বিএনপিতে জাপা সখ্য

আবদুর রহিম প্রকাশিত: মে ১৮, ২০২৩, ১১:২৩ পিএম
বিএনপিতে জাপা সখ্য
  • ভাবি আ.লীগে থাকলেও দেবর বিএনপিতে আসার গুঞ্জন
  • সামাজিক অনুষ্ঠান ও পর্দার আড়ালে চলছে নানা বৈঠক 
  • বড় দুই দলে ৮০ আসন পেতে খসড়া পৌঁছাল জাপা 
  • এবার নির্বাচনি কৌশলে জাপাকে নিজ ঘরে চায় বিএনপি

জাতীয় পার্টি নির্বাচনে যাবে, আলোচনা আড্ডা রাজনৈতিক সৌন্দর্য
—কাজী ফিরোজ রশীদ
জাতীয় পার্টির কো-চেয়ারম্যান  

জাতীয় পার্টি সাড়া দিচ্ছে তবে তারা সব সময় হিসাব করেই পা বাড়ায়
—ড. আব্দুল মঈন খান
বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য

বিএনপির সঙ্গে সখ্য বাড়াচ্ছে জাতীয় পার্টি। নানা সামাজিক অনুষ্ঠান ও পর্দার আড়ালে এক টেবিলে বিএনপির সাথে বসছে দলটি। ঐক্য গঠন ও রাজনৈতিক সংস্কৃতি পরিবর্তনের বার্তা দিচ্ছে। রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জাতীয় পার্টি রাজনৈতিক অস্তিত্ব রক্ষা ও সবসময় সুবিধাজনক সময়ে থাকতে চায়। হিসাব বুঝে ভোটের মাঠেও থাকে চাঙা। বর্তমানে ২৬ জন সংসদ সদস্য নিয়ে সংসদে দাপটের সাথে রয়েছে। একাদশ জাতীয় সংসদের ভোটে বিএনপির ভরাডুবি হলেও জাপা মনোনীত ২২ জন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এর মধ্যে চারজন সংরক্ষিত মহিলা সংসদ সদস্যও রয়েছেন। এবার সেই দলটি সরকারের সাথে থাকলেও দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সরকারবিরোধী শিবিরে ঘনিষ্ঠ হতে শুরু করেছে। গেলো বছর বিএনপির ইফতারে জাতীয় পার্টির নেতারা অংশগ্রহণ করেন। একইভাবে জাতীয় পার্টির ইফতারেও শামিল হন বিএনপি নেতারা। 

এ ছাড়া গত সপ্তাহে বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি আয়োজিত ঈদ পুনর্মিলনী ও আড্ডায় বিএনপি এবং জাতীয় পার্টিকে এক টেবিলে দেখা গেছে। এতে গুঞ্জন উঠেছে— দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে জাতীয় পার্টি কি আওয়ামী লীগ ছেড়ে জোট বাঁধবে বিএনপির সাথে!  খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এবার জাতীয় পার্টিকে কাছে টানতে চাইছে বিএনপি। এরই মধ্যে দুদলের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের মধ্যে হয়েছে পর্দার আড়ালে কয়েক দফা আলোচনা। চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য দলীয় বৈঠকের অপেক্ষায় রয়েছেন জি এম কাদের। 

আর বিএনপি নেতারা মনে করছেন, বৃহত্তর স্বার্থে এবার তাদের সাথে আসবে জাতীয় পার্টি। সরকার যদি সুবিধাজনক অবস্থা থেকে সরে পড়ে— যেকোনো মুহূর্তে জাতীয় পার্টি বিএনপিতে আসার প্রকাশ্যে ঘোষণা দেবে। সমপ্রতি কয়েকটি অনুষ্ঠানে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদেরও বলেছেন, ‘এবার জোটের বিষয়ে নানা পর্যায়ে কথা হচ্ছে। জনগণ পরিবর্তন চায়। দলীয় নেতাকর্মীদের মতামতের ভিত্তিতে নির্বাচনের আগেই হবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত— আমরা কাদের সাথে থাকব।’ এ ছাড়া নির্বাচন কমিশনের সাথে বৈঠকে জাতীয় পার্টির মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু ২০১৮ সালের নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেছেন, ‘এই সরকারের অধীনে রাতের বেলায় ভোট হয়েছে।’ এতে করে ক্ষমতাসীন দলকে ত্যাগ করার ইঙ্গিত বহন করছে বলেও মনে করা হচ্ছে।  

দু’দলের সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, বর্তমান সরকারের অধীনে নির্বাচনে অংশ না নেয়ার সিদ্ধান্তে অটল বিএনপি। তাই আওয়ামী লীগ সরকারের সাথে টানা তিনবার ভোটে প্রকাশ্যে থাকা জাতীয় পার্টিও নানা হিসাব করছে। জাতীয় পার্টির একটি অংশ বিএনপির সাথে যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছে। ভোটের আগে দল ভেঙে জাতীয় পার্টির একটি অংশ বিএনপির সাথে যোগ দেয়ারও গুঞ্জন উঠেছে রাজনীতি পাড়ায়। জাতীয় পার্টির নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে ,তারা ৮০টি আসনের খসড়া পৌঁছিয়েছে বড় দুই দলে। গত মার্চ মাসে তারা আওয়ামী লীগকে ৮০ আসনের জন্য তালিকা দেয়। সেই একই তালিকা বিএনপিকেও দেয়া হয়। এখন ভোটের পলিসিতে আগাম জয়ের বাতাস যে দিকে ভারী হতে পারে সে দিকেই জাপা পা বাড়াবে। তাই আগামী দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দুই শিবিরেই যোগাযোগ রেখে চলছে জাতীয় পার্টি।

বিএনপি যদি শেষ সময়ে এসে চূড়ান্তভাবে নির্বাচন না করে তাহলে পরিস্থিতির শুভ লক্ষণ দেখছে না জাতীয় পার্টির ভোট পর্যবেক্ষদের একটি অংশ। চতুর্থবারও সরকারকে সমর্থন দিয়ে ভোটে যাবে কি-না এ নিয়ে পর্দার আড়ালে হিসাব বুঝে নিচ্ছে দলটি। অতীতে সারা দেশে দলটি ৩০০ আসনে নির্বাচন করার প্রার্থী থাকলেও হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের মৃত্যুর পর তাতে ভাটা পড়েছে। এ পরিস্থিতে  বর্তমানে জাপার একটি অংশ বিএনপির সাথে যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছে, তারা সরকারের বলয় থেকে বের হতেও চেষ্টা করছে। আরেকটি অংশ সরকারের সাথেই থাকতে চাচ্ছে। দেবর-ভাবির দূরত্বের বিষয় নির্বাচনের  আগে আরো বড় আকার ধারণ করতে পারেন। 

এদিকে জাতীয় নির্বাচনের আগে দলীয় ঝামেলা নিয়ে এখনো ভুগছে দলটি। একটি পক্ষ দলের চেয়ারম্যান জিএম কাদেরের বাইরে বলয় তৈরির চেষ্টা করছে। তারা দলের প্রধান পৃষ্ঠপোষক রওশন এরশাদকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করতে চাইছে। অন্যদিকে জি এম কাদের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী দল পরিচালনা ও নেতাকর্মীদের মতামতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিয়ে দলে নতুন বলয় তৈরি করেছেন। এ দূরত্বের মধ্যে নির্বাচনের আগে কোনো বিস্ফোরণও ঘটতে পারে। একাংশ ভেঙে বিএনপির সঙ্গেও যুক্ত হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। রওশন এরশাদ সরকারের সাথে থাকলেও জিএম কাদের বিএনপির সঙ্গে জোট বেধে ছুটে যেতে পারেন এমন আশঙ্কাই বেশি। 

বিরোধী শিবিরে অংশগ্রহণ ও আগামী নির্বাচনি ভাবনা জানতে চাইলে জাতীয় পার্টির কো-চেয়ারম্যান কাজী ফিরোজ রশীদ এমপি আমার সংবাদকে বলেন, ‘যেকোনো নির্বাচনই হোক না কেন, জাতীয় পার্টি অংশগ্রহণ করবে। ইলেকশনের জন্য যদি কোনো আন্দোলনও করা প্রয়োজন পড়ে এ দলটি জনগণকে সাথে নিয়ে তাই করবে। জাতীয় পার্টি বাংলাদেশের ইতিহাসে রাজনীতির দল। মানুষের জন্য রাজনীতি করে যাচ্ছে। আর আলাপ-আলোচনা আড্ডার বিষয়গুলো রাজনৈতিক সৌন্দর্য। এগুলোর সব তাৎপর্য প্রকাশ্যে ব্যক্তি নিজেই বলতে পারবেন। পুরো দলের বিষয় আমার পক্ষে বলা সম্ভব নয়। 

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খান আমার সংবাদকে বলেছেন, বৃহত্তর স্বার্থে মতভেদ ভুলে ঐক্য নিয়ে সামনে এগোনোর লক্ষ্যেই জাতীয় পার্টির সঙ্গে আলোচনা হচ্ছে। বাংলাদেশের মানুষ এখন এই সরকারের পরিবর্তন চায়। অনেক রাজনৈতিক দলও চায়।  আর জাতীয় পার্টি সব সময় হিসাব করেই পা বাড়ায়। যেদিকে লাভ সেদিকেই তারা থাকবে। রাজনৈতিক সম্মানে কিছু বৈঠক হচ্ছে তারাও ডাকে সাড়া দিচ্ছেন। 

সর্বশেষ কল্যাণ পার্টির রাজনৈতিক আড্ডায় জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ও সংসদে বিরোধীদলীয় উপনেতা জিএম কাদের বলেছেন, গত কয়েক বছর এ দেশের রাজনীতিতে যে সংস্কৃতি চলছে তা শোভনীয় নয়। রাজনৈতিক নেতারা কারও প্রতিপক্ষ নন, একে অপরের যেন শত্রু হয়ে দাঁড়িয়েছেন। আমাদের একে অপরের প্রতি সহনশীল হতে হবে। সামাজিকভাবে আমাদের কাজ করতে হবে। তাহলে দেশের রাজনীতিতে আগামীতে সুবাতাস বইবে। আমরা দেশের রাজনীতিতে কাজ করে যাচ্ছি, কাজ করে যেতে চাই।’