উৎপাদনে নেই এক-তৃতীয়াংশ

মহিউদ্দিন রাব্বানি প্রকাশিত: আগস্ট ১৩, ২০২৩, ১০:৫৬ পিএম
উৎপাদনে নেই এক-তৃতীয়াংশ

১৫৩ বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে পূর্ণ সক্ষমতায় চলছে ৪৯টি

  • বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ২৮ হাজার ১৩৪ মেগাওয়াট
  • সর্বোচ্চ উৎপাদন ১৫ হাজার ৬৪৮ মেগাওয়াট (১৯ এপ্রিল, ২০২৩)
  • সম্প্রতি উৎপাদন হয় ১২ হাজার ৭২৯ মেগাওয়াট (৭ আগস্ট, ২০২৩)

গ্যাসভিত্তিক

  • সক্ষমতা ১১ হাজার ৯৪ মেগাওয়াট 
  • উৎপাদন পাঁচ হাজার ৮৪৬ মেগাওয়াট

ফার্নেস অয়েলভিত্তিক

  • সক্ষমতা পাঁচ হাজার ৯২৫ মেগাওয়াট  
  • উৎপাদন দুই হাজার ৬৬০ মেগাওয়াট

বেসরকারি

  • সক্ষমতা এক হাজার ২৮৬ মেগাওয়াট 
  • উৎপাদন হচ্ছে ২৩০ মেগাওয়াট

বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের সঙ্গে মিল রেখে সঞ্চালন লাইন নির্মাণ করা দরকার
—ম তামিম, অধ্যাপক, বুয়েট

ভুল নীতির মাশুল জনগণের ওপর অযৌক্তিকভাবে চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে
—এম শামসুল আলম
জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি, ক্যাব

ক্যাপটিভ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিসহ দেশের এখন বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষমতা রয়েছে ২৮ হাজার ১৩৪ মেগাওয়াট। তবে চাহিদা উৎপাদন সক্ষমতার অর্ধেক। গড়ে ১৫ থেকে ১৬ হাজার মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে উৎপাদন হচ্ছে ১২ থেকে ১৩ হাজার মেগাওয়াট। বাকিটা লোডশেডিং করা লাগছে বিদ্যুৎ বিভাগকে। এদিকে দেশের ১৫৩টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে ৪৯টি বিদ্যুৎকেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতা নিয়ে চলছে। বাকি ১০৪টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে অন্তত ৫৩টি রক্ষণাবেক্ষণ বা জ্বালানির অভাবে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। এ পরিসংখ্যানেও দেখা যায়, প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কেন্দ্রে পূর্ণ সক্ষমতা নিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাচ্ছে না। পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশের তথ্য অনুযায়ী, এই ৫৩টি প্ল্যান্টের উৎপাদন সক্ষমতা চার হাজার ৯৩০ মেগাওয়াট। বাকি থাকে আরও ৫১টি প্ল্যান্ট, যেগুলোর উৎপাদন ক্ষমতা সাত হাজার ৮৫৫ মেগাওয়াট। কিন্তু, জ্বালানির অভাবে এগুলো তিন হাজার ৫৬৮ মেগাওয়াট উৎপাদন করতে পারছে। সারা দেশে বর্ষার মধ্যেই চলছে লোডশেডিং। অথচ দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতার প্রায় এক-তৃতীয়াংশই থাকছে অব্যবহূত।

সূত্র মতে, জ্বালানি সংকটের কারণে তিন হাজার ৬৫৩ মেগাওয়াট ও রক্ষণাবেক্ষণ সংক্রান্ত সমস্যার কারণে আরও তিন হাজার ৪৮৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে না। বিশেষজ্ঞরা বলেন, সরকারের ভুলনীতির কারণে বহু কেন্দ্র বৃদ্ধি করা হয়েছে। যদিও আমাদের এত চাহিদা নেই। এ ছাড়া জ্বালানি সংকটে চাহিদা অনুযায়ী উৎপাদনও করতে পারছে না বিদ্যুৎ বিভাগ। এ ক্ষেত্রে আমাদের এভাবে আমদানি নির্ভর হয়ে পড়া বড় ধরনের ভুল ছিল। জ্বালানি সংকটে বারবার বন্ধ হচ্ছে আমাদের উৎপাদন কেন্দ্রগুলো। রামপাল, পায়রা, বাঁশখালী কেন্দ্র জ্বালানি সংকটে বেশ কয়েক বার বন্ধ রাখতে হয়েছে। নতুন কয়েকটি কেন্দ্রের কাজও প্রায় শেষ। উৎপাদনে আসতে হলে সেসব কেন্দ্রেকেও জ্বালানির জোগান দিতে হবে। নতুবা এসব কেন্দ্রেও উৎপাদন না করে বন্ধ রাখতে হবে। তবে চুক্তি শর্ত অনুযায়ী, উৎপাদন করতে না পারলেও ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হবে। ফলে পিডিবিকে গুনতে হবে বড় অঙ্কের জরিমানা।  

পেট্রোবাংলা জাতীয় গ্রিডে প্রতিদিন প্রায় দুই হাজার ৭০০ থেকে দুই হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করছে, যার মধ্যে এক হাজার থেকে এক হাজার ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট যাচ্ছে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে। কিন্তু এই বড় সরবরাহকেও অনেক কম মনে হচ্ছে। কারণ পিডিবি ইতোমধ্যেই পেট্রোবাংলাকে চিঠি দিয়ে বলেছে বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাসের সরবরাহ বাড়াতে। গ্যাসের সংকটে ভুগছে ঘোড়াশাল, হরিপুর, আশুগঞ্জ, ভেড়ামারা ও সিরাজগঞ্জের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো। কয়লা সংকটের কারণে গত বাগেরহাটের রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ সাত মাসে ছয়বার বন্ধ হয়েছে। একই কারণে বরগুনায় ৩০৭ মেগাওয়াটের একটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রও বন্ধ রাখা হয়েছিল। 

পিডিবি ও পিজিসিবির তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, দেশের ১৫৪টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে অন্তত ১০০টিতে সক্ষমতা অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে না। গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন ক্ষমতা ১১ হাজার ৯৪ মেগাওয়াট হলেও সেগুলোতে উৎপাদন হচ্ছে পাঁচ হাজার ৮৪৬ মেগাওয়াট। ফার্নেস অয়েল-ভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন ক্ষমতা পাঁচ হাজার ৯২৫ মেগাওয়াট হলেও সেখানে উৎপাদন হচ্ছে দুই হাজার ৬৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। বেসরকারি ডিজেল-চালিত বদ্যুৎকেন্দ্রগুলো গড়ে ২৩০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করেছে। তাদের উৎপাদন ক্ষমতা এক হাজার ২৮৬ মেগাওয়াট। বাংলাদেশ ভারত থেকে এক হাজার ১৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি করে, যা গড়ে প্রায় এক হাজার ১১ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে। বছরের সবচেয়ে উষ্ণতম সময় এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত চাহিদা অনুযায়ী দিনে অন্তত ১৬ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা ছিল সরকারের। কিন্তু এপ্রিলের প্রথম থেকেই তা উৎপাদনে সরকার ব্যর্থ হয়। পিডিবি গত ১৯ এপ্রিল রেকর্ড ১৫ হাজার ৬৪৮ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করে। ওই দিন দেশের বিদ্যুৎ চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ৯৬ মেগাওয়াট, যার ঘাটতি ময়মনসিংহ, কুমিল্লা, সিলেট ও রংপুর এলাকায় ৪২৮ মেগাওয়াট লোডশেডিং করে পূরণ করতে হয়।

এদিকে পাঁচটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে শুধু ভারতের ঝাড়খণ্ডের আদানি বিদ্যুৎকেন্দ্রটি পূর্ণ সক্ষমতায় চলছে। বড়পুকুরিয়া বিদ্যুৎকেন্দ্র ও বরিশাল ৩০৭ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র তাদের ধারণক্ষমতার অর্ধেক উৎপাদন করছে। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা বলছেন, তাপপ্রবাহের কারণে ফার্নেস অয়েলভিত্তিক অনেক প্লান্ট বিদ্যুৎ উৎপাদনে সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে। 

বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারীরা মনে করছেন, সরকার দারুণ কোনো ব্যবস্থা না নিলে বিদ্যুৎ পরিস্থিতির উন্নতি হবে না। আমাদের সক্ষমতার চেয়ে প্রতিদিন কমবেশি ১২ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কম উৎপাদন করতে হচ্ছে। তকে উৎপাদন কোম্পানিগুলোর সাথে চুক্তির শর্তানুযায়ী উৎপাদন না হওয়া ১২ হাজার মেগাওয়াটের জন্যও ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’ মানে বিদ্যুৎকেন্দ্র বসিয়ে রেখে টাকা দেয়া হচ্ছে। টাকার অঙ্কে প্রতি বছর যা প্রায় ৯ হাজার কোটি। ২০২০ সালে সিপিডি জানিয়েছিল প্রায় ৬০ শতাংশ বিদ্যুৎকেন্দ্র বসিয়ে রেখে ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’র নামে অর্থ দেয়া হয়। যুক্তরাষ্ট্রের গবেষণা সংস্থা আইইইএফের গত বছরের তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে বসিয়ে রেখে অর্থ দেয়া বিদ্যুৎকেন্দ্রের সংখ্যা সক্ষমতার ৫৭ শতাংশ। সমপ্রতি বিদ্যুৎ খাতের অভ্যন্তরে ইউটিলিটি বিভাগ থেকে একটি প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়েছে, যা প্রকাশিত হয়নি। 

একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে জানা যায়, প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে ২০২৩-২৪ সালে সক্ষমতার ৬৬ শতাংশ বিদ্যুৎকেন্দ্র বসিয়ে রাখতে হবে। অর্থাৎ ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’-এর টাকার অংক আরও বড় হবে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও ভোক্তা সংগঠন কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি অধ্যাপক ড. শামসুল আলম আমার সংবাদকে বলেন, সরকারের ভুল নীতির মাসুল জনগণের ওপর অযৌক্তিকভাবে চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে। আমরা কেউ ভালো নেই। ভুল পরিকল্পনা এবং নানা অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত। ফলে বারবার দাম বাড়ানো হচ্ছে। মানুষের ওপর বোঝা চাপানো হচ্ছে।  

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ এবং বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) অধ্যাপক ইজাজ হোসেন বলছেন, বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ২২ হাজার মেগাওয়াট বলা হলেও বাস্তবে সক্ষমতা ১৫-১৬ হাজার মেগাওয়াট। তবে বসিয়ে রেখে ভাড়া দেয়ার ক্ষেত্রে আমাদের ব্যর্থতা বড় ক্ষতির কারণ হয়ে সামনে আসছে। বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের সঙ্গে মিল রেখে অবশ্যই সঞ্চালন লাইন নির্মাণ করা দরকার। তিনি আরও বলেন, জ্বালানি কিনতে হলে যতটা ডলার লাগবে, সেই ডলার তো সরকার দিতে পারবে না। না দিতে পারলে সমস্যা থাকবেই এবং লোডশেডিংও করতেই হবে। এর কোনো বিকল্প আমি দেখছি না।