জ্বালানি সংকটে ধুঁকছে দেশ। তেল, গ্যাস ও কয়লার অভাবে ব্যাহত হচ্ছে বিদ্যুৎ উৎপাদন। একে একে বন্ধ হচ্ছে বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্র। ফলে দেশে গরমের সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে লোডশেডিং। জ্বালানির অভাবে বড় ক্ষতির মুখোমুখি শিল্প উৎপাদন ও ব্যবসাকেন্দ্র। এত কিছুর মধ্যে প্রস্তাবিত বাজেট ২০২৩-২৪ ঘোষণা করা হয়। এতে বরাদ্দ কমানো হয় জ্বালানি খাতে। তবে বেড়েছি বিদ্যুৎ খাতের বরাদ্দ।
গ্যাস, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি ও কয়লার বিল বকেয়াসহ নানা সংকটে দেশের জ্বালানি খাত। এমন পরিস্থিতিতেও প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটে গুরুত্বপূর্ণ এ খাতটি উপেক্ষিত। বিশেষত বিদ্যুতের তুলনায় যৎসামান্য বাজেট রাখা হয়েছে জ্বালানি বিভাগে। আগামী ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশের জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের জন্য বরাদ্দ প্রস্তাব করা হয়েছে ৯১১ কোটি টাকা, যা উন্নয়ন বাজেটের মাত্র দশমিক ৩ শতাংশ। চলতি অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দ রয়েছে এক হাজার ৭৯৮ কোটি টাকা। আগামী অর্থবছরের বাজেটে জ্বালানি খাতে বরাদ্দ কমছে ৯৩১ কোটি টাকা। যা চলতি অর্থ বছরের প্রায় অর্ধেক। এবার প্রস্তাবিত বাজেটে জ্বালানি খাতের উন্নয়নে মাত্র ৯১১ কোটি টাকা বরাদ্দে রাখা হয়েছে। অথচ চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে বরাদ্দ রয়েছে এক হাজার ৮৪২ কোটি টাকা। তবে বিদ্যুতের উন্নয়ন বাজেট প্রস্তাব করা হয়েছে ৩৩ হাজার ৭৭৫ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে বরাদ্দ ২৫ হাজার ২৪৭ কোটি টাকা। জ্বালানি খাত-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গ্যাস সংকটে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে শিল্প উৎপাদন। ডলার সংকটে গ্যাস-কয়লা আমদানি বন্ধ থাকছে। সংকট সামলাতে বিশেষজ্ঞরা দশে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে জোর দিতে বলছেন। তবে বরাবরের মতো বাজেটে অবহেলিত থাকছে জ্বালানি খাত। সরকার দেশের জ্বালানি খাত নিয়ে যে ধরনের পরিকল্পনা করছে, সেখানে বিনিয়োগ প্রয়োজন। বিশেষত স্থানীয় গ্যাস অনুসন্ধান, পাইপলাইনের আধুনিকায়ন, প্রযুক্তিনির্ভর সরবরাহ ব্যবস্থাপনাসহ নানা উন্নয়নমূলক কাজ করতে হবে। তবে জ্বালানি খাতের বরাদ্দ দেখে মনে হয় না এখানে নতুন কোনো প্রকল্প কিংবা বড় আকারের বিনিয়োগ পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। বরং আমদানি-নির্ভরতায় বেশি প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে বলেই এ বরাদ্দ থেকে উপলব্ধি করা যায়। এদিকে দেশে গ্যাস, কয়লার সংকটের কারণে বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। এ কারণে রাজধানীসহ সারা দেশে ব্যাপক হারে লোডশেডিং বেড়েছে। অন্যদিকে জ্বালানি তেলে উৎপাদন খরচ বেশি হওয়ায় এসব কেন্দ্র থেকেও পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে না। এ ছাড়া কয়লার বিল বকেয়াসহ আমদানি সংকটে বন্ধের উপক্রম দেশের বৃহৎ পায়রা তাপবিদ্যুকেন্দ্র। স্থানীয় কয়লা উত্তোলন নিয়ে সরকারের পরিকল্পনা থাকলেও সেখানে বিপুল বিনিয়োগের কারণে স্থানীয় কয়লা উত্তোলন করা যাচ্ছে না বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
জ্বালানি বিভাগের তথ্যানুযায়ী, ২০২৫ সালের মধ্যে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানোর জন্য ৪৬টি কূপ খননের পরিকল্পনা করেছে সরকার। এসব কূপ থেকে গ্যাস মিললে জাতীয় গ্রিডে ৬১৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস যুক্ত হওয়ার কথা। বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেন, ভোলা জেলার ইলিশা গ্যাস ক্ষেত্রে প্রায় ২০০ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের মজুত আবিষ্কার হয়েছে। গ্যাসের উৎপাদন বর্তমান সরকারের ক্ষমতা গ্রহণের প্রাক্কালে ছিল দৈনিক এক হাজার ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট, যা বর্তমানে দৈনিক প্রায় দুই হাজার ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুটে উন্নীত হয়েছে। এ ছাড়া ডিসেম্বর ২০২৪ সালের মধ্যে আরো ৪৬টি কূপ খনন করে জাতীয় গ্রিডে ৬১৮ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। সমুদ্র অঞ্চলে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের কাজ চলমান। এ কাজে বিপুল বিনিয়োগ প্রয়োজন হয় বিধায় এ খাতে বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ করার জন্য আমরা প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিচ্ছি।
গ্যাস উৎপাদন ও আমদানির কথা জানিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, গ্যাস উৎপাদন ও আমদানির সঙ্গে সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য ২০০৯ সাল থেকে এ পর্যন্ত এক হাজার ১৫৮ কিলোমিটার পাইপলাইন নির্মাণ করা হয়েছে। বর্তমানে দেশের উত্তরাঞ্চলে ১৫০ কিলোমিটার এবং দেশের অন্যান্য এলাকায় ৬৪ কিলোমিটার পাইপলাইন নির্মাণের কাজ চলমান। এ ছাড়া ২০২৬ সালের মধ্যে পায়রা ও ভোলা থেকে গ্যাস সঞ্চালনে ৪২৫ কিলোমিটার লাইন নির্মাণের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। এদিকে আগামী ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতে বরাদ্দের সুপারিশ করা হয়েছে ৩৩ হাজার ৭৭৫ কোটি টাকা, যা মোট বাজেটের ১২ দশমিক ৮ শতাংশ। চলতি অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দ রয়েছে ২৪ হাজার ১৩৯ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের তুলনায় নতুন অর্থবছরে বরাদ্দ বেড়েছে ৯ হাজার ৬৩৬ কোটি টাকা বেশি। যদিও চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে বিদ্যুৎ খাতের বরাদ্দ এক হাজার ১০৮ কোটি বাড়িয়ে ২৫ হাজার ২৪৭ কোটি টাকা করা হয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকার ইচ্ছা করেই দেশে জ্বালানি খাতের উন্নয়ন চায় না। তারা চায় না দেশীয় গ্যাস উত্তোলন বা উন্নয়ন। এলএনজি আমদানি করলে অনেকের পকেটে টাকা যায়। সুবিধা ভোগ করে বহু লোক।
কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সিনিয়র সহসভাপতি ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক এম শামসুল আলম বলেন, ‘দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন কমলে এলএনজি আমদানির সুযোগ বাড়ে। এতে অনেকে কমিশন পান। তাই জ্বালানির অনুসন্ধানে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ হয় না। কিন্তু এলএনজিতে ঠিকই হাজার হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দেয়া হচ্ছে।’
এ বিষয়ে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম বলেন, ‘এবার বিদ্যুতের তুলনায় জ্বালানি খাতে বরাদ্দ অনেক কম। জ্বালানি বিভাগের চাহিদার ওপর নির্ভর করবে তাদের কী পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন। এ নিয়ে বিগত বছরগুলোয় তাদের তরফ থেকে কোনো অভিযোগ দেখি না। তবে জ্বালানি বিভাগ ২০২৫ সাল পর্যন্ত গ্যাস সরবরাহ বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে, সেখানে অর্থের প্রয়োজন। নানা ধরনের যন্ত্রপাতি কেনার ব্যাপার আছে। এ ছাড়া নতুন প্রকল্পের জন্যও অর্থের প্রয়োজন। তবে তাদের বাজেট দেখে মনে হয় না, এ অর্থবছরে নতুন কোনো প্রকল্প কিংবা সে ধরনের কোনো উদ্যোগ রয়েছে। থাকলে বাজেটে তার প্রতিফলন দেখা যেত।
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন