতার পাশাপাশি মিজান স্থানীয় বাজারে সারের ব্যবসা করতেন। ঘটনার দিন দোকানের হালখাতা শেষ করে বাড়ি ফেরার পথেই এ ঘটনা ঘটে।
একই দিন কুমিল্লায় এশার নামাজের উদ্দেশ্যে মসজিদে যাওয়ার পথে বোরকা পরিহিত তিন দুর্বৃত্তের গুলিতে নিহত হন তিতাস উপজেলা যুবলীগ নেতা জামাল হোসেন। এর সপ্তাহখানেক আগে কুমিল্লার মাঝিগাছা এলাকায় প্রেমিকার সঙ্গে দেখা করতে যাওয়ায় পরিবারের সদস্যদের পিটুনিতে নিহত হন প্রেমিক মোহাম্মদ মাহিন। এ ঘটনায় সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলা অবস্থায় মারা যান মাহিনের বাবা হিরণ মিয়া। এছাড়াও দেশের বিভিন্ন স্থানে ছুরিকাঘাত, গুলি, পিটুনি ছাড়াও বিভিন্ন দেশি-বিদেশি অস্ত্রের ব্যবহারে কথায় কথায় খুনোখুনির ঘটনা বেড়েই যাচ্ছে।
এদিকে রাজধানীর ৫০ থানায় চলতি বছরের গত চার মাসে পুলিশের দেয়া তথ্য বলছে— খুন, অপহরণ, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, চুরি-ডাকাতি, অস্ত্র, মাদক, চোরাচালান, ধর্ষণ, নারী-শিশু নির্যাতন, সড়ক দুর্ঘটনাসহ অর্ধশত ধরনের অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। এসব অপরাধে বছরজুড়ে রাজধানীর বিভিন্ন থানায় ২০-৩০ হাজার মামলা হয়। সবচেয়ে অপরাধ বেশি হয় তেজগাঁও অঞ্চলে এবং কম রমনা বিভাগে।
২০২২ ও ২০২৩ সালে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) মামলার উপাত্ত বিশ্লেষণ করে ডিএমপির তথ্য বলছে, ২০২২ সালে ডিএমপির ৫০টি থানা মিলে মামলা হয়েছে ২৮ হাজার ৭৪৯টি। ২০২৩ সালের এপ্রিল পর্যন্ত আট হাজার ৫০৩টি মামলা হয়েছে। ডিএমপির ওয়ারী বিভাগে ওয়ারী, ডেমরা, শ্যামপুর, যাত্রাবাড়ী, গেণ্ডারিয়া ও কদমতলী এ ছয়টি থানা। এখানে প্রায়ই চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে। চলতি বছরের ৩ এপ্রিল ও ১৩ মার্চ ডেমরা থানার আমুলিয়া মডেল টাউন এলাকায় দুটি খুনের ঘটনা ঘটে। নিহত দুজনই অটোচালক। গত বছর ডিএমপিতে ১৭৩ খুনের ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৩৭টি ঘটে ওয়ারী বিভাগে। ৩১টি মিরপুর বিভাগে। এছাড়া মতিঝিল ও গুলশানে ২১টি করে, লালবাগ ও উত্তরা বিভাগে ১৭টি করে খুনের ঘটনা ঘটেছে। আর রমনায় ১৬টি ও তেজগাঁওয়ে ১৩টি। এ ব্যাপারে চলতি সালের এপ্রিল পর্যন্ত ১৯ হাজার ১০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এসব মামলা নিষ্পত্তি ও অপরাধ দমন করতে গিয়ে ২০২২ সালে ৮৮ জন ও ২০২৩ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ২২ পুলিশ সদস্য হামলার শিকার হয়েছেন। চলতি বছরের প্রথম চার মাসে তেজগাঁও বিভাগে সবচেয়ে বেশি এক হাজার ৬৩১টি এবং রমনা বিভাগে সবচেয়ে কম ৬৬৬টি মামলা হয়েছে। চলতি বছরের প্রথম চার মাসে সবচেয়ে বেশি ৭৮৪টি অস্ত্র, মাদক, চোরাচালান মামলা হয়েছে। এ বছরও দস্যুতা, ছিনতাই ও চুরিসহ অন্যান্য ঘটনায় বেশি মামলা হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, রাজধানীতে এলাকাভেদে অপরাধের বৈচিত্র্যতা দেখা যায়। সম্পর্ককেন্দ্রিক অপরাধ যেমন— মনোমালিন্য, ঝগড়া, মারামারি, পারিবারিক কলহ, বন্ধুত্বকে কেন্দ্র করে খুনোখুনির ঘটনা ঘটে।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া উপকমিশনার (ডিসি) মো. ফারুক হোসেন বলেন, রাজধানীতে বিভিন্ন সময়ে অপরাধের চিত্র বিভিন্ন ধরনের হয়ে থাকে। কোনো মাসে কম অপরাধ সংঘটিত হয়। কখনো আবার হঠাৎ করে খুন, ছিনতাই, চুরি-ডাকাতিসহ বিভিন্ন অপরাধ বেড়ে যায়। এক্ষেত্রে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে ডিএমপির সবগুলো থানাকে নিয়ে মাসিক অপরাধ সভার মাধ্যমে প্রকৃত অপরাধের চিত্র তুলে ধরা হয়। যেসব এলাকায় অপরাধের মাত্রা বেশি হয়, সংশ্লিষ্ট ওই থানায় অপরাধ নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব আরোপ করার পাশাপাশি পুলিশ পেট্রোলিং বাড়ানোসহ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপও গ্রহণ করা হয়।
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন