হাইওয়ে পুলিশ আর প্রশাসনের নজরদারির অভাবে যাত্রাবাড়ী-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়েতে ঘটছে একের পর এক দুর্ঘটনা। এই মহাসড়কে ঘণ্টায় সর্বোচ্চ গতিসীমা ৮০ কিলোমিটার থাকলেও অনেক চালকই তা মানছেন না। নিয়ম না মানায় এবং হাইওয়ে পুলিশের কঠোর নজরদারির অভাবে ঘটছে দুর্ঘটনা, প্রাণ হারাচ্ছে মানুষ। ঈদযাত্রায় বেশি ট্রিপের আশায় বিশেষত বাস চালকরাও প্রতিযোগিতা করে গাড়ি চালাতে শুরু করেছে। এ ছাড়া অন্যান্য যানবাহনও ভিন্ন ভিন্ন অজুহাতে অনিয়ন্ত্রিত গতিতে গাড়ি চালাচ্ছে। অ্যাম্বুলেন্সও এর বাইরে নয়।
গতির তোপে চুল পরিমাণ সমস্যাতেই ঘটছে বড় ধরনের দুর্ঘটনা। এতে ক্ষুব্ধ যাত্রী, এলাকাবাসী ও নাগরিকসমাজ। গতকালও রোগী ও রোগীর স্বজনবাহী বরিশালগামী বেপরোয়া গতির একটি অ্যাম্বুলেন্সের সিলিন্ডার বিস্ফোরণে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটে। ঘটনাস্থলেই অ্যাম্বুলেন্সে থাকা সাতজনের মৃত্যু হয়। প্রত্যেকেই পুড়ে ছাই হয়ে যায় বলে বলছেন প্রত্যক্ষদর্শীরা। আর এর জন্য দায়ী করা হচ্ছে মোটরসাইকেলকে। মোটরসাইকেলের কারণেই নাকি অ্যাম্বুলেন্স চালক গাড়ির নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন— এমনটিও জানা গেছে। একভাবেই এর আগেও দুর্ঘটনা ঘটেছে এই মহাসড়কে। সেটিও ঘটেছিল বেপরোয়া গতি ও চালকের বশ্রামহীনতার জন্য। ইমাদ পরিবহনের সেই দুর্ঘটনায় অন্তত ২০ জন মানুষের মৃত্যু হয়। এভাবে ঢাকা-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়েতে মৃত্যুর ঘটনা বেড়েই চলেছে। অথচ ২০২০ সালে আধুনিক এই মহাসড়কটি মানুষের জন্য আশীর্বাদরূপে চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। দুর্ঘটনা এড়ানোর বিভিন্ন ইস্যুতে সরকারের নীরবতায় দিনে দিনে মহাসড়কটি যেন এখন অভিশাপে রূপ নিচ্ছে।
যদিও হাইওয়ে পুলিশ বলছে, সড়কে গতি ও দুর্ঘটনা কমাতে চালকদের জরিমানার মাধ্যমে আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। তবুও সচেতন হচ্ছেন না চালকরা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানো, নিয়ম ভঙ্গ করে ওভারলোডিং ও ওভারটেকিং করার প্রবণতা, চালকদের দীর্ঘক্ষণ বিরামহীনভাবে গাড়ি চালানো, ট্রাফিক আইন যথাযথভাবে অনুসরণ না করা, আনফিট গাড়ি চলাচল বন্ধে আইনের যথাযথ প্রয়োগের অভাবে দুর্ঘটনা ঘটছে। এ ছাড়া রয়েছে লাইসেন্সবিহীন চালকদের বেপরোয়া মানসিকতা। এ ক্ষেত্রে পুলিশকে আরও যত্নবান হওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন কেউ কেউ। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান সাইদুর রহমান বলেন, ‘যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। সড়কে আধুনিক প্রযুক্তি বসিয়ে মনিটরিং জোরদার করলে দুর্ঘটনা কমে আসবে। যানবাহনের সর্বোচ্চ গতিসীমা ৮০ কিলোমিটার নির্ধারণ করা আছে। তবে সড়ক পরিবহন আইনে বিভিন্ন শ্রেণির মহাসড়কে আলাদা গতিসীমা নির্ধারণ করার কথা বলা থাকলেও সেটি বাস্তবায়ন করা হয়নি।
জানা গেছে, দক্ষিণাঞ্চলের ২১ জেলার মানুষের যাতায়াতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে রাজধানীর যাত্রাবাড়ী থেকে ফরিদপুরের ভাঙ্গা পর্যন্ত ৫৫ কিলোমিটার সড়কে নির্মাণ করা হয় হাইওয়ে এক্সপ্রেসওয়ে। ১১ হাজার তিন কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হাইওয়ে এক্সপ্রেসওয়েটি ২০২০ সালের ১২ মার্চ জনসাধারণের জন্য খুলে দেয়া হয়। এতে স্বাচ্ছন্দ্যে চলাচল করতে পারছেন যাত্রীরা। কিন্তু এই মহাসড়কে সব ধরনের যানবাহনের জন্য সর্বোচ্চ গতিসীমা নির্ধারণ করা হয় ঘণ্টায় ৮০ কিলোমিটার। অথচ আইনকে অমান্য করে ৯০ থেকে ১৪০ কিলোমিটার বেগে চলছে অধিকাংশ গাড়ি। এতে প্রায়ই দুর্ঘটনায় প্রাণ হারাচ্ছে মানুষ।
সর্বশেষ গতকাল ঢাকা থেকে রোগী ও তাদের স্বজনদের নিয়ে একটি অ্যাম্বুলেন্স বরিশালের দিকে যাওয়ার পথে বেলা পৌনে ১২টার দিকে ভাঙার মালিগ্রামে পৌঁছালে অ্যাম্বুলেন্সের সামনের চাকা ফেটে যায়। এ সময় অ্যাম্বুলেন্সটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সড়কের পাশের রেলিংয়ে ধাক্কা লেগে আগুন ধরে যায়। আগুনে দগ্ধ হয়ে অ্যাম্বুলেন্সের সাত যাত্রী মারা যান। আহত হয়েছেন অ্যাম্বুলেন্সের চালক। আহতাবস্থায় তিনি জানিয়েছিলেন, পাঁচটি মোটরসাইকেল তার সামনে, পাশে এলোমেলোভাবে চলছিল। ওই সময়ই তিনি তার গাড়ির নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন এবং রেলিংয়ের সঙ্গে ধাক্কা লেগে আগুন লেগে যায়। অবশ্য কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে তিনি মারা যান। তার মৃত্যু এ ঘটনায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় আটজনে। এর মধ্যে তিনজন নারী, দুই পুরুষ ও দুটি শিশুও রয়েছে। এর আগে শিবচরের কুতুবপুরে ইমাদ পরিবহনের আলোচিত দুর্ঘটনায় মারা যান অন্তত ২০ জন। এ ছাড়া গত তিন বছরে এই মহাসড়কের মাদারীপুর অংশের বিভিন্নস্থানে দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ৬০ জনের বেশি মানুষ।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আধুনিক এই মহাসড়কে সব পরিবহনের গতি আরও কমাতে হবে। গাড়িতে বেশি গতি থাকলে দুর্ঘটনার শঙ্কাও বেশি থাকে। এ ব্যাপারে চালক ও যাত্রী উভয়কে আরও বেশি সচেতন হওয়ার পাশাপাশি চালকদের প্রশিক্ষণের আওতায় আনতে হবে। মূলত পরিবহন চালকদের একাধিক ট্রিপের প্রতিযোগিতা আর পর্যাপ্ত বিশ্রামের অভাব দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। বাস মালিকরা চালকদের বিশ্রামের ব্যবস্থা করলে চালকদের ক্লান্তি দূর হবে। তাহলে দুর্ঘটনা অনেকাংশেই কমে আসবে।
হাইওয়ে পুলিশের কর্মকর্তারা বলছেন, সড়কে যানবাহনের গতি কমাতে বসানো হয়েছে চেকপোস্ট। নিয়মিত হাইওয়ে এক্সপ্রেসের বিভিন্ন স্থানে এই কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
জানা গেছে, গত তিন বছরে শুধ শিবচর হাইওয়ে পুলিশ মামলা দিয়েছে তিন হাজার ৭০০টি। তারপরও চালকদের অসাবধানতায় মহাসড়কে গতি কমছে না। ফলে দুর্ঘটনায় মানুষের প্রাণহানি হচ্ছে। পরিবহন শ্রমিক নেতা হানিফ খোকন বলেন, ‘এ ধরনের মহাসড়কে চলাচল উপযোগী যানবাহন সংকট রয়েছে। সংকট রয়েছে এ ধরনের মহাসড়কে চলাচলের মনমানসিকতাসম্পন্ন চালকেরও। তবে আশাবাদ ব্যক্ত করে তিনি বলেন, কিছু দিন এমন হলেও পরবর্তী সময়ে এসব কেটে যাবে। আমরা এক্সপ্রেসওয়ের সঙ্গে মানানসই হয়ে চলতে পারব।’
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন