- পাবলিক টয়লেটের সংখ্যা অপ্রতুল
- পরিবেশের ওপর পড়ছে বিরূপ প্রভাব
- টাকার বিনিময়ে ব্যবহারে আগ্রহ নেই
- এখনই সমস্যা সমাধানের তাগিদ বিশেষজ্ঞদের
পাবলিক টয়লেটের সংকট ও টাকার জন্য চাপাচাপির জেরে ব্যবহারে অনীহায় হুমকির মুখে পড়ছে জনস্বাস্থ্য। দুই কোটি মানুষের ঢাকায় গণশৌচাগার রয়েছে মাত্র ১৬৭টি, যা জনসংখ্যার তুলনায় অনেকটাই কম। যে কারণে ঢাকার যত্রতত্র চলছে মলমূত্র ত্যাগ। দূষণের তালিকায় সেরা ঢাকায় উন্মুক্ত স্থানে মলমূত্র ত্যাগের বিষয়টি দৃষ্টিকটু দেখালেও যেন স্বাভাবিক নিয়মে পরিণত হয়েছে। অথচ সরকার জনস্বাস্থ্য বিষয়ে দেশব্যাপী বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশের নাগরিকদের সচেতন করার জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণের পরও পাবলিক টয়লেট সংকটে জনস্বাস্থ্য বিষয়ে সাফল্য পরিপূর্ণতা পাচ্ছে না। সরকারি বিভিন্ন উদ্যোগের কারণে এখন আর অতীতের মতো খোলা জায়গায় মলত্যাগ করছে না অজপাড়াগাঁওয়ের মানুষরাও।
যদিও শহরে এ সমস্যা প্রকট নয়, তবুও খোলা জায়গায় মূত্রত্যাগের বিষয়টি এখন প্রকট হয়ে দাঁড়িয়েছে— যা জনস্বাস্থ্যের জন্যও মারাত্মক হুমকি বয়ে আছে। খোলা জায়গায় মূত্রত্যাগের এ ঘটনায় দৈনন্দিন বিপাকে পড়তে হচ্ছে শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে সাংবাদিক, বেসরকারি কর্মজীবী ও সরকারি কর্মকর্তারাও। নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, স্বাস্থ্যসম্মত পাবলিক টয়লেটের প্রয়োজনীয়তা বুঝতে ব্যর্থ হচ্ছেন জনপ্রতিনিধিরা। এই দায় স্থানীয় সরকার বিভাগও এড়াতে পারে না।
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সরেজমিনে দেখা গেছে, ঢাকার প্রবেশপথ হানিফ ফ্লাইওভার। ফ্লাইওভারটির প্রতিটি পিলারের নিচে যেন মলমূত্র ত্যাগের উৎসব চলছে। চারদিকে দুর্গন্ধ আর নোংরা পরিবেশ। পাশ দিয়ে যারা হেঁটে যাচ্ছেন, তারাও নাক চেপে কোনোরকম হেঁটে যাচ্ছেন। মলমূত্র থেকে বাতাসে ছড়াচ্ছে জীবাণু, যা জনস্বাস্থ্যকে ফেলছে হুমকির মুখে। রাজধানীর ব্যস্ততম এলাকা গুলিস্তান। প্রতিদিন বহু মানুষ এখানে আসে নানান কাজে। এখানে এসে কারো মলমূত্র ত্যাগ করার প্রয়োজন হলে কোথায় করবেন তিনি জানেন না। কারণ, এখানে নেই পর্যাপ্ত পাবলিক টয়লেটে। যার কারণে কোনো দেয়ালের পাশে বা নির্মাণাধীন কোনো ভবনের পাশে মলমূত্র ত্যাগ করতে দেখা যায় অনেককেই। তথ্য বলছে, প্রায় দুই কোটি মানুষের রাজধানী শহরে পাবলিক টয়লেট আছে মাত্র ১৬৭টি, যা চাহিদার জন্য খুবই কম। এর মধ্যে সংস্কার ও পরিচ্ছন্ন না হওয়ায় বন্ধ থাকছে কয়েকটি। এসব টয়লেটে প্রশ্রাব করলে পাঁচ টাকা এবং মলত্যাগ করলে ১০ টাকা লাগে। এজন্য অনেক মানুষ এই টাকার কারণে সিটি কর্পোরেশনের এসব টয়লেটে না গিয়ে যত্রতত্র মলমূত্র ত্যাগ করছে।
সচিবালয়ের দক্ষিণ পাশের ওসমানী উদ্যানের ভেতর এবং বিদ্যুৎ ভবনের বিপরীতে মানুষ মলমূত্র ত্যাগ করছে। এ এলাকা দিয়ে যাতায়াতকারী পথচারীরা নাক বন্ধ করে চলাচলের চেষ্টা করেন। জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে আন্দোলনকারীদের অনেকে এবং সচিবালয়ের আশেপাশে যারা কাজ করতে আসেন, তারা উপায় না পেয়ে আশেপাশে খোলা যায়গায় মূত্র ত্যাগ করেন। এলাকাটিতে কোনো পাবলিক টয়লেট নেই। গুলিস্তান এলাকায় দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের কয়েকটি পাবলিক টয়লেট থাকলেও সেখানে অনেক মানুষ না গিয়ে মূত্রত্যাগের জন্য খোলা স্থান ব্যবহার করছে।
রাজধানীতে কম-বেশি ৬২ লাখ মানুষের গণশৌচাগার ব্যবহারের চাহিদা রয়েছে। এ চাহিদা মেটাতে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন ভ্রাম্যমাণ শৌচাগারের ব্যবস্থা করেছে। শৌচাগার পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন না থাকায় অনেকেই তা ব্যবহার করছেন না। এখন ভ্রাম্যমাণ গণশৌচাগারের সংখ্যা কমে গেছে। গণশৌচাগার স্থাপন করার মতো প্রয়োজনীয় জায়গা বা অবকাঠামোগত ব্যবস্থাও এখন তেমন নেই। রাজধানীর একটি প্রাইভেট কোম্পানিতে কাজ করেন তানজিলা। তার সঙ্গে রাজধানীর পাবলিক টয়লেট ব্যবস্থা নিয়ে কথা হয় আমার সংবাদ প্রতিনিধির।
তিনি বলেন, হঠাৎ করে চলতি পথে বাথরুম ব্যবহার করার প্রয়োজন পড়লে কোথায় যাব, তা নিয়ে পড়ি বিব্রতকর পরিস্থিতিতে। পাবলিক টয়লেট যেগুলো আছে, সেগুলো ব্যবহারের উপযোগী নয়। রাসেল আহমেদ পড়ছেন একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে।
তিনি আমার সংবাদকে বলেন, দীর্ঘ জ্যামের কারণে অনেক সময় রাস্তায় ওয়াশরুম ব্যবহারের প্রয়োজন পড়ে। মলমূত্র ত্যাগের জন্য পাবলিক টয়লেট খুঁজে পাওয়া দুষ্কর হয়ে দাঁড়ায়। আমার সংবাদের কথা হয় রাজধানীর ফল বিক্রেতা খোকনের সঙ্গে। তিনি বলেন, পাবলিক টয়লেট ব্যবহার করতে এখন ১০ টাকা লাগে। এ কারণে যাই না। প্রশ্রাব করতে হলে কোনো খালি যায়গা দেখে করে ফেলি।
এ বিষয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, প্রতি আধাকিলোমিটারে একটি করে পাবলিক টয়লেট থাকা প্রয়োজন। কিন্তু রাজধানী শহরে এটি নেই। এজন্য জনস্বাস্থ্যের শঙ্কা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। সর্বোপরি জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গণশৌচাগার নির্মাণে বিদেশিদের অর্থসহায়তার মুখাপেক্ষী হলে চলবে না; নিজেদের সমস্যা নিজেদেরই সমাধান করতে হবে।
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন