রাজনীতির মাঠে বিদেশি খেলোয়াড়
- অতীতে সংলাপ-সমঝোতা ব্যর্থ সবার দৃষ্টি পরাশক্তি সমাধানে
- তৃতীয় মেয়াদে পররাষ্ট্রনীতি চ্যালেঞ্জে আ.লীগ, সুযোগ নিচ্ছে বিএনপি
- এবার বিদেশি প্রভাবে গুরুত্ব হারিয়েছে দেশীয় রাজনৈতিক কর্মসূচি
- যুক্তরাষ্ট্র ও মিত্ররা সরকারকে চাপ দিচ্ছে বিপক্ষে ভূমিকা রাখছে চীন-রাশিয়া
জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে চলছে বিএনপির তারুণ্য সমাবেশ ও আওয়ামী লীগের তারুণ্যের জয়যাত্রা। গতকাল দুই কিলোমিটারের ব্যবধানে একই সময়ে পালটাপালটি সমাবেশ করেছে বিএনপির সহযোগী তিন সংগঠন যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও ছাত্রদল এবং ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠন যুবলীগ। সিলেটের আলিয়ার মাঠের সমাবেশে প্রধান অতিথি ছিলেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। আর সিলেট মহানগরের রেজিস্টারি মাঠে প্রধান অতিথি ছিলেন যুবলীগের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল। ১২ জুলাই ঢাকা থেকে কর্মসূচি আসবে, আন্দোলনে নতুন মাত্রা যোগ হবে বলে সমাবেশে জানান মির্জা ফখরুল।
অন্যদিকে মাইনুল নিখিল বলেছেন, ক্ষমতার লোভে উন্মত্ত বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে অপপ্রচারে লিপ্ত। তারা যেনতেন প্রকারে ক্ষমতায় যেতে চায় বলে বিদেশিদের কাছে দেশের ভাবমূর্তি ধ্বংসের অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। জনগণকে নিয়ে তারা এই ষড়যন্ত্রের মোকাবিলা করারও ঘোষণা দেন। বেলাশেষে রাজনৈতিক উত্তেজনার এমন সমাবেশও নিরুত্তাপ হয়ে যাচ্ছে দেশের রাজনীতির মাঠে বিদেশি খেলোয়াড়ের পদচারণায়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো কী কর্মসূচি দিচ্ছে তা নিয়ে তেমন মানুষের আলোচনা নেই। বিদেশিরা কে কী বলছে এ নিয়েই মানুষ জানতে চাচ্ছে বেশি। আর রাজনীতির মাঠ বাংলাদেশের হলেও সব খেলোয়াড় বিদেশি হওয়ায় এবার দেশের জনগণের চোখ পরাশক্তিপাড়ার দিকে। অতীতে দেশীয় খেলার মাঠে কোনো ফলাফলই সন্তোষজনক হয়নি। তাই এবার দৃষ্টি পরাশক্তির দিকে।
সম্প্রতি বিএনপির শীর্ষ নেতা সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স বলেছেন, ‘বাংলাদেশ বৃহৎ শক্তিগুলোর খেলার মাঠে পরিণত হয়েছে। এটি ব্যাটেল গ্রাউন্ড হয়ে যেতে পারে। বাংলাদেশ ক্রসফায়ারে পড়ে যেতে পারে। এর জন্য দায়ী বর্তমান সরকার। অন্যদিকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন বলেছেন, ‘অতি সন্নাসীতে গাজন নষ্ট। বিদেশিদের কেউ কেউ পর্যবেক্ষণের নামে নির্বাচন বানচাল করার চেষ্টা করবে। সেটি যদি করেন, তাহলে দেশের অমঙ্গল ডেকে আনবেন। আপনাদের, আমাদের সবার জন্য অমঙ্গল ডেকে আনবে। সে ব্যাপারে আপনারা সজাগ থাকবেন, নির্বাচনি প্রক্রিয়া যাতে তারা ধ্বংস না করে।’ পররাষ্ট্র বিশ্লেষকরা বলছেন, আওয়ামী লীগ সরকার তৃতীয় মেয়াদে এসে পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। অন্যদিকে বিএনপির সেটির সুযোগ নিয়ে রাজনীতিতে এগিয়ে যেতে চাইছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন , বাংলাদেশে আগামী নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ করার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও মিত্ররা যে চাপ দিচ্ছে তা সহজ করতে ভূমিকা রাখছে চীন-রাশিয়া অক্ষশক্তি। তারা প্রকাশ্যে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে বক্তব্য বিবৃতি দিচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশ তার গোটা অর্থনীতির অস্তিত্বের জন্যই যুক্তরাষ্ট্র ও মিত্রদের ওপর নির্ভরশীল। যুক্তরাষ্ট্র ও তার ইউরোপীয় মিত্ররা বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের বৃহত্তম অংশ আমদানি করে। শুধু এই একটি পণ্য রপ্তানি বন্ধ হলে বাংলাদেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড ভেঙে খান খান হয়ে যেতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের ধারণা, বাংলাদেশের বর্তমান সরকার বিগত বছরগুলোতে চীনের দিকে ঝুঁকে থাকার নীতি অবলম্বন করেছে। সে কারণে নিজেদের প্রভাব সুসংহত করতে যুক্তরাষ্ট্রকে এ দেশের আসন্ন নির্বাচনকে একটি সুযোগ হিসেবে নিতে হচ্ছে। কূটনৈতিক চাপের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র এই সুযোগ কাজে লাগাতে চায় পুরোপুরি। আর বাংলাদেশ এই চাপ অগ্রাহ্য করার নানা কৌশল খুঁজছে, বিশেষ করে প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে গভীর সম্পর্কের সূত্রে। অনেকেই মনে করছেন, গত ১৫ বছরে চীন বাংলাদেশের অর্থনীতিতে অনেকটা জাঁকিয়ে বসতে সক্ষম হয়েছে। চীন বাংলাদেশের পণ্য আমদানির সবচেয়ে বড় উৎস। বাংলাদেশের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে বাণিজ্যিক সুদে প্রচুর লগ্নি করেছে চীন। আবার অতিমূল্যায়িত অধিকাংশ মেগা প্রকল্পে ঠিকাদারি করে চীনা কোম্পানিগুলো বিপুল মুনাফা অর্জন করছে। সীমান্ত এবং ভারত মহাসাগরে আধিপত্য নিয়ে ভারতের সঙ্গে চীনের বৈরী সম্পর্ক বিদ্যমান। তাই স্পষ্টতই ভারত চাইছে সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে বাংলাদেশের ওপর চাপ প্রয়োগে যুক্তরাষ্ট্র বিরত থাকুক। দেখা যাচ্ছে রোহিঙ্গা সমস্যার মতোই, নির্বাচন নিয়েও চিরশত্রু ভারত ও চীনের স্বার্থ অনেকটাই এক হয়ে গেছে বলেও কেউ কেউ বলছেন।
সব কিছুর ঘোলাজল সমাধানে দৃষ্টি এখন জুলাইয়ে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) নির্বাচন বিষয়ক ছয় সদস্যের তথ্যানুসন্ধানী মিশন ১৬ দিনের সফরে ঢাকা আসছেন। এদের মধ্যে দুজন শনিবার সন্ধ্যায় ঢাকায় পৌঁছেছেন। বাকি চারজন গতকাল রোববার এসেছেন। তাদের সঙ্গে আওয়ামী লীগ বিএনপি ও রাষ্ট্রীয় নির্বাচন পরিচালনা সংস্থাগুলোর সঙ্গে বৈঠক হবে। এ ছাড়া আগামী ১১ জুলাই চার দিনের সফরে বাংলাদেশে আসছেন যুক্তরাষ্ট্রের বেসামরিক নিরাপত্তা, গণতন্ত্র ও মানবাধিকারবিষয়ক মার্কিন আন্ডার সেক্রেটারি উজরা জেয়া। প্রতিনিধি দলে দেশটির দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া-বিষয়ক সহকারী মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডোনাল্ড লুর নামও রয়েছে। পরাশক্তির এমন হস্তক্ষেপে দেশের ভেতরে রাজনৈতিক কর্মসূচিগুলোও এখন প্রায় গুরুত্বহীন হয়ে পড়েছে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। বিদেশি সমাধান কী আসছে এখন সে দিকেই সবার নজর। অতীতে সংলাপ সমঝোতা ব্যর্থ হওয়ায় দেশীয় ইস্যু এখন অনেকটাই গুরুত্ব হারিয়েছে।
সাবেক রাষ্ট্রদূত মেজর জেনারেল (অব.) শহীদুল হক আমার সংবাদকে বলেন, বাংলাদেশের ব্যাপারে ভারতের ভূমিকা অনেকটাই জানা। আর চীন হচ্ছে তার ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান থেকে কথা বলে। ইউরোপ এবং যুক্তরাজ্যের কথায় মার্কিন নীতির প্রতিফলন আছে। তারাও বাংলাদেশে সুষ্ঠু নির্বাচন চায়। এ নিয়ে দেশের মধ্যে যে পরাশক্তির যুদ্ধ চলছে সেটি এখন স্পষ্ট। সাবেক পররাষ্ট্রসচিব মো. তৌহিদ হোসেন আমার সংবাদকে বলেন, আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দেখা দিয়েছে আঞ্চলিক ভূরাজনীতি। বাংলাদেশ ঘিরে যে আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক খেলা চলছে, তাতে জড়িত তিনটি বৃহৎ শক্তি যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ভারত। যুক্তরাষ্ট্র স্বাভাবিকভাবেই চায় যে বাংলাদেশ চীনের প্রভাব থেকে বেরিয়ে আসুক। যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্যাসিফিক রণকৌশল এবং কোয়াড সংগঠন চীনের প্রভাবকে সীমিত করার লক্ষ্যেই সৃষ্ট। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের শেষ সময় থেকেই যুক্তরাষ্ট্র চাইছে বাংলাদেশ এই রণকৌশলে যুক্ত হোক। বাইডেন আমলেও এই প্রয়াস অব্যাহত। নির্বাচনের এখনো মাস কয়েক বাকি। এর মধ্যে জটিলতাগুলো সমাধানের চেষ্টা চলছে।
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন