- ঊর্ধ্বমুখী বাজারে তুলনামূলক কম মূল্যে পাওয়ায় এসব খাবার খাচ্ছেন অনেকেই
- খরচ বাঁচাতে বিকল্প হিসেবে দেখছেন চাকরিজীবীরা
- ডায়রিয়া, জন্ডিস টাইফয়েড, ক্যান্সারের মতো জীবাণু ছড়াচ্ছে
এসব খাবার তৈরি থেকে পরিবেশন পর্যন্ত অস্বাস্থ্যকর পদ্ধতিতেই হয়ে থাকে, তাই এসব খাদ্যে সংক্রামক রোগের ঝুঁকি বেশি
—অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ, জনস্বাস্থ্যবিদ
সাহিদুল ইসলাম ভূঁইয়া
রাজধানীর মতিঝিল এলাকায় একটি ইন্টারন্যাশনাল কুরিয়ার কোম্পানিতে সহকারী ম্যানেজার পদে চাকরি করেন আলতাফ মাহমুদ। মতিঝিল ক্লাবপাড়ার সামনে রাস্তার একাংশ দখল করে গড়ে ওঠা খাবারের দোকানে দুপুরের খাবার খাচ্ছেন তিনি। অফিশিয়াল পোশাকে তাকে অন্যদের থেকে খুব সহজেই আলাদা করা যায়। কারণ এসব হোটেলে খেতে আসা বেশির ভাগ মানুষই শ্রমজীবী নয়, হয় রিকশাচালক। তার সাথে কথা বলতেই তিনি জানালেন, এসব দোকানেই তিনি গত তিন মাস খাবার খাচ্ছেন। কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, আগে মতিঝিল এলাকার একটি মুটামুটি মানের হোটেলে দুপুরের খাবার খেতে ১৫০ থেকে ২০০ টাকা প্রয়োজন হতো। এখন এসব হোটেলে দুপুরের খাবার খেতে প্রয়োজন ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম বাড়ায় তারাও বাড়িয়েছেন খাবারের মূল্য। ফুটপাতের এ খাবারই এখন ভরসা। এখানে আমি ১২০ থেকে ১৫০ টাকায় দুপুরের খাবার খেয়ে নিতে পারছি। এসব খাবারে তো স্বাস্থ্যঝুঁকি থাকতে পারে, এমন প্রশ্ন করতেই তিনি বললেন, এখন খেতে তো হবে। আমাদের আর উপায় কী।
রাজধানীর কাকরাইলের একটি বহুজাতিক কোম্পানিতে চাকরি করেন ইমরান আহমেদ। তিনি মালিবাগ মোড়ের আশেপাশে গড়ে উঠা খোলা খাবারের দোকানে দুপুরের খাবার খান নিয়মিত। তার সাথে কথা বলতেই তিনি বলেন, আগে একটু পরিবেশ দেখে ভালো হোটেলে খেতাম। এখন খাবারের দাম বেড়ে গেছে। তাই এসব হোটেলে খাচ্ছি। হোটেলের খাবার তৈরি ও পরিবেশন নিয়ে তার আপত্তি থাকা সত্ত্বেও তিনি খাচ্ছেন। এসব খাবার খাওয়ার ফলে তিনি কোনো শারীরিক সমস্যায় ভুগছেন কি-না। এমন প্রশ্ন করতেই তিনি জানালেন, মাঝে মধ্যে পেটে ব্যথা হয়। কিন্তু কি করব, আয় বাড়েনি— সব কিছুর দাম বেড়েছে, বাধ্য হয়েই খাচ্ছি।
রাজধানীতে গত ১০ বছরের বেশি সময় রিকশা চালান দিনাজপুরের শফিক মিয়া। তার দৈনন্দিন খাবারের ভরসা ফুটপাতের খাবারের দোকান। প্রতিদিন দুপুরে নিয়ম করে খেতে আসেন প্রেস ক্লাবের সচিবালয় গেটে গড়ে উঠা ফুটপাতের খাবারের দোকানে। তিনি বলেন, আগে মুরগি বা মাছ দিয়ে সপ্তাহে তিন-চারদিন খেয়েছি। এখন সপ্তাহে দুই-এক দিন মাছ বা মুরগি খাই। ডিম আর ভর্তা দিয়েই বেশির ভাগ সময় খেতে হয়। ডিমের দাম বাড়ায় ডিমের তরকারির দামও বেড়ে গেছে বলেও তিনি জানান। এসব খাবার তার শরীরে কোনো সমস্যা সৃষ্টি করে কি-না, এমন প্রশ্ন করতেই তিনি জানালেন, পেটব্যথা সব সময়ই কমবেশি হয়। বছরের শুরুর দিকে পেট ব্যথা নিয়ে এক দিন ভর্তিও ছিলেন হাসপাতালে। ডাক্তার বলেছেন গ্যাস্ট্রিক থেকে তার এই পেটব্যথা হয়েছে। নিয়মিত ফুটপাতের এসব খাবারের দোকানে খাবার খেতেন হাসান আহমেদ। পেশায় তিনি একজন মুদি দোকানদার। ঢাকা মেডিকেল কলেজের জরুরি বিভাগের সামনে তাকে ধরে দাঁড়িয়ে আছেন তার ছোট ভাই। জিজ্ঞেস করতেই জানালেন, গত দুদিন পেটব্যথায় ভুগছেন। তাদের সন্দেহ বাইরের অস্বাস্থ্যকর খাবারের কারণেই তিনি পেটব্যথায় ভুগছেন।
মতিঝিল ক্লাবপাড়ায় ফুটপাতে গত পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে ভাতের হোটেল চালান মনসুর আহমেদ। তার সাথে কথা হয় আমার সংবাদের এ প্রতিবেদকের। তিনি বলেন, আমার এখানে খেতে আসা বেশির ভাগ মানুষই শ্রমজীবী বা রিকশাচালক। তবে বিভিন্ন কোম্পানিতে চাকরি করা লোকজন আগে তেমন একটা না এলেও গত কয়েক মাস তারাও আসছেন। হোটেলের চেয়ে কমমূল্যে খেতে পারেন বলেই তারা আসেন। খাবার তৈরির কথা জিজ্ঞেস করতেই তিনি দেখিয়ে দিলেন, রাস্তার পাশেই তৈরি করা হচ্ছে এসব খাবার।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল(বিএআরসির) ২০১৯ সালের এক গবেষণায় দেখা যায়, রাজধানীর রাস্তার খাবারে বিপজ্জনক মাত্রায় টোটাল কলিফর্মস ও ই-কোলাই ব্যাকটেরিয়া রয়েছে। এই ব্যাকটেরিয়া মূলত প্রাণীদের মলমূত্রে থাকে। ২০১৫ সালে ‘নিরাপদ খাদ্য আইন-২০১৩’ বাস্তবায়নের ঘোষণা দেয়া হয়। ‘জীবন ও স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সবার জন্য নিরাপদ খাদ্য’-এ রূপকল্প সামনে রেখে প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ-বিএফএসএ। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের এই বিভাগের দায়িত্ব হচ্ছে, খাদ্যের বিশুদ্ধতা ও বিচারিক কার্যক্রম পরিচালনা করা। তবে রাস্তার খাবারের মান নিয়ে এই কর্তৃপক্ষের কার্যক্রম নেই বললেই চলে। রাস্তার খাবার নিয়ে কর্তৃপক্ষের কার্যক্রম পরিদর্শন ও পরিবীক্ষণের মধ্যে সীমাবদ্ধ। নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ বলছে, সমপ্রতি ঢাকার বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করা হচ্ছে। প্রাপ্ত অভিজ্ঞতার আলোকে স্বাস্থ্যকর রাস্তার খাবার নিশ্চিতে বেশ কিছু প্রস্তাব তুলে ধরা হবে।
অস্বাস্থ্যকর খাবার জনস্বাস্থ্যে বিরূপ প্রভাব ফেলছে। এ বিষয়ে জনস্বাস্থ্যবিদ ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদের সাথে কথা বলেন আমার সংবাদের এ প্রতিবেদক। তিনি বলেন, এসব খাবার তৈরি থেকে পরিবেশন পর্যন্ত অস্বাস্থ্যকর পদ্ধতিতে হয়ে থাকে। এতে সংক্রামক রোগের ঝুঁকি বেশি। এসব অস্বাস্থ্যকর খাবারে ডায়রিয়া, জন্ডিস, টাইফয়েড, ক্যান্সারের মতো জীবাণু রয়েছে। যা শরীরের বিভিন্ন কোষকে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতির মুখে ফেলে। আমাদের দেশে গ্যাস্ট্রিকে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যার পরিসংখ্যানে দিকে তাকালে দেখা যায়, আমরা কী পরিমাণ অস্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণ করছি। ফুটপাতে অবাধে বিক্রি হওয়া খাবারের মান নিয়ন্ত্রণ না করতে পারলে আমাদের জনস্বাস্থ্য হুমকির মুখে পড়বে। যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন