আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের গভর্নিং বডি নির্বাচন

নির্দেশনা উপেক্ষা করে ভোটার তালিকায় মুশতাকের নাম

মো. মাসুম বিল্লাহ প্রকাশিত: আগস্ট ২৫, ২০২৩, ১১:২৪ পিএম
নির্দেশনা উপেক্ষা করে ভোটার তালিকায় মুশতাকের নাম

রাজধানীর আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের গভর্নিং বডির সদস্য খন্দকার মুশতাকের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্ট নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন। স্কুলের নীতিমালা অনুযায়ী, নৈতিক পদস্খলনের দায়ে স্কুলের কমিটিতেও থাকার সুযোগ নেই খন্দকার মুশতাকের। কিন্তু কোনোভাবেই সরানো যাচ্ছে না তাকে। এ যেন এক জগদ্দল পাথরে রূপ ধারণ করেছে। 

এরই মধ্যে গত বৃহস্পতিবার কলেজের সভাপতি আবু হেনা মোরশেদ জামান স্বাক্ষরিত ভোটার তালিকায় সেই মুশতাকের নাম দেখা যায়। এতে আলোচনায় আসেন মুশতাক। শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যেও এ নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। কোন অদৃশ্য শক্তির প্রভাবে গভর্নিং বডির সদস্যপদ বাতিল ও সুপ্রিম কোর্টের চেম্বার আদালত কর্তৃক কলেজে যেতে পারবে না নিষেধাজ্ঞা দেয়ার পরও তাকে গভর্নিং বডির ভোটার তালিকায় রাখা হয়েছে— এ প্রশ্নও সবার মধ্যে জাগছে। কলেজটির একাদশ শ্রেণির এক শিক্ষার্থীকে বিয়ে করে আলোচনার জন্ম দিয়েছেন ৬০ বছর বয়সি গভর্নিং বডির সদস্য খন্দকার মুশতাক আহমেদ। এমন অস্বাভাবিক ও অপ্রীতিকর ঘটনার পর আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজে খন্দকার মুশতাকের গভর্নিং বডির সদস্যপদ বাতিল করা হয়েছে বলে গত কদিন আগে গণমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন ঢাকা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক তপন কুমার সরকার। অপরদিকে ছাত্রীর বাবার দায়ের করা এক মামলায় হাইকোর্ট মুশতাককে বলেছিলেন আপনি নৈতিকভাবে কাজটি ঠিক করেননি। 

এছাড়াও ছাত্রীকে বিয়ে করা রাজধানীর মতিঝিলের আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের গভর্নিং বডির দাতা সদস্য খন্দকার মুশতাক আহমেদ যেন স্কুলের সীমানায় যেতে না পারেন, সেজন্য স্কুল কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে গত ২০ আগস্ট আপিল বিভাগের চেম্বার আদালতের বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম আদেশ দেন।

ঢাকা শিক্ষা বোর্ড ও আদালতের নির্দেশনা না মেনেই আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের গভর্নিং বডির নির্বাচন-২০২৩ ভোটার তালিকায় খন্দকার মুশতাক আহমেদকে রাখা হয়েছে। ভোটার তালিকা দেখার পর থেকেই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের অভিভাবকরা এক ধরনের আতঙ্ক ও উদ্বেগে আছেন তাদের সন্তানদের নিরাপত্তা নিয়ে। 

এ বিষয়ে কলেজের বর্তমান অধ্যক্ষ মো. মিজানুর রহমানের সঙ্গে মুঠোফোনে কথা হলে তিনি আমার সংবাদকে জানান, আমি যতদূর জানি তিনি (খন্দকার মুশতাক আহমেদ) ডোনার সদস্য, এটাতো আমরা বাতিল করতে পারি না এবং কোর্টও সেটা বাতিল করেনি। রায়ে আমি তা দেখছি। গভর্নিং বডিই সদস্যপদ থেকে বাদ দিতে বলছে এবং প্রতিষ্ঠানের কাছে যাতে তিনি না আসেন— এ দুটি কথা বলছে; কিন্তু তার ডোনার সদস্যপদ বাতিল করতে বলেনি। সে কথাটা ওখানে উল্লেখ নেই।

এত বড় ঘটনার পরও কাদের প্রভাবে আবারও দাতা সদস্যপদের ভোটার তালিকায় খন্দকার মুশতাককে রাখা হয়েছে— এমন প্রশ্ন তুলে একাধিক অভিভাবক নাম প্রকাশ না করার শর্তে আমার সংবাদকে বলেন, কলেজের এমন সিদ্ধান্তে আমরা হতবাক। সেখানে ঢাকা শিক্ষা বোর্ড থেকে বহিষ্কার ও আদালত কর্তৃক বলা হয়েছে কলেজ প্রাঙ্গণের আশেপাশে মুশতাককে না যেতে, সেখানে এই নির্দেশনা পালন না করে কীভাবে তাকে ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হলো! মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক প্রবিধানমালা-২০০৯ অনুসারে সদস্য হবার বা থাকার ক্ষেত্রে অযোগ্যতার বিষয়ে ‘গ’তে বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্বার্থবিরোধী বা এর সুনাম নষ্ট হয়— এরূপ কোনো কর্মকাণ্ডে যদি কেউ অংশগ্রহণ করেন অথবা কোনোভাবে এতে সহায়তা প্রদান করেন, তাহলে তিনি স্কুল ম্যানেজিং কমিটির কোনো পদে থাকার বিষয়ে অযোগ্য বলে বিবেচিত হবেন। 

মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকের প্রজ্ঞাপনে স্পষ্টভাবে আর্টিকেল ১১-এর ‘গ’ লঙ্ঘনের পরও কেন খন্দকার মুশতাককে ভোটার তালিকায় রেখে কে বা কারা ফায়দা লুটতে চাচ্ছে— এমন প্রশ্নও তুলেছেন শিক্ষার্থীদের অভিভাবকরা।

এ বিষয়ে আমার সংবাদ থেকে গভর্নিং বডির সভাপতি আবু হেনা মোরশেদ জামানের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।  ছাত্রী ধর্ষণের অভিযোগে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির দাতা সদস্য খন্দকার মুশতাক আহমেদের বিরুদ্ধে গত ১ আগস্ট ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৮-এ নালিশি মামলা করেন ওই শিক্ষার্থীর বাবা।

শিক্ষার্থীর বাবার করা ধর্ষণ মামলায় ১৭ আগস্ট খন্দকার মুশতাক আহমেদকে ছয় সপ্তাহের আগাম জামিন দেন হাইকোর্ট। তবে বিশেষজ্ঞদের দিয়ে বোর্ড গঠনের মাধ্যমে ওই ছাত্রীর বয়স নির্ধারণ করতে বলেছেন আদালত। বয়স নির্ধারণ না হওয়া পর্যন্ত ছাত্রীকে সেফ কাস্টডিতে (নিরাপদ হেফাজত) রাখতে নির্দেশও দেয়া হয়। গণমাধ্যমে উঠে এসেছে, গভর্নিং বডির দাতা সদস্য খন্দকার মুশতাক আহমেদ সম্প্রতি ‘প্রলোভনের মাধ্যমে’ প্রতিষ্ঠানের এক ছাত্রীকে বিয়ে করে সমালোচনার জন্ম দিয়েছেন। ওই ছাত্রীর বাবা এখন তার বিরুদ্ধে আইনি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। ছাত্রীর বাবা উচ্চ আদালতে মুশতাক আহমেদের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন। 

মামলায় ছাত্রীর বাবা বলেন, তার মেয়ে মতিঝিল আইডিয়ালের একাদশ শ্রেণির ছাত্রী। আসামি মুশতাক বিভিন্ন অজুহাতে কলেজে আসতেন এবং ভুক্তভোগীকে ক্লাস থেকে অধ্যক্ষের কক্ষে ডেকে আনতেন। খোঁজ-খবর নেয়ার নামে তিনি ভুক্তভোগীকে বিভিন্নভাবে প্রলোভন দেখিয়ে প্রলুব্ধ করতেন। কিছুদিন পর আসামি মুশতাক ভুক্তভোগীকে কুপ্রস্তাব দেন। এতে রাজি না হওয়ায় ভুক্তভোগীকে তুলে নিয়ে গিয়ে জোরপূর্বক বিয়ে এবং তাকে ও তার পরিবারকে ঢাকাছাড়া করবেন বলে হুমকি দেন।

প্রতিষ্ঠানটির নানা অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা নিয়ে অনেক শিক্ষকও কথা বলেছেন। কিন্তু কেউ নাম-পরিচয় প্রকাশ করতে সাহস পাচ্ছেন না। এছাড়া আরও অনেক অভিযোগ রয়েছে  প্রতিষ্ঠানটির গভর্নিং বডির বিরুদ্ধে। শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগে সরকারের বিধি মানা হয় না। ইচ্ছেমতো শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগ দেয়া হয়। একজন সচিব সভাপতি থাকার কারণে গভর্নিং বডির বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থাও নেয়া যাচ্ছে না— এমনটাই মনে করেন অভিভাবকরা।