- একটি অংশের অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ায় পেশায় থাকা অন্যরা বিব্রত
সামগ্রিক সামাজিক নৈতিক অবক্ষয়ের প্রভাব ডাক্তারদের ওপরও পড়েছে। পুঁথিগত বিদ্যার বাইরে নৈতিক শিক্ষার দিকে জোর দিতে হবে
—ডা. এহতেশামুল হক চৌধুরী
মহাসচিব, বিএমএ
যেসব চিকিৎসক নিজেদের নৈতিকতা বিসর্জন দিয়ে অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েছেন, অভিযোগ প্রমাণ হলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা
—ডা. মো. লিয়াকত হোসেন
ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার, বিএমডিসি
মানুষের প্রধান মৌলিক চাহিদার একটি হলো চিকিৎসা। সঠিক চিকিৎসা পেতে মানুষ ছুটে যায় নিকটস্থ ডাক্তারের কাছে। মানুষের বিশ্বাস ও আস্থার অনেকটা জুড়ে থাকেন ডাক্তার। আর এই ডাক্তারদের একটি অংশ বিভিন্ন অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েছেন। সামপ্রতিক সময়ে মেডিকেল ভর্তিপরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসে জড়িত থাকার অভিযোগে ১২ জন ডাক্তার গ্রেপ্তার হওয়ার পর ডাক্তারদের অনৈতিক কর্মকাণ্ড নতুন করে সামনে আসে। নারী নির্যাতন, যৌন নিপীড়ন, নিয়োগ বাণিজ্যের মতো দুর্নীতির অভিযোগ বাড়ছে ডাক্তারদের বিরুদ্ধে। এমতাবস্থায় সেবামূলক পেশায় থাকা অনেকে বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছেন।
চলতি বছরের কয়েকটি ঘটনা পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এ পেশায় যুক্ত অনেকের অপরাধ-প্রবণতা বেড়েছে। সর্বশেষ মেডিকেল কলেজে ভর্তিপরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসচক্রে জড়িত থাকার অপরাধে গত ৩০ জুলাই থেকে ৯ আগস্ট পর্যন্ত ঢাকা, টাঙ্গাইল, কিশোরগঞ্জ ও বরিশালে অভিযান চালিয়ে প্রশ্নপত্র ফাঁসচক্রের ১২ সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে সিআইডির সাইবার টিম। তাদের মধ্যে সাতজন ডাক্তার। গত ১৯ ও ২০ আগস্ট চক্রটির আরও পাঁচজন ডাক্তার গ্রেপ্তার হন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, গত ১৬ বছরে ১০ বার প্রশ্ন ফাঁস হয়েছে চক্রটির মাধ্যমে। এই প্রশ্ন ফাঁসে ৮০ জন সক্রিয়। তাদের মাধ্যমে লেনদেন হয়েছে শত কোটি টাকা। প্রশ্ন ফাঁসের সুবিধা নিয়ে মেডিকেল কলেজে ভর্তি হয়েছেন হাজারেরও বেশি শিক্ষার্থী। প্রশ্ন ফাঁস ছাড়াও সরকারি অর্থ আত্মসাৎ ও দুর্নীতির দায়ে চলতি বছর কয়েকজন সিভিল সার্জনের বিরুদ্ধে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয় দুর্নীতি দমন কমিশন-দুদক। সরকারি দুটি প্রতিষ্ঠানের নামে কেনা বিভিন্ন সামগ্রীর বাড়তি দাম দেখিয়ে সাড়ে ৪১ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে সাতক্ষীরার সাবেক সিভিল সার্জন ডা. তওহীদুরসহ দুজনের বিরুদ্ধে বছরের শুরু দিকে আদালতে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) অভিযোগপত্র জমা দেয়।
করোনাকালীন সময়ে নমুনা পরীক্ষার নামে বিদেশগামী যাত্রীদের কাছ থেকে আদায় করা দুই কোটি ৬১ লাখ ৪৪ হাজার টাকা সরকারি কোষাগারে জমা না দিয়ে নিজেদের মধ্যে যোগসাজশে আত্মসাতের অভিযোগে খুলনার সিভিল সার্জন ডা. সুজাত আহমেদ, গোপালগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা. নিয়াজ মোহাম্মাদসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র জমা দিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। দুদকের চার্জশিট জমা দেয়ার পর খুলনার সিভিল সার্জনকে ওএসডি করা হয়। বছরের বিভিন্ন সময়ে ডাক্তারদের এমন দুর্নীতির খবর প্রকাশ পায়। কোনো অভিযোগ তদন্ত চলছে আবার কোনো অভিযোগ বিচারাধীন। গত ১ আগস্ট সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে বহির্বিভাগে মেডিকেল অফিসার ডা. দাউদুল ইসলাম জ্বরের চিকিৎসা দিতে গিয়ে এক নারীকে যৌন হয়রানি ও ধর্ষণের চেষ্টা করেন বলে অভিযোগ উঠে। অভিযুক্ত চিকিৎসকের বিরুদ্ধে যথাযথ পদক্ষেপ চেয়ে ভুক্তভোগী রোগী হাসপাতালের পরিচালক বরাবর আবেদন করেছেন। এ ঘটনায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে।
গত ২০ ফেব্রুয়ারি খুলনায় স্থানীয় একটি নাসিং হোমে রোগীকে যৌন নির্যাতনে অভিযোগ উঠে শহীদ শেখ আবু নাসের বিশেষায়িত হাসপাতালের ডাক্তার ডা. নিশাদ আবদুল্লাহর বিরুদ্ধে। কাছাকাছি সময়ে খুলনা মেডিকেল কলেজের নিউরোলজি বিভাগের ডাক্তার বিপ্লব কুমার দাসের বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ উঠে। চলতি বছরের মাঝামাঝি ভুল চিকিৎসার অভিযোগ উঠে ঢাকা সেন্ট্রাল হাসপাতালের কয়েকজন চিকিৎসকের বিরুদ্ধে। মৃত্যু হয় নবজাতকের, পরবর্তী সময়ে মারা যান মা-ও। ঘটনায় দুজন ডাক্তারকে গ্রেপ্তার করা হলে তারা দায় স্বীকার করে আদালতে নবজাতকের মৃত্যু ঘটনায় জবানবন্দি দেন। এ ঘটনা দেশজুড়ে সমালোচনার সৃষ্টি হয়। উঠে আসে এমন আরও কিছু ঘটনা।
সামগ্রিক ঘটনা প্রবাহ নিয়ে আমার সংবাদ কথা বলে দেশের একজন সিনিয়র ডাক্তারের সাথে। তিনি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘এসব ঘটনায় আমাদের পেশার সম্মান ক্ষুণ্ন হচ্ছে। মানুষের আস্থার জায়গায় বড় আঘাত আসছে। আমাদের নৈতিক শিক্ষার এই অধঃপতন কিভাবে ঘটে গেলো তা নিয়ে ভাবতে হবে।’ ডাক্তারদের শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) মহাসচিব ডা. এহতেশামুল হক চৌধুরী আমার সংবাদকে বলেন, ‘ডাক্তররা সমাজের বাইরের কেউ না। সামগ্রিক সমাজিক নৈতিক অবক্ষয়ের প্রভাব তাদের উপরও পড়েছে। পুঁথিগত বিদ্যার বাইরে নৈতিক শিক্ষার দিকে জোর দিতে হবে। যে সমাজে অনৈতিক কর্মকাণ্ড আছে সে সমাজে ডাক্তার কেন, যেকোনো কেউ এসব কাজে যুক্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। সব পেশার মানুষই এসব কর্মকাণ্ডে জড়িত। গণমাধ্যমে প্রায়ই এমন খবর দেখা যায়। নৈতিক শিক্ষাটা পরিবার থেকে আসে, তারপর আসে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে। আইনের যথাযথ প্রয়োগের মাধ্যমে এসব অনৈতিক কাজ রোধ করা সম্ভব।’
বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের (বিএমডিসি) ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার ডা. মো. লিয়াকত হোসেন আমার সংবাদকে বলেন, ‘প্রশ্নফাঁস চক্রে যেসব ডাক্তার জড়িত তাদের বিরুদ্ধে যদি মামলা হয় আর অভিযোগ প্রমাণিত হয়; তাহলে আমরা তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবো। বিচারাধীন কোনো বিষয়ে আমরা ব্যবস্থা নিতে পারি না।’ নৈতিক অবক্ষয়ের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘নৈতিক অবক্ষয়ের বিষয়টি নতুন কিছু নয়। এটি আমরা কমবেশি বিভিন্ন সময় দেখেছি। আমাদের কাছে কোনো অভিযোগ এলে আমরা তদন্ত করে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়ে থাকি। যেসব চিকিৎসক নিজেদের নৈতিকতা বিসর্জন দিয়ে অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েছেন, এটি আমাদের ডাক্তার সমাজের জন্য ভালো কিছু নয়। যেসব ডাক্তার প্রশ্ন ফাঁসের সাথে জড়িত তারা চিকিৎসক নামের কলঙ্ক।’
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন