সড়ক দেখার দায়িত্ব পুলিশের, তারা এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেবে
—শেখ মোহাম্মদ মাহবুব-ই-রব্বানী, পরিচালক (রোড সেফটি বিভাগ), বিআরটিএ
রাজধানীতে গণপরিবহনের তেমন টার্মিনাল নেই, তাই সড়কে গাড়ি রাখা হয়
—খন্দকার এনায়েত উল্লাহ, সাধারণ সম্পাদক, ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি
রাত ১১টার পর আমাদের ট্রাফিক থাকে না যদি উল্টাপাল্টা কিছু হয় আমরা ব্যবস্থা নেব
—উপকমিশনার (ডিসি), ট্রাফিক মিরপুর বিভাগ
রাজধানীর ঢাকায় রাত নামলেই দেখা মেলে ভিন্ন এক চিত্রের। রাস্তার দুই পাশে সারি সারি বাস দেখলে মনে হয় রাতের ঢাকা যেন বাসের দখলে। শহরের এক একটি রাস্তা পরিণত হয় বাস পার্কিং জোনে। আর রাতের আঁধারে এই পার্কিংয়ে গড়ে ওঠে অপরাধের অভয়ারণ্য। সড়কের পাশে রাখা বাসের মধ্যে অনেক রাত পর্যন্ত হেলপার ও চালকরা আড্ডা দেন। আড্ডার সঙ্গে যুক্ত হয় রাতভর মাদক সেবন। এক একটি বাসে মাদকের আসর বসান চালক-হেলপাররা। এসব এলাকায় প্রায়ই ঘটছে ছিনতাইয়ের ঘটনাও। স্থানীয় বাসিন্দারা অনেকটা জিম্মি বাসের পার্কিং জোনগুলোতে। প্রত্যক্ষদর্শী মো. মশিউর রহমান রাত সাড়ে ১১টায়ট মিরপুর কলেজের পেছনে লাভ রোড হয়ে আনসার ক্যাম্প বাসায় যাচ্ছিলেন। অনেকগুলো বাস রাস্তার পাশে পার্কিং করা। একটি বাসের মধ্যে নিভু নিভু আলো দেখে বন্ধুদের সাথে নিয়ে বাসের মধ্যে প্রবেশ করেন তারা। দেখতে পান, গাঁজা বানিয়ে সেবন করছে তিন যুবক। কথা বলে জানা যায়, তারা বাসের হেলপার। প্রায় সময়ই বাসের মধ্যে নিরাপদে মাদক সেবন করেন তারা। এমনটিই জানিয়েছেন আমার সংবাদের এ প্রতিবেদককে।
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় পার্কিংয়ের পাশে থাকা স্থানীয় দোকানদারদের সাথে কথা বলে জানা যায়, প্রতি রাতেই বাসগুলোতে মাদকের আসর বসে। রাজধানীর ভাসমান অনেক মানুষ এসব মাদকের আসরে যোগ দেন। রাত গভীর হলে সড়কে গাড়ি চলাচল কমে যায়। নীরব হয়ে পড়ে শহর। এই সময়কে তারা বেছে নেয় চুরি-ছিনতাইয়ে জন্য। সংঘবদ্ধভাবে পথচারীদের টার্গেট করে তারা। এসব চক্রের মাধ্যমে চলে পতিতাবৃত্তির মতো অপরাধও। সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, রাত ১টা। নীলক্ষেত মোড় থেকে শুরু করে রাস্তার দুপাশ ঘিরে আজিমপুর বাসস্ট্যান্ড ছাড়িয়ে প্রায় এক কিলোমিটার জায়গাজুড়ে সারি সারি বাস। দেখা মেলল দেওয়ান পরিবহন, ভিআইপি, বিকাশসহ কয়েকটি কোম্পানির শতাধিক বাস। এসব বাস রাখার কারণে রাস্তা সংকোচিত হয়ে দুই তৃতীয়াংশই দখল হয়ে গেছে। রাত ২টা। তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল। তেজগাঁও লিংক রোড, রহিম মেটাল বটতলা ও শহীদ তাজউদ্দিন সড়কের দুই পাশে রাখা হচ্ছে প্রায় ২০০ বাস। রাত আড়াইটা। মিরপুর কিডনি ফাউন্ডেশন থেকে মিরপুর কলেজের পেছনের শাখা সড়ক (লাভ রোড) হয়ে শেরেবাংলা জাতীয় স্টেডিয়ামের মোড় পর্যন্ত অবৈধভাবে সড়কে ৭০টি বাস রাখা হয়েছে। এসব বাস বসুমতি, প্রজাপতি, তেঁতুলিয়া, রবরব, ইন্টারসিটি, মিরপুর লিংক, আকিক পরিবহন, আল মক্কা কোম্পানির। মিরপুর ১২ নম্বর ফিলিং স্টেশন থেকে সাগুফতার গেট পর্যন্ত সড়কের দুই পাশে ৬০-৭০টি বাস রাখা। রাত ৩টা। মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ড থেকে তিন রাস্তার মোড় পর্যন্ত রাস্তার একপাশে দুই লাইনে শতশত বাস দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। পর্বত থেকে গাবতলী, পুরান ঢাকার জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে গিয়ে রাস্তার ওপর বাস দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। এ ছাড়াও রাজধানীর শ্যামলী, কল্যাণপুর, কমলাপুর ও মহাখালীসহ একাধিক জায়গায় প্রধান সড়কের ওপর প্রতিদিন পার্কিং করা হচ্ছে দূরপাল্লার বাস। টার্মিনাল বাদ দিয়ে প্রধান সড়কের অর্ধেকেরও বেশি দূরপাল্লার বাসের দখলে চলে যায়। এতে সড়ক ও বাস টার্মিনালের পার্থক্য বোঝা কঠিন হয়ে পড়ছে। বাস থামিয়ে রাখা এসব জায়গার অধিকাংশে বসে মাদকের আড্ডা।
আজিমপুর গিয়ে দেওয়ান পরিবহনের একটি বাসের মধ্যে আলো জ্বলতে দেখা যায়। কাছে গিয়ে কথা বললে আব্দুর রহমান নামে এক ড্রাইভার আমার সংবাদকে বলেন, ‘আমাদের কোম্পানি এখানে রাখতে বলেছে তাই রাখছি।’ বিস্তারিত জানতে চাইলে তিনি রুবেল নামে তাদের কোম্পানির এক লাইন ম্যানের সঙ্গে কথা বলতে বলেন। এদিকে লাইন ম্যান কথা বলতে অপারগতা প্রকাশ করে দ্রুত স্থান ত্যাগ করেন। এরপর নুর আলম নামে আরেক ড্রাইভার বলেন, ‘আমাদের কোম্পানির রাখার জায়গা নেই। আমরা এখনো সেরকম জায়গা পাইনি। তিনি জানান, দুই-তিন বছর ধরে এ কোম্পানিতে চাকরি করছেন। শুরু থেকেই তিনি এখানে গাড়ি রাখছেন। ভিআইপি পরিবহনের আরেক ড্রাইভার বলেন, ‘আমাদের কোম্পানির গাজীপুরে বাস রাখার একটি জায়গা আছে। তবে ঢাকার ভেতরে নেই। তাই ঢাকার ভেতরে গাড়িগুলো রাস্তার উপরে রাখা হয়।’
বিআরটিএ সূত্রে জানা যায়, ঢাকার রাস্তায় নতুন কোনো গণপরিবহন চলাচলের অনুমতি নেয়ার সময় যানবাহনের পার্কিংয়ের জায়গা দেখানো বাধ্যতামূলক। কাগজে-কলমে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) এ নির্দেশনা মানা হলেও ঢাকার রাস্তায় দেখা যায় উল্টো চিত্র। অনুমোদন নেয়ার সময় পার্কিংয়ের জায়গা দেখালেও বাসগুলো মূলত রাতের বেলা রাস্তার ওপরই রাখা হয়। বাস মালিকরা বলছেন, গাড়ির সংখ্যা বেশি হওয়ায় তাদের কিছু বাস রাস্তায় রাখতে হয়। এ ছাড়া রাস্তায় পার্কিংয়ের জন্য কিছু ক্ষেত্রে পুলিশ এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের মোটা অঙ্কের টাকাও দিতে হয় বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। জানতে চাইলে প্রজাপতি পরিবহনের এমডি রফিকুল ইসলাম আমার সংবাদকে বলেন, ‘বাস রাখেন গাড়ির মালিকরা। এখানে আমাদের কিছু করার নেই, দায়িত্ব মালিকদের। বিকাশ পরিবহনের চেয়ারম্যান হারুন-আর রশিদ বলেন, ‘বাইপাইল নবীনগর আমাদের পার্কিং। আমরা সেখানে গাড়ি রাখি। সকালে যাওয়ার জন্য কয়েকটি গাড়ি রাস্তায় আজিমপুর রাখা হয়। আবার কিছু ড্রাইভার টাকা পয়সা না দিয়ে ক্যাশ নিয়ে গাড়ি ফালাই রাইখা চইলা যায়।’
জানতে চাইলে ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক খন্দকার এনায়েত উল্লাহ আমার সংবাদের এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘রাজধানীতে গণপরিবহনের তেমন টার্মিনাল নেই, তাই সড়কে গাড়ি রাখা হয়। টার্মিনাল থাকলে আর এ সমস্যা হবে না। কিন্তু রুট পারমিটের সময় তো পার্কিংয়ের জায়গা দেখানোর আইন রয়েছে— এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘একটি গাড়ির দাম ২০ লাখ টাকা আর এক কাঠা জায়গার দাম দুই কোটি টাকা। ওই আইন ব্রিটিশ আমলের। ওই আইনের কার্যকারিতা নেই। গণপরিবহন বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান বলেন, অনেক ক্ষেত্রে আমরা দেখি বাসের অনুমোদনের সময় রাজনৈতিক প্রভাব এবং সুপারিশের মতো ঘটনা ঘটে। সে ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় অনুসন্ধান না করেই অনুমোদন দিয়ে দেয়। এগুলো নিয়ন্ত্রণ না করা গেলে এবং যথাযথ জবাবদিহি নিশ্চিত না করতে পারলে কাগুজে নীতিমালা সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে কোনো কাজে আসবে না।
এর আগে ঢাকা মহানগরীর যানজট নিরসনে রাত ১২টার পর সড়কের ওপর গাড়ি পার্ক করার বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিলেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (ডিএসসিসি) মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস। সেই নিষেধাজ্ঞা ২০২১ সালের ১ জানুয়ারি থেকে কার্যকর হওয়ার কথা থাকলেও এখনো আলোর মুখ দেখেনি। এ বিষয়ে জানতে চাইলে ট্রাফিক মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) আমার সংবাদের এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘রাত ১১টার পরে আমাদের ট্রাফিক থাকে না। মাদক-ছিনতাইয়ের বিষয়ে তিনি বলেন, যদি উল্টাপাল্টা কিছু হয় আমরা ব্যবস্থা নেবো।
অবৈধ বাস পার্কিং করার বিষয়ে জানতে চাইলে বিআরটিএ রোড সেফটি বিভাগের পরিচালক মাহবুব-ই রব্বানী আমার সংবাদের এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘সড়কে গাড়ি থাকার কথা নয়। তবে থাকলে পরিবহনের রুট পারমিট দেয়ার জন্য আট সদস্যের একটি কমিটি আছে। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ কমিটির কাছে দিলে ব্যবস্থা নেয়ার সুযোগ রয়েছে। তা ছাড়া সড়কের দেখার দায়িত্ব পুলিশের। তারা এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেবে।’
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন