সারা দেশে তীব্র লোডশেডিংয়ে অতিষ্ঠ জনজীবন। পাশাপাশি ব্যাহত হচ্ছে শিল্প-কারখানার ধারাবাহিক উৎপাদন। মাঝারি ও স্বল্পপুঁজির উদ্যোক্তারা বড় বিপদের মুখোমুখি হয়ে পড়েছেন। বিশ্ব ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশে লোডশেডিংয়ের প্রভাবে বছরে ৩৩০ কোটি ডলার ক্ষতি হচ্ছে। নগর, শহর ও গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল হয়ে গড়ে ওঠে ছোটখাটো হাজারো শিল্প-কারখানা। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের অভাবে এসব প্রতিষ্ঠান এখন বন্ধ হওয়ার পথে। চলমান বিদ্যুৎ বিপর্যয়ে বিপাকে এসব ছোট ছোট উদ্যোক্তারা। বন্ধ শিল্প?অধ্যুষিত গাজীপুর জেলায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা চলছে বিদ্যুতের লোডশেডিং। বিদ্যুতের জোগান নেমে এসেছে চাহিদার প্রায় অর্ধেকে। এই অবস্থা থেকে কবে পরিত্রাণ মিলবে, তা বলতে পারছেন কেউই।
শিল্পোদ্যোক্তারা যখন পথে বসার উপক্রম তখনই বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ জানিয়েছেন, দেশের লোডশেডিং পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে আরও অন্তত এক মাস সময় লাগবে। গত ২২ মে নিজ বাড়িতে এক সংবাদ সম্মেলনে একথা বলেন প্রতিমন্ত্রী। সাভার এলাকার বাসিন্দা আকরাম হোসেন নিজ বাড়িতে ছোট পরিসরে মুরগির খামার তৈরি করেছেন। মাত্রাতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের ফলে তিনি বিরাট ক্ষতির শঙ্কা করছেন। তিনি জানান, ইতোমধ্যে লোডশেডিংয়ের কারণে ডিমের উৎপাদন কমে গেছে।
এছাড়াও বিদ্যুতের সাথে সংশ্লিষ্ট সব ধরনের কাজেই বিঘ্ন ঘটছে। যাত্রাবাড়ী এলাকার লন্ড্রি দোকানি হারুন মিয়া আমার সংবাদকে জানান, দিনে পাঁচ-ছয়বার বিদ্যুৎ যায়। ঠিক মতো কাজ করতে পারছি না। অনেক কাজ জমে থাকে। গ্রাহকরা বিড়ম্বনার শিকার হয় প্রতিনিয়ত। আগে আমরা বিদ্যুতের বিকল্প হিসেবে কয়লার ব্যবহার করতাম। গত কয়েক বছর নিয়মিত বিদ্যুৎ থাকায় কয়লাও বাদ দিয়ে দেই। এখন তো মহাবিপাদে পড়ে গেছি— যুক্ত করেন তিনি। রাজধানীর ডেমরা বাজারে চাল, হলুদ, মরিচ ভাঙানোর ব্যবসা করেন জামাল হোসেন। তিনিও লোডশেডিংয়ের কবলে পড়ে ব্যবসায় ধরাশায়ী। লোডশেডিংয়ের সময় কর্মচারীরাও অলস সময় কাটান। জামাল হোসেন আরও বলেন, ‘দিনের বেশির ভাগ সময় বিদ্যুৎ থাকে না। এভাবে চলতে থাকলে শেষ পর্যন্ত ব্যবসা টিকিয়ে রাখাই সম্ভব হবে না।
বিভিন্ন জেলায় খবর নিয়ে জানা গেছে, দুই সপ্তাহ ধরে তাদের এলাকায় ঘন ঘন লোডশেডিং হচ্ছে। এখন আট থেকে ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ পাচ্ছে না মানুষ। ব্যাটারিচালিত ভ্যান ও অটোচালকরা ঠিকমতো চার্জ দিতে না পারায় দিনের অর্ধেক সময়ও গাড়ি চালাতে পারছেন না। এতে কমে গেছে তাদের আয়। গ্যারেজ মালিকরাও বিড়ম্বনায়। প্রচণ্ড গরমের মধ্যে বিদ্যুৎ না থাকায় রাতে ঠিকমতো ঘুমাতে পারছেন না গ্রাহকরা।
এদিকে গ্রামাঞ্চলের কিছু এলাকা থেকে অভিযোগ পাওয়া গেছে, শহরের তুলনায় বিদ্যুৎ সরবরাহের ক্ষেত্রে গ্রামকে বেশি বঞ্চিত করা হচ্ছে। তবে এমন অভিযোগের সঙ্গে একমত নয় বিদ্যুৎ বিভাগ। এ প্রসঙ্গে গাজীপুরে বিদ্যুৎ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান পল্লী বিদ্যুতের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) যুবরাজ চন্দ্র পাল বলেন, কয়েক মাস আগে লোডশেডিংয়ের যে তালিকা তৈরি করা হয়েছিল, সে অনুযায়ী বিদ্যুৎ না পাওয়ায় শিডিউল মানা যাচ্ছে না। অনেক সময় একটু বেশিই লোডশেডিং দিতে হচ্ছে। গ্রাম ও শহরের ক্ষেত্রে একই নিয়ম মানা হচ্ছে। এক মাসের মধ্যে বিদ্যুতের অবস্থা উন্নতি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে তিনি জানিয়েছেন।
শ্যামপুরের ব্যবসায়ী অশিষ কুমার বলেন, আমার দোকানে দুটি ফ্রিজ আছে। আইসক্রিম, দধি, রসমালাইসহ কোমালপানীয় বিক্রি করতাম। কিন্তু দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় দোকানে এখন আইসক্রিম বিক্রি করা বন্ধ করে দিয়েছি। চলমান লোডশেডিং পরিস্থিতিতে সব চেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়েছে ছোট খাটো উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীরা। এতে শিল্পকারখানা, আইস ব্যবসায়ী, মিলকারখানাসহ বিদ্যুৎচালিত সব কিছুতেই প্রভাব ফেলেছে।
বিশ্ব ব্যাংকের ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলো অব্যবহূত রয়েছে। বাসা-বাড়ি, অফিস ও কল-কারখানায় ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের কারণে বাংলাদেশের বছরে প্রায় ৩৩০ কোটি ডলারের ক্ষতি হয়ে থাকে। বিদ্যুৎ উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য সফলতা অর্জনের পরও বাংলাদেশে বিদ্যুৎ বিপর্যয় নিয়মিত ঘটনা। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দাবি, প্রতি বছর গড়ে ৪ শতাধিক ঘূর্ণিঝড়ের কারণে এসব বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের ঘটনা ঘটে থাকে। যদিও বাংলাদেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ২৩ হাজার মেগাওয়াটের বেশি। এ বিষয়ে এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জ্বালানি ঘাটতি, দুর্বল ট্রান্সমিশন ব্যবস্থার কারণে এর ব্যবহার ৫০ শতাংশের নিচে। বিশ্ব ব্যাংকের ফার্স্ট গ্রিন অ্যান্ড ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্ট ডেভেলপমেন্ট ক্রেডিটের অধীনে এই প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে। যার অধীনে বাংলাদেশ ৫০ মিলিয়ন ডলার ঋণ পেয়েছে।
উল্লেখ্য, গত মাসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিশ্ব ব্যাংকের সদর দপ্তরে যাওয়ার সময় এ ঋণ অনুমোদন করা হয়। গ্যাস-কয়লা সংকটে বন্ধ হয়ে গেছে বেশির ভাগ গ্যাস ও কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র। জ্বালানিসংকটে কমেছে ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদনও। এতে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশেই ব্যাপক হারে লোডশেডিং হচ্ছে। গত রোববারও সারা দেশে প্রায় তিন হাজার মেগাওয়াট লোডশেডিং করতে হয় বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানিগুলোকে।
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় গতকাল দিন-রাত মিলিয়ে তিন থেকে পাঁচ ঘণ্টা করে লোডশেডিং হয়। গ্রামাঞ্চলের অবস্থা আরও খারাপ। বিঘ্নিত হচ্ছে জনজীবন। বিপিডিবির কর্মকর্তারা বলছেন, ২৭ মে এর আগে লোডশেডিং পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার সুযোগ নেই। সূত্র মতে, ঘূর্ণিঝড় মোকার প্রভাবে কক্সবাজারের মহেশখালীর দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বন্ধ রাখা হয়। এতে গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়ায় চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ হয়ে যায়। দুটি টার্মিনাল থেকে এলএনজি সরবরাহ শুরু হলেও বন্ধ থাকা গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে সরবরাহ বাড়েনি। ফলে বেশির ভাগ গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্র এখনো চালু করতে পারেনি বিপিডিবি। এতে লোডশেডিং পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে না। জানতে চাইলে বিপিডিবির সদস্য (উৎপাদন) এস এম ওয়াজেদ আলী সরদার গতকাল বলেন, ‘বেশির ভাগ গ্যাসচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র আমরা এখনো চালু করতে পারিনি। যার কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন কম হচ্ছে। ফার্নেস অয়েল বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো থেকেও উৎপাদন কমেছে। এতে তিন হাজার মেগাওয়াটের মতো লোডশেডিং হচ্ছে। ২৭ মে পর্যন্ত এ পরিস্থিতি থাকতে পারে। রাজধানী ঢাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহে নিয়োজিত দুটি প্রতিষ্ঠান ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ডিপিডিসি) ও ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি (ডেসকো)। সামপ্রতিক সময়ে লোডশেডিংয়ের বিষয়টি স্বীকার করে ডিপিডিসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) বিকাশ দেওয়ান গত এক দিনের লোডশেডিংয়ের তথ্য জানান। তিনি বলেন, আমাদের বিতরণ এলাকায় দিনের বেলা গত রোববার চাহিদা ছিল এক হাজার ৯০০ মেগাওয়াটের কিছু বেশি। চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ না পাওয়ায় প্রায় ৪৫০ মেগাওয়াটের মতো লোডশেডিং করতে হয়েছে।
ডেসকোর এমডি মো. কাওসার আমীর আলী বলেন, গত রোববার আমাদের বিতরণ এলাকায় দিনের বেলা ঘাটতি ছিল ১০০ থেকে ২০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত। চাহিদা ছিল এক হাজার ১০০ থেকে এক হাজার ১৫০ মেগাওয়াট।
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন